মানুষের জীবনের সবচেয়ে অসহায় ও দুর্বল মুহূর্তগুলোর একটি হলো অসুস্থতা। রোগাক্রান্ত হলে মানুষের শারীরিক শক্তি যেমন ক্ষীণ হয়ে যায়, তেমনি মানসিক দৃঢ়তাও ভেঙে পড়ে। ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা গ্রাস করে ফেলে এবং মানুষটি তখন অন্যের সহানুভূতি, ভালোবাসা ও সেবার গভীর মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে।
এমন সংকটময় ও নাজুক সময়ে যে হাত সেবার জন্য প্রসারিত হয়, যে হৃদয় মমতায় সাড়া দেয় এবং যে মানুষ নিঃস্বার্থভাবে রোগীর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়, ইসলাম তাকে শুধু একজন সাধারণ মানবদরদি মানুষ হিসেবেই মূল্যায়ন করে না; বরং তাকে মহান আল্লাহর অত্যন্ত প্রিয় বান্দা এবং বড় মাপের ইবাদতকারী হিসেবে মর্যাদা প্রদান করে।
আজকের এই আধুনিক পৃথিবীতে উন্নত চিকিৎসা, বিশাল বড় বড় হাসপাতাল এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কোনো অভাব নেই; কিন্তু মানুষের জীবনের সেই চিরচেনা মমতা, আন্তরিক সেবা এবং সহানুভূতির অভাব যেন দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। অনেক রোগী ওষুধের চেয়েও বেশি প্রয়োজন অনুভব করেন একটি আন্তরিক খোঁজখবর, একটি সান্ত্বনামূলক বাক্য, একটি ভালোবাসার স্পর্শ কিংবা একজন আপন মানুষের উপস্থিতি। ইসলাম কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী আগে থেকেই এই মানবিক সত্যটিকেই ইবাদতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়ে আসছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা নেককাজ ও তাকওয়ার বিষয়ে একে অন্যকে সহযোগিতা করো’ (সুরা মায়েদা : ২)।
আবার অন্য আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই’ (সুরা হুজুরাত : ১০)। এই ভ্রাতৃত্বের অমোঘ দাবি হলো, সুখে-দুঃখে, সুস্থতায়-অসুস্থতায় একে অন্যের বিপদে ঢাল হয়ে পাশে দাঁড়ানো।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এই সেবার গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের একটি দুঃখ-কষ্ট দূর করে দেবে, আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন তার একটি বড় কষ্ট দূর করে দেবেন’ (সহিহ মুসলিম : ২৬৯৯)।
রোগীর কষ্ট লাঘবের চেয়ে বড় দুঃখ মোচনের কাজ আর কী হতে পারে? এমনকি প্রিয় নবী (সা.) আরও বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন, হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ ছিলাম, তুমি আমাকে দেখতে আসনি... যদি তুমি আমার সেই অসুস্থ বান্দাকে দেখতে যেতে, তা হলে আমাকে তার কাছেই পেতে’ (সহিহ মুসলিম : ২৫৬৯)।
এই হাদিসের ভাষা এতটাই হৃদয়স্পর্শী যে, আল্লাহ তায়ালা এখানে রোগীর সম্মানকে খোদ নিজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে বান্দাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এটি রোগীর সেবার মর্যাদার এক অনন্য ঘোষণা।
অন্য এক হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোগীকে দেখতে যায়, সে ফিরে না আসা পর্যন্ত জান্নাতের ফল আহরণ করতে থাকে’ (সহিহ মুসলিম : ২৫৬৮)।
এমনকি প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন, ‘যে মুসলিম সকালে কোনো রোগীকে দেখতে যায়, সন্ধ্যা পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য দোয়া করতে থাকেন’ (জামে তিরমিজি : ৯৬৯)।
এ থেকেই সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, রোগীর সেবা কেবল একটি সামাজিক ভদ্রতা বা রীতিনীতি নয়; এটি এমন এক পুণ্যময় ইবাদত, যার জন্য স্বয়ং ফেরেশতারাও রহমতের দোয়া করেন। ইসলামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে অসুস্থ সাহাবিদের খোঁজখবর নিতেন। তিনি অসুস্থ শিশুকে দেখতে গেছেন, এমনকি তাঁর প্রতিবেশী অমুসলিম বালক অসুস্থ হলে তাকেও দেখতে গিয়েছেন (সহিহ বুখারি)। এতে প্রমাণিত হয়, অসুস্থ মানুষের প্রতি সহমর্মিতা কোনো গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়, বরং এটি মানবতার এক সর্বজনীন ও চিরন্তন শিক্ষা।
রোগীর পাশে বসে সুন্নত অনুযায়ী সান্ত্বনা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। রাসুল (সা.) শিখিয়েছেন, ‘কোনো সমস্যা নেই, ইনশাআল্লাহ এই অসুস্থতা তোমার জন্য পাপমুক্তির কারণ হবে’ (সহিহ বুখারি : ৫৬৬২)।
আবার তিনি আরোগ্যের জন্য দোয়া করেছেন এভাবে, ‘হে মানুষের প্রতিপালক! কষ্ট দূর করুন, আপনিই আরোগ্যদানকারী...’ (সহিহ বুখারি : ৫৭৪২)।
আসলে অসুস্থতা মুমিনের জন্য কোনো চূড়ান্ত শাস্তি নয়; বরং ধৈর্য ধারণ করলে তা গুনাহ মোচন ও মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের কোনো ক্লান্তি, রোগ, দুঃখ, কষ্ট, এমনকি একটি কাঁটার আঘাতও হয় না, তবে আল্লাহ এর মাধ্যমে তার গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (সহিহ বুখারি : ৫৬৪১)।
অতএব রোগীর সেবা মানে শুধু একজন মানুষকে শারীরিক সাহায্য করা নয়; এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সহজ পথ, মানবতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ এবং জান্নাত লাভের এক মহৎ আমল। আসুন, আমরা আমাদের অসুস্থ আত্মীয়, প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব কিংবা অপরিচিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে দ্বিধা না করি। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের খোঁজ নিই, তাদের সুস্থতার জন্য দোয়া করি, সাধ্যমতো সহযোগিতা করি।
মনে রাখবেন, একজন অসহায় রোগীর চোখের পানি মুছে দেওয়া কখনো কখনো বহু নফল ইবাদতের চেয়েও অধিক প্রভাবশালী আমল হতে পারে। মানুষের সেবার মাঝেই আল্লাহর সন্তুষ্টি নিহিত। আর রোগীর সেবার মধ্যেই রয়েছে মানবতার সর্বোচ্চ সৌন্দর্য, ঈমানের উজ্জ্বল প্রকাশ এবং ইবাদতের এক মহিমান্বিত অধ্যায়।
প্রভাষক, মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম
সময়ের আলো/জেডি