হিংসা অন্তরের ব্যাধি

সৈয়দ আবুল হাসনাত জিসান

ইসলাম

মানুষের অন্তর মহান আল্লাহর রহমতের এক অপূর্ব নিদর্শন। এই অন্তর যখন ঈমান, কৃতজ্ঞতা ও আল্লাহভীতির আলোয় উদ্ভাসিত থাকে, তখন মানুষের

2026-07-17T15:19:48+00:00
2026-07-17T15:19:48+00:00
 
  শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬,
২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
ইসলাম
হিংসা অন্তরের ব্যাধি
সৈয়দ আবুল হাসনাত জিসান
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬, ৩:১৯ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মানুষের অন্তর মহান আল্লাহর রহমতের এক অপূর্ব নিদর্শন। এই অন্তর যখন ঈমান, কৃতজ্ঞতা ও আল্লাহভীতির আলোয় উদ্ভাসিত থাকে, তখন মানুষের জীবন হয়ে ওঠে প্রশান্ত ও কল্যাণময়। কিন্তু এই অন্তরের মধ্যেই এমন কিছু ব্যাধি জন্ম নেয়, যা মানুষের আত্মিক জীবনকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দেয়। তন্মধ্যে হিংসা বা হাসাদ অন্যতম ভয়ংকর। এটি এমন এক নীরব ব্যাধি, যা বাহ্যিকভাবে দৃশ্যমান না হলেও মানুষের চরিত্র, সম্পর্ক ও ঈমানি জীবনকে গভীরভাবে আক্রান্ত করে।

ইসলামি দৃষ্টিতে হিংসা কেবল একটি নৈতিক দুর্বলতা নয়; বরং এটি এমন এক আত্মিক ব্যাধি, যা ঈমানের সৌন্দর্যকে ক্ষুণ্ন করে। কারণ ঈমানের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টি (রিদা বিল কদর) এবং তাঁর বণ্টনের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা। হিংসা সেই আস্থার ভিতেই আঘাত হানে এবং মানুষকে অজান্তেই আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি অসন্তুষ্ট করে তোলে। পবিত্র কুরআনের সুরা ফালাকে আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে একটি গভীর বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, ‘হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে’ (সুরা ফালাক : ৫)। 

এই সংক্ষিপ্ত আয়াতের গভীরতা অসীম। এখানে আল্লাহ তায়ালা হিংসাকে এমন একটি অনিষ্ট হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যার ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য স্বয়ং তাঁর আশ্রয় গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, হিংসা কেবল সামাজিক সমস্যা নয়; এটি একটি আত্মার বিপর্যয়, যার প্রভাব ব্যক্তিগত সীমা ছাড়িয়ে সমাজব্যবস্থাকেও অস্থিতিশীল করে তোলে।

হিংসা মূলত তখনই জন্ম নেয়, যখন একজন মানুষ অন্যের প্রাপ্ত নেয়ামতকে নিজের জন্য কামনা করে এবং সেই নেয়ামতের বিলুপ্তি চায়। এটি কেবল অন্যের ক্ষতি কামনা নয়; বরং নিজের অন্তরের অশান্তিকে স্থায়ী করে তোলার এক আত্মঘাতী প্রবণতা। কারণ হিংসুক ব্যক্তি কখনো শান্তি লাভ করে না। সে সবসময় অন্যের সাফল্যের ছায়ায় নিজের ব্যর্থতাকে বড় করে দেখে। পবিত্র কুরআনে এই মানসিকতার বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কতা প্রদান করেছে। 

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘তারা কি মানুষের প্রতি এ কারণে হিংসা করে যে, আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহে তাদের যা দিয়েছেন তার কারণে?’ (সুরা নিসা : ৫৪)। এই আয়াত হিংসার মূল মনস্তাত্ত্বিক কারণকে উন্মোচন করে দেয় আল্লাহর বণ্টনের প্রতি অসন্তুষ্টি এবং নিজেকে বঞ্চিত মনে করার এক অন্তর্গত ব্যথা। অথচ বাস্তবতা হলো, দুনিয়ার প্রতিটি নেয়ামত নির্ধারিত, পরিমিত ও পরীক্ষামূলক। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো সেই ফয়সালার প্রতি নত থাকা, অভিযোগ নয় বরং আল্লাহর অনুগ্রহ কামনা করতে বলা হয়েছে। 

পবিত্র কুরআনের সুরা নিসার ৩২ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ কামনা করো।’ এই আয়াতের মাধ্যমে মুমিনকে শেখানো হয়েছে অন্যের প্রাপ্তি দেখে হিংসা নয়, বরং আল্লাহর কাছেই নিজের কল্যাণ ও অনুগ্রহ কামনা করতে হবে। কারণ রিজিক ও মর্যাদার প্রকৃত মালিক একমাত্র আল্লাহ। হিংসার আরেকটি বড় দিক হলো এটি ধীরে ধীরে নেক আমলকে ধ্বংস করে। 

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন হাদিসে হিংসা ও বিদ্বেষের বিষয়ে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে নবী করিম (সা.) বলেন, ‘তোমরা হিংসা থেকে দূরে থাকো। হিংসা নেক আমলগুলোকে তেমনি বরবাদ করে দেয়, যেমন আগুন লাকড়িকে জ্বালিয়ে ভস্মীভূত করে ফেলে।’

ইতিহাসে হিংসার ভয়াবহ পরিণতির সবচেয়ে সুস্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় হজরত ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনায়। তাঁর ভাইয়েরা পিতার স্নেহে তাঁর বিশেষ অবস্থান দেখে হিংসায় অন্ধ হয়ে পড়েছিল। সেই হিংসা তাদের এমন এক অপরাধে নিয়ে যায় যা শুধু পারিবারিক সম্পর্ক নয়, মানবিকতার সীমাকেও লঙ্ঘন করে। তারা এক নিরপরাধ ভাইকে কূপে নিক্ষেপ করে। এই ঘটনা কুরআনে মানব মনস্তত্ত্বের এক চিরন্তন চিত্র হয়ে রয়েছে- হিংসা যখন বিবেককে পরাজিত করে, তখন মানুষ নিজের আপনজনের প্রতিও নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে পারে।


আজকের আধুনিক সমাজে হিংসার রূপ আরও জটিল ও বিস্তৃত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, প্রতিযোগিতামূলক জীবনধারা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং বাহ্যিক প্রদর্শন মানুষকে অজান্তেই তুলনামূলক মানসিকতার দিকে ঠেলে দেয়। মানুষ নিজের নেয়ামতের হিসাব না করে অন্যের প্রদর্শিত জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করে ফেলে। এর ফলাফল হিসেবে জন্ম নেয় অপ্রয়োজনীয় দুঃখ, অসন্তোষ এবং ধীরে ধীরে হিংসার মানসিকতা। 

অথচ ইসলাম মানুষকে এই তুলনামূলক মানসিকতা থেকে বের হয়ে এসে কৃতজ্ঞতার শিক্ষা দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যদি তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা করতে চাও, তবে তা গণনা করে শেষ করতে পারবে না’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ৩৪)। এই আয়াত মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় প্রত্যেক মানুষের জীবনই অগণিত নেয়ামতে পরিপূর্ণ। প্রয়োজন কেবল দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, যা আছে তা উপলব্ধি করা এবং যা নেই তার জন্য ধৈর্যধারণ করা।

হিংসা থেকে মুক্তির পথ মূলত আত্মশুদ্ধির পথ। এর জন্য প্রয়োজন তাকদিরের প্রতি পূর্ণ সন্তুষ্টি, নিজের প্রাপ্ত নেয়ামতের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা এবং অন্যের জন্য কল্যাণ কামনা ও দোয়া করা। যখন একজন মানুষ নিজের অর্জিত নেয়ামতের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে এবং অন্যের সাফল্যে আনন্দিত হতে শেখে, তখনই তার অন্তর হিংসার অন্ধকার থেকে মুক্তি পায়। 

প্রকৃত সুখ কখনো অন্যের অবস্থার ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং তা অন্তরের প্রশান্তি ও আল্লাহর প্রতি আস্থা থেকে জন্ম নেয়। তাই হৃদয়ের পবিত্রতা রক্ষায় কুরআনের শিক্ষা, দোয়া ও আত্মশুদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। যে হৃদয় কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ, বিদ্বেষমুক্ত এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট, সেই হৃদয়ই প্রকৃত অর্থে জীবিত ও শান্তিময়।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও


  বিষয়:   হিংসা  অন্তরের ব্যাধি 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: