মানুষের প্রতি সুধারণা রাখলে সওয়াব

মাওলানা শরিফ আহমাদ

ইসলাম

মানুষের প্রতি খারাপ ধারণা করার সুযোগ ইসলামে নেই। এটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অন্যের প্রতি খারাপ ধারণা থেকে বেঁচে থাকা মুমিনের কর্তব্য।

2026-09-11T10:13:17+00:00
2026-09-11T10:13:17+00:00
 
  শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৭ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইসলাম
মানুষের প্রতি সুধারণা রাখলে সওয়াব
মাওলানা শরিফ আহমাদ
প্রকাশ: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:১৩ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মানুষের প্রতি খারাপ ধারণা করার সুযোগ ইসলামে নেই। এটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অন্যের প্রতি খারাপ ধারণা থেকে বেঁচে থাকা মুমিনের কর্তব্য। এমনকি সমাজে কারও ব্যাপারে খারাপ ধারণা ছড়িয়ে পড়লেও তার প্রতি যথাসম্ভব ভালো ধারণা পোষণ করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাকো। নিশ্চয় কোনো কোনো অনুমান পাপ’ (সুরা হুজরাত : ১২)। হাদিসে প্রিয়নবী (সা.) বলেন, ‘সাবধান! খারাপ ধারণা পোষণ করা থেকে বিরত থাকো। কেননা খারাপ ধারণাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় মিথ্যা। আর কারও বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি করো না। একে অপরের পতন বা ধ্বংস সাধন করে নিজের কল্যাণ কামনা করো না। একে অপরের পশ্চাৎ অবলম্বন করো না। একে অপরের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করো না। তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা ও ভাই-ভাই হয়ে যাও।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০৬৬)

আমাদের প্রত্যেকেই যদি কোনো কথা বা কাজ ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই অপর মুসলিম ভাই সম্পর্কে খারাপ ধারণা না করে উত্তম ধারণা করি, তবে যেকোনো পরিস্থিতিতে আমাদের অন্তরাত্মা সুধারণা পোষণ করতে বাধ্য থাকবে। এমনই একটি ঘটনার বৃত্তান্ত আল্লাহ তায়ালা কুরআনে উল্লেখ করেছেন। আয়েশা (রা.)-এর ওপর যখন অপবাদ আরোপ করা হলো, তখন মুমিনদের উচিত ছিল মুনাফিকদের খপ্পরে না পড়ে ওই অপবাদ শ্রবণের প্রথম ধাপেই তাদের প্রতি সুধারণা পোষণ করা। আল্লাহ বলেন, ‘যখন তোমরা এ কথা শুনলে তখন মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীগণ নিজেদের বিষয়ে কেন ভালো ধারণা করলে না এবং বললে না এটা সুস্পষ্ট অপবাদ’ (সুরা নুর : ১২)। 

এ আয়াতে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, দ্বীন ও ঈমানের ভিত্তিতে মুমিন নর-নারী একান্তই আপনজন। কাজেই কোনো মুমিন নারী সম্পর্কে কোনো মন্দ প্রচার শুনলে আপনজন হিসেবে তাতে কর্ণপাত না করে তার প্রতি সুধারণা রাখতে হবে এবং মিথ্যা অপবাদ বলে তার নিন্দা জানাতে হবে। যখন হজরত আয়েশা (রা.)-এর প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করা হলো, তখন যেসব মুমিন এ নীতি অবলম্বন করেনি, আয়াতে তাদের তিরস্কার করা হয়েছে। তবে অনেকেই এমন ছিলেন, যারা প্রথমেই এ প্রচারণাকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। যেমন হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-কে তাঁর স্ত্রী যখন বললেন, লোকেরা আয়েশা সিদ্দিকা সম্পর্কে কী বলছে শুনেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ শুনেছি, কিন্তু তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। হে আইয়ুবের মা! তুমি কি কখনো এরূপ কাজ করবে? স্ত্রী বললেন, আল্লাহর কসম! কখনো নয়। তিনি বললেন, তা হলে আয়েশা (রা.) তো আল্লাহর কসম তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, তাঁর দ্বারা এটা কী করে সম্ভব? (তাফসিরে তাওজিহুল কুরআন)

সব মুসলিমের মধ্যে ইসলাম একটি ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে দিয়েছে। অপর ভাইয়ের প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করার কারণে ভ্রাতৃত্ববোধ কলুষিত হয়। এমনকি কারও ক্ষেত্রে ছিদ্রান্বেষণ ও গিবতের মতো মারাত্মক পাপ সংঘটিত হয় এই কুধারণা থেকেই। তাই প্রমাণহীন কোনো বিষয়ে শুধু ধারণা করাকে বড় মিথ্যা বলে ঘোষণা করেছেন নবীজি (সা.)।

প্রকৃত মুমিন কখনো অন্যের প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করে না। বরং অন্যের মন্দ ধারণা থেকে নিজেকে রক্ষা করে। কখনো কেউ মন্দ ধারণা করতে পারে, এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে ব্যাখ্যা করে স্পষ্ট করে দেওয়া মুমিনের দায়িত্ব। নবীজি (সা.)-এর স্ত্রী হজরত সাফিয়া (রা.) বলেন, একবার আল্লাহর রাসুল (সা.) ইতিকাফে ছিলেন। রাতে আমি তাঁকে দেখতে এসেছিলাম। এরপর তাঁর সঙ্গে কথা বলে আমি ফিরে আসার জন্য দাঁড়ালাম। তিনিও আমাকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য দাঁড়ালেন। ওই সময় আনসারদের দুই ব্যক্তি আমাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করল। যখন তারা নবী (সা.)-কে দেখলেন, দ্রুত চলে গেলেন। নবী (সা.) তখন তাদের ডাক দিয়ে বললেন, দাঁড়াও, অসুবিধা নেই। সে আমার স্ত্রী সাফিয়া বিনতে হুয়াই। তারা উভয়ে তখন বলল, সুবহানআল্লাহ হে আল্লাহর রাসুল! আপনার সম্পর্কে আমরা কখনো ধারণা-অনুমান করতে পারি না। তখন রাসুল (সা.) বললেন, শয়তান রক্তপ্রবাহের মতো মানুষের ভেতর বিচরণ করে। (বুখারি, হাদিস : ২০২৫)


সামাজিক জীবনে আমাদের পারস্পরিক আন্তরিকতা বজায় রাখতে হবে। অযথা সন্দেহ পোষণ থেকে বিরত থাকতে হবে। অনুমান নির্ভর ও গুজবের ওপর ভর করে সমাজে অঘটনের অনেক নজির আছে। কথার সত্যতা যাচাই না করেই অন্যের বিরুদ্ধে বিষোদগার রচনার অপতৎপরতাও সমাজে কম নয়। মুসলমান হিসেবে আমাদের উচিত নিজেদের মন্দ ধারণা থেকে বিরত রেখে যেকোনো বিষয়ের সত্যতা যাচাই করা। এর ফলে পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটবে, অটুট থাকবে ইসলামি ভ্রাতৃত্ববোধ। অপর ভাই সম্পর্কে ভালো ধারণা তৈরি করার মানসে নবীজি (সা.) জনৈক সাহাবিকে হাতে-কলমে শিক্ষা দিলেন। একদা এক ব্যক্তি তাঁর কাছে অভিযোগ করল যে, আমার স্ত্রী কালো সন্তান প্রসব করেছে। তখন নবীজি (সা.) বললেন, তোমার কোনো উট আছে? সে বলল, হ্যাঁ আছে। তিনি জিগ্যেস করলেন, কী রং সেগুলোর? সে বলল, লাল রঙের। তিনি বললেন, সেগুলোর মধ্যে কোনো কালো বাচ্চা আছে? সে বলল, অবশ্যই আছে। তিনি বললেন, কালোগুলো কোথা থেকে আসল? সে বলল, সম্ভবত পূর্ব বংশের কোনো রগের ছোঁয়া লেগেছে। তখন রাসুল (সা.) বললেন, তা হলে তোমার সন্তানও সম্ভবত পূর্ববর্তী কোনো বংশের ছোঁয়া পেয়েছে। (বুখারি, হাদিস : ৬৮৪৭)

বাস্তব জীবনে সবারই জানা যে, মানুষের মনমানসিকতা কখনো এক হয় না। বোধ-বুব্ধি আর উপলব্ধির ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে আছে বিস্তর ফারাক। মন-মেজাজ, স্বভাব-চরিত্র, চলাফেরার দিক দিয়ে মানুষ বৈচিত্র্যময়। সবার সঙ্গে সবার সম্পর্ক এক রকম হয় না, মানুষের মনমানসিকতাও এক রকম হয় না, তাই কর্তব্য হচ্ছে, সবার ব্যাপারে ইতিবাচক ধারণা রাখা; এমনকি যদি কারও থেকে অপরাধমূলক কাজও হয়ে যায়। এতেই মিলবে মানসিক প্রশান্তি। কেননা মানুষের অন্যান্য মহৎ গুণের পাশাপাশি অপর মানুষের প্রতি সুধারণা পোষণ করাও একটি মহৎ গুণ। সুধারণা সমাজে কল্যাণ বয়ে আনে, ভ্রাতৃত্ববোধ অটুট রাখে। সুচিন্তা-সুধারণা আমাদের বিবেকবান ও উন্নত মানুষে পরিণত করে। প্রত্যেক বিবেকবান মানুষেরই সুধারণামূলক মনোভাব থাকা আবশ্যক। কেননা অপরের ওপর ভালো ধারণা পোষণ করা সওয়াবে পরিণত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সুন্দর ধারণা সুন্দর ইবাদতের অংশ (মুসনাদে আহমাদ : ৮০৩৬)। 

সুধারণা উন্নত চরিত্রের ভূষণ। অন্যের সম্পর্কে সুধারণার ফলে পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝির অবসান পুরোপুরি সম্ভব। এর ফলে দ্বন্দ্ব-কলহ নিঃশেষ হয়ে সমাজের মানুষের ভ্রাতৃত্ববোধ অটুট হবে। দৃঢ় হবে সামাজিক মেলবন্ধনের সেতু। তাই অপর মুসলিম ভাই সম্পর্কে স্বচ্ছ ও নিষ্কলুষ ধারণা রেখে আমরা সমাজে বসবাস করার আন্তরিক প্রচেষ্টা করব। আল্লাহ আমাদের সবাইকে অপর মুসলিম সম্পর্কে সুধারণা পোষণের মতো সুন্দর অন্তর দান করুন।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 
  বিষয়:   মানুষ  সুধারণা  সওয়াব  ইসলাম 


Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: