সফর মাসের তাৎপর্য, করণীয় ও বর্জনীয়

মাওলানা আবদুল হামিদ

ইসলাম

হিজরি বর্ষের দ্বিতীয় মাস সফর। ইসলামি ক্যালেন্ডারের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মাস হওয়া সত্ত্বেও ঐতিহাসিক ও সামাজিকভাবে মাসটি নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনার

2026-07-17T13:59:55+00:00
2026-07-17T13:59:55+00:00
 
  শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬,
২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
ইসলাম
সফর মাসের তাৎপর্য, করণীয় ও বর্জনীয়
মাওলানা আবদুল হামিদ
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬, ১:৫৯ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
হিজরি বর্ষের দ্বিতীয় মাস সফর। ইসলামি ক্যালেন্ডারের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মাস হওয়া সত্ত্বেও ঐতিহাসিক ও সামাজিকভাবে মাসটি নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ইসলামের সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বিশ্বাসের নির্মলতা রক্ষার খাতিরে এই মাসটি নিয়ে সঠিক ও বিশুদ্ধ জ্ঞানার্জন প্রতিটি মুমিনের জন্য অপরিহার্য। ইসলাম আল্লাহ তায়ালার নির্দেশিত পথে সময়, দিন ও মাসকে বিচার করে। তবে সফর মাসকে কোনো বিশেষ অশুভ বা অকল্যাণের মাস হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। 

বরং বিশুদ্ধ ঈমানের সঙ্গে আল্লাহর হুকুমগুলো পালন করা, সোম ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখা, আইয়ামে বিজ তথা আরবি মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখে রোজা রাখা এবং সর্বোপরি সর্বদা আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকার মধ্য দিয়ে এ মাসও একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান ও বরকতময় হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং নিত্যদিনের নফল ইবাদত বা অন্যান্য মাসের আমলের মতো এ মাসেও আমল করতে কোনো বাধা নেই।

জাহেলি যুগের কুসংস্কার ও ইসলামের অবস্থান
ইসলামপূর্ব জাহেলি যুগে সফর মাসকে ঘিরে ছিল নানা ধরনের কুসংস্কারের ঘনঘটা। তৎকালীন মানুষ মনে করত, বছরের সবচেয়ে অশুভ, অকল্যাণকর ও বিপদাপদপূর্ণ সময় হলো এই সফর মাস। তাদের বদ্ধমূল ধারণা ছিল, এই মাসে কোনো নতুন কাজ শুরু করা অমঙ্গলজনক। বিশেষ করে এই মাসে বিয়েশাদি করাকে তারা চরম দুর্ভাগ্য মনে করত। 

ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা যাওয়া, কোথাও ভ্রমণে যাওয়া বা যাত্রা শুরু করাকে তারা অশুভ লক্ষণ হিসেবে গণ্য করত। এ ছাড়া শিষ্ট-অনিষ্ট, সৎ-অসৎ শক্তির প্রভাব, সংক্রামক ব্যাধির বিস্তার এবং আঞ্চলিক ভাষায় ‘ছাৎ-কুছাৎ’ জাতীয় অগণিত কুধারণার জালে তারা আবদ্ধ ছিল। ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে এসে এই সব অন্ধকারের অবসান ঘটে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অতঃপর যখন শুভদিন ফিরে আসে, তখন তারা বলতে আরম্ভ করে যে, এটাই আমাদের জন্য উপযোগী। 

আর যদি অকল্যাণ এসে উপস্থিত হয় তবে তাতে মুসার এবং তাঁর সঙ্গীদের অলক্ষণ বলে অভিহিত করে’ (সুরা আরাফ : ১৩১)। এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মানুষের মনগড়া কুলক্ষণ ও অশুভ ধারণার তীব্র নিন্দা করেছেন। এটি প্রমাণ করে যে, অশুভ শক্তির ওপর ভরসা করা বা কোনো বিশেষ সময়কে অমঙ্গলজনক মনে করা ইসলামের শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত। নবীজি (সা.) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, ‘সংক্রমক ব্যাধি, কুলক্ষণ, অনাহারে পেট কামড়ানো পোকা ও হামাহ এসবের কোনো অস্তিত্ব নেই।’ (মুসলিম : ৫৬৮২)

ভিত্তিহীন হাদিস ও বাস্তবতা
জাহেলি যুগের সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন কুসংস্কারকে যারা ইসলামের নামে টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল, তারা নানা ধরনের বানোয়াট ও জাল হাদিস তৈরির অপপ্রয়াস চালিয়েছে। যেমন একটি প্রসিদ্ধ জাল হাদিস হলো- ‘যে ব্যক্তি আমাকে সফর মাস শেষ হওয়ার সুসংবাদ দেবে, আমি তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দেব।’ 

এই হাদিস প্রচারকারীদের দাবি ছিল, স্বয়ং রাসুল (সা.) সফর মাসের দ্রুত অবসান কামনা করেছেন, কারণ এটি নাকি অশুভ মাস। তাই এই মাসে বেশি বেশি ইবাদত করে বিপদ থেকে মুক্তি পেতে আল্লাহর দরবারে রোনাজারি করতে হবে। এই হাদিস সম্পর্কে ফাতাওয়া শাস্ত্রের অভিজ্ঞ আলেমদের সুস্পষ্ট মত হলো হাদিসটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন এবং বানোয়াট। 

রাসুল (সা.) থেকে এর কোনো সহিহ বা জয়িফ সনদও প্রমাণিত নেই। ফাতাওয়া হিন্দিয়া ও জাওয়াহিরুল ফাতওয়ায় একে নিরেট মিথ্যা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তর্কের খাতিরে যদি কেউ এর কোনো অস্তিত্ব স্বীকারও করতে চায়, তবে তা একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ভুল ব্যাখ্যা মাত্র।

প্রকৃতপক্ষে হজরত আবু বকর (রা.) যখন ইসলামের দাওয়াত নিয়ে দূরে সফরে গিয়ে ফিরে আসতে বিলম্ব করছিলেন, তখন রাসুল (সা.) তাঁর চিন্তায় ব্যথিত হয়েছিলেন। তখন আবু বকর (রা.) থেকে একটি চিঠি আসে, যেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি সফর মাস শেষ হওয়ার পর মদিনায় ফিরব।’ তখন সেই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে রাসুল (সা.) তাঁর অপেক্ষার কষ্ট লাঘব করার জন্য সফর মাসের উল্লেখ করেছিলেন। একে কোনো কুসংস্কারের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা চরম ধৃষ্টতা।

আখেরি চাহার সোম্বাহ
দুঃখজনক হলেও সত্য, আধুনিক শিক্ষিত সমাজেও একশ্রেণির মানুষ এখনও এসব কুসংস্কারের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেনি। বাংলাদেশে সফর মাসকে ঘিরে যে বড় ধরনের বিভ্রান্তিটি লক্ষণীয়, তা হলো ‘আখেরি চাহার সোম্বাহ’ বা মাসের শেষ বুধবার পালন। ফারসি শব্দ ‘আখেরি চাহার সোম্বাহ’ মানে মাসের শেষ বুধবার। 

প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, নবীজি (সা.) সফর মাসে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মাসের শেষ বুধবার সুস্থতা বোধ করেন। এরপর তিনি সাত মশক পানি দিয়ে গোসল করেন। এই খুশিতে সাহাবায়ে কেরাম দান-সদকা করেন। বাস্তবতা হলো, এই গল্পের কোনো গ্রহণযোগ্য ভিত্তি রাসুল (সা.), সাহাবায়ে কেরাম কিংবা তাবেয়িদের নির্ভরযোগ্য কোনো বক্তব্যে খুঁজে পাওয়া যায় না। এক শ্রেণির অসতর্ক বক্তা মনগড়া মুখরোচক গল্প বানিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। 

রাসুল (সা.) তাঁর জীবদ্দশায় অনেক বিপদ ও প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছেন এবং সেখান থেকে মুক্তি পেয়েছেন, কিন্তু কোনো সাহাবি কখনো বছর বছর ঘুরে সেই মুক্তির দিনটিকে বিশেষ ইবাদতের দিবস হিসেবে পালন করেছেন এমন কোনো প্রমাণ ইসলামের ইতিহাসে নেই। অথচ আমাদের দেশে একে কেন্দ্র করে ইবাদতের নামে নানা রেওয়াজ ও রসম-রেওয়াজ চালু করা হয়েছে।

শিরক ও বেদাত থেকে সতর্ক থাকা
এসব ইবাদতের সওয়াব অন্যান্য দিনের তুলনায় বেশি পাওয়ার ব্যাপারে শরিয়তে কোনো ভিত্তি নেই। এ ধরনের কাজগুলো মানুষকে প্রকারান্তরে শিরক ও বেদাতের দিকে ঠেলে দেয়। রাসুল (সা.) কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, ‘কেউ আমাদের এই শরিয়তে নতুন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যাত’ (বুখারি : ২৬৯৭)। 

অন্য হাদিসে এসেছে, ‘দ্বীনের ভেতর নব-আবিষ্কার থেকে সাবধান! কারণ প্রতিটি নব-আবিষ্কার হলো বেদাত এবং প্রতিটি বেদাত ভ্রষ্টতার দিকে নিয়ে যায়’ (আবু দাউদ : ৪৬০৭)। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো, শিরক ও বেদাত সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করা এবং খুব সতর্কতার সঙ্গে নিজেকে এসব থেকে বাঁচিয়ে রাখা। মনে রাখতে হবে, মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষণ আল্লাহ প্রদত্ত আমানত। 

দিন, মাস ও বছরের আবর্তনে সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। সময়ের ভেতর শুভ-অশুভের দেয়াল তুলে কখনো ইবাদতে মগ্ন হওয়া, আবার কখনো অলসতায় গা ভাসিয়ে দেওয়া কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বরং প্রতিটি মুহূর্তকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে কাজে লাগিয়ে পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করাই হলো প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য। ইসলামে সময়ের কোনো অংশই জন্মগতভাবে অভিশপ্ত নয়; আমাদের কর্মই সময়কে বরকতময় বা অশুভ করে তোলে। তাই অজ্ঞতা পরিহার করে কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক আলোকে জীবন পরিচালনা করাই হলো সফলতা লাভের একমাত্র পথ। 

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও


  বিষয়:   সফর মাস  তাৎপর্য  করণীয়  বর্জনীয় 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: