দেশপ্রেম থেকে পুণ্যের সন্ধান

আমীনুর রহমান নড়াইলী

ইসলাম

মানুষ স্বভাবতই তার জন্মভূমিকে ভালোবাসে। যে মাটিতে তার জন্ম, যে পরিবেশে তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে, যে দেশের বাতাসে সে বেড়ে উঠেছে,

2026-07-18T09:11:21+00:00
2026-07-18T09:11:21+00:00
 
  শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬,
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
ইসলাম
দেশপ্রেম থেকে পুণ্যের সন্ধান
আমীনুর রহমান নড়াইলী
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬, ৯:১১ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মানুষ স্বভাবতই তার জন্মভূমিকে ভালোবাসে। যে মাটিতে তার জন্ম, যে পরিবেশে তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে, যে দেশের বাতাসে সে বেড়ে উঠেছে, সেই দেশের প্রতি মমত্ববোধ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। তাই দেশপ্রেম কোনো কৃত্রিম অনুভূতি নয়; বরং এটি মানুষের ফিতরাত বা স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যের অংশ। 

ইসলাম মানবজীবনের স্বাভাবিক ও কল্যাণকর সব অনুভূতিকেই স্বীকৃতি দিয়েছে। দেশপ্রেমও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে ইসলামে দেশপ্রেম কেবল আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা ন্যায়, কল্যাণ, দায়িত্ববোধ ও মানবসেবার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়।

দেশপ্রেম মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি
ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা ও অনুভূতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছে। মানুষ তার জন্মভূমিকে ভালোবাসবে, তার উন্নতি কামনা করবে- এটাই স্বাভাবিক। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যদি আমি তাদের নির্দেশ দিতাম যে, নিজেদের হত্যা করো অথবা নিজেদের আবাসভূমি থেকে বের হয়ে যাও, তবে তাদের অল্পসংখ্যক লোকই তা করত’ (সুরা আন-নিসা : ৬৬)। এ আয়াতে নিজ ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়াকে অত্যন্ত কষ্টকর বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা মানুষের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত একটি অনুভূতি।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে দেশপ্রেম
দেশপ্রেমের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন থেকে। মক্কা ছিল তাঁর জন্মভূমি। মক্কার অধিবাসীরা যখন তাঁকে নির্যাতন করে মদিনায় হিজরতে বাধ্য করল, তখন তিনি গভীর বেদনার সঙ্গে মক্কার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘হে মক্কা! আল্লাহর কসম, তুমি আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় ভূমি এবং আমার কাছেও সর্বাধিক প্রিয়। যদি তোমার অধিবাসীরা আমাকে বের করে না দিত, তবে আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যেতাম না’ (তিরমিজি)। 

এই হাদিস প্রমাণ করে, নিজের দেশ ও জন্মভূমিকে ভালোবাসা সুন্নাহসম্মত এবং মানবীয় একটি মহৎ গুণ। মদিনায় হিজরতের পরও রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কার স্মৃতিচারণা করতেন। আবার মদিনাকেও তিনি গভীরভাবে ভালোবাসতেন। তিনি দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি আমাদের কাছে মদিনাকে এমন প্রিয় করে দাও, যেমন আমরা মক্কাকে ভালোবাসি, বরং তার চেয়েও বেশি’ (বুখারি)। এ থেকে বোঝা যায়, একজন মুসলমান তার বসবাসের স্থান ও দেশের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করবে এবং তার কল্যাণ কামনা করবে।

ইসলামে দেশপ্রেমের প্রকৃত অর্থ
অনেকেই দেশপ্রেমকে শুধু স্লোগান, আবেগ কিংবা আনুষ্ঠানিকতা মনে করেন। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত দেশপ্রেম হলো দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করা, দেশের সম্পদ রক্ষা করা, আইন মেনে চলা, দুর্নীতি পরিহার করা এবং সমাজে ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা। দেশপ্রেম মানে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষা করা। দেশের সম্পদ ও পরিবেশ সংরক্ষণ করা। 

দুর্নীতি, অনিয়ম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। নাগরিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা। দেশের মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো। শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিকতার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেওয়া। সুতরাং মুখে দেশপ্রেমের বুলি আওড়ানো নয়, বরং কর্মের মাধ্যমে দেশকে ভালোবাসাই ইসলামের শিক্ষা।

দেশপ্রেম ও মানবসেবা
ইসলাম মানবকল্যাণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে মানুষের উপকার করে’ (মুজামুল আওসাত)। দেশ তো মূলত মানুষের সমষ্টি। তাই দেশের মানুষের সেবা করাও এক ধরনের দেশপ্রেম। ক্ষুধার্তকে খাদ্যদান, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো, শিক্ষার প্রসারে কাজ করা, অসুস্থের সেবা করা এসবই দেশপ্রেমের বাস্তব রূপ। আজ আমাদের সমাজে দরিদ্র, অসহায়, পথশিশু, বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কম নয়। তাদের কল্যাণে কাজ করা এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখা একজন সচেতন মুসলমানের দায়িত্ব।

দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন দেশপ্রেমের অংশ
দুর্নীতি একটি দেশের উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়। ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, কর ফাঁকি ও সরকারি সম্পদের অপব্যবহার দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। ইসলাম এসব কর্মকাণ্ডকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না’ (সুরা আল-বাকারা : ১৮৮)। যে ব্যক্তি নিজের স্বার্থে দেশের সম্পদ নষ্ট করে, সে প্রকৃত অর্থে দেশপ্রেমিক হতে পারে না। কারণ দেশপ্রেম মানে দেশের কল্যাণে কাজ করা, ক্ষতি সাধন করা নয়।

পরিবেশ সংরক্ষণও দেশপ্রেম
বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ দূষণ একটি বড় সংকট। নদী দখল, বন উজাড়, বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ দেশের পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলছে। ইসলাম পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তেও কারও হাতে একটি চারা গাছ থাকে এবং সে তা রোপণ করতে সক্ষম হয়, তবে সে যেন তা রোপণ করে’ (মুসনাদে আহমদ)। পরিবেশ রক্ষা, বৃক্ষরোপণ, নদী-খাল সংরক্ষণ এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা দেশপ্রেমের গুরুত্বপূর্ণ দিক। কারণ একটি সুন্দর ও বাসযোগ্য দেশ গড়ে তোলা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।

জাতীয় ঐক্য ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা
একটি দেশের অগ্রগতির জন্য জাতীয় ঐক্য অপরিহার্য। বিভেদ, হিংসা, বিদ্বেষ ও সংঘাত জাতিকে দুর্বল করে। ইসলাম ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না’ (সুরা আলে ইমরান : ১০৩)। ধর্ম, বর্ণ, ভাষা কিংবা মতের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও একটি দেশের নাগরিক হিসেবে সবাইকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। সমাজে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ প্রতিষ্ঠা প্রকৃত দেশপ্রেমের পরিচায়ক।

আমাদের দেশপ্রেম যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতা, স্লোগান বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং সততা, ন্যায়পরায়ণতা, মানবসেবা, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে নিরলস কাজের মাধ্যমে আমরা প্রকৃত দেশপ্রেমের পরিচয় দিই; তা হলেই গড়ে উঠবে একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও


  বিষয়:   দেশপ্রেম  পুণ্যের সন্ধান  পরিবেশ  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: