মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে এমন কিছু আয়াত নাজিল করেছেন যা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সব ক্ষেত্রেই সফলতার চিরন্তন দিকনির্দেশনা প্রদান করে। সুরা আলে ইমরানের ১০২-১০৪ নম্বর আয়াত তেমনই এক অনন্য নসিহত। এ তিনটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে তাকওয়া অবলম্বন, ইসলামের ওপর অটল থাকা, ঐক্য রক্ষা এবং সমাজে সৎকাজ প্রতিষ্ঠার মহান দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো এবং মুসলিম না হয়ে কখনো মৃত্যুবরণ করো না’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১০২)।
এই আয়াত একজন মুমিনের জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়। আল্লাহভীতি বা তাকওয়া কেবল মুখের কথা নয়; এটি এমন একটি অন্তরের গুণ, যা মানুষকে সর্বদা আল্লাহর আদেশ পালন এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করে। একজন মুমিনের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করে তার শেষ পরিণতির ওপর। তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত এমনভাবে অতিবাহিত করা উচিত, যেন মৃত্যুর সময় আমরা ইসলামের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারি।
এরপর মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো যখন তোমরা পরস্পরের শত্রু ছিলে, তখন তিনি তোমাদের অন্তরে ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা ভাই ভাই হয়ে গেছো’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১০৩)।
এ আয়াত মুসলিম উম্মাহর জন্য ঐক্যের সনদ। এখানে ‘আল্লাহর রজ্জু’ বলতে কুরআন, সুন্নাহ এবং ইসলামের সুদৃঢ় জীবনব্যবস্থাকে বোঝানো হয়েছে। আজ আমরা দল, মত, গোত্র, রাজনৈতিক বিভাজন ও ব্যক্তিস্বার্থের কারণে একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছি। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু বিভেদ নয়; প্রতিযোগিতা থাকতে পারে, কিন্তু শত্রুতা নয়; ভিন্নমত থাকতে পারে, কিন্তু ভ্রাতৃত্ব নষ্ট করা যাবে না।
ঐক্যই মুসলিম জাতির শক্তি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন মুসলমানরা কুরআন ও সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করেছে, তখন তারা বিশ্বে নেতৃত্ব দিয়েছে। আর যখন বিভক্ত হয়েছে, তখন দুর্বলতা, অপমান ও পরাজয় তাদের অনুসরণ করেছে।
মহান আল্লাহ এরপর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের কথা উল্লেখ করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের নির্দেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে।
আর তারাই সফলকাম’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১০৪)। একজন মুসলিম কেবল নিজের ইবাদত নিয়েই ব্যস্ত থাকবে এটি ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং তিনি সমাজের একজন দায়িত্বশীল সদস্য। পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাঙ্গনে এবং সমাজের সর্বস্তরে সত্য, ন্যায়, সততা ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের দায়িত্ব। তবে এ কাজ অবশ্যই জ্ঞান, প্রজ্ঞা, উত্তম চরিত্র ও কোমল আচরণের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে।
আজ আমাদের সমাজে হিংসা, বিদ্বেষ, দুর্নীতি, মিথ্যাচার, বিভাজন ও নৈতিক অবক্ষয় উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হলো আমরা তাকওয়ার জীবন থেকে দূরে সরে গেছি, কুরআনের শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছি এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে বিরত রাখার দায়িত্বকে অবহেলা করেছি।
যদি ব্যক্তিজীবনে তাকওয়া, পারিবারিক জীবনে ভালোবাসা, সামাজিক জীবনে ঐক্য এবং জাতীয় জীবনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চাই, তা হলে সুরা আলে ইমরানের এই তিনটি আয়াতকে জীবনের মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
কুরআনের শিক্ষা কেবল তেলাওয়াতের জন্য নয়, বরং তা বাস্তবায়নের জন্য। ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্রÑ সব স্তরে কুরআনের নির্দেশনা অনুসরণ করলেই প্রকৃত শান্তি, স্থিতি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও