মধ্য এশিয়ার দেশ উজবেকিস্তান কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি নয়, এটা মুসলিম বিশ্ব ও জ্ঞানচর্চার এক গৌরবোজ্জ্বল কেন্দ্র। সমরখন্দ, বুখারা ও খিভার মতো ঐতিহাসিক নগরীগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইসলামি সভ্যতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শনের ধারক হয়ে আছে।
এই জ্ঞানতপস্বীদের ভূমিতে শায়িত আছেন হাদিস শাস্ত্রের শ্রেষ্ঠ সংকলক ‘আমিরুল মুমিনিন ফিল হাদিস’ ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল বুখারি (রহ.)। সমরখন্দের মাটিতে তার সমাধি আজ বিশ্বের কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানের কাছে পরম শ্রদ্ধার স্থান। তার সমাধি আজও জ্ঞানপিপাসু ও ধর্মপ্রাণ মানুষের জন্য এক পবিত্র ও আবেগের জায়গা।
ইমাম বুখারি (রহ.)-এর জন্ম বুখারা শহরে হলেও তার জীবনাবসান ও শেষ ঠিকানা হয়েছে সমরখন্দে। তিনি ৮১০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন উজবেকিস্তানের বুখারা নগরীতে এবং হাদিসশাস্ত্রে অসামান্য অবদান রেখে ৮৭০ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। জীবনের শেষ সময় তিনি সমরখন্দের কাছে খারতাং গ্রামে অবস্থান করছিলেন। সেখানেই তাকে দাফন করা হয়। ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়, মৃত্যুর পর যখন তাকে দাফন করে সবাই ফিরে আসছিলেন, তখন উপস্থিত মানুষ তার কবর থেকে অলৌকিক সুঘ্রাণ অনুভব করেছিলেন।
কেউ কেউ কবরের ওপর আসমান থেকে নেমে আসা নুরানি আলোর বিচ্ছুরণ দেখেছিলেন। এসব অলৌকিক ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা ছুটে আসেন। তাদের অতি ভক্তির কারণে কবরের মাটি পর্যন্ত বরকত হিসেবে সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়ার অবস্থা তৈরি হয়েছিল, যা নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষকে তখন কাঠের বেড়া দিতে হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এই সমাধি ধীরে ধীরে একটি স্মৃতিসৌধে রূপ নেয়, যা শুধু একজন মহান মুহাদ্দিসের শেষ ঠিকানাই নয়, বরং ইসলামি সভ্যতার জ্ঞানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার প্রতীক।
ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত সমাধিটি বেশ সাধারণভাবে ছিল। কালক্রমে এর মর্যাদা ও গুরুত্ব বিবেচনায় সেখানে মসজিদ নির্মাণ করা হয় এবং সমাধি এলাকাকে কনক্রিট দ্বারা সুরক্ষিত করা হয়। বর্তমান সময়ে উজবেকিস্তান সরকারের বিশেষ উদ্যোগ এবং সৌদি আরবের সহযোগিতায় সমাধিটি এক নান্দনিক ও বিশাল কমপ্লেক্সে রূপান্তরিত হয়েছে। আধুনিক স্থাপত্যশৈলী ও প্রাচীন উজবেক নকশার সমন্বয়ে গঠিত এই স্মৃতিসৌধে রয়েছে বিশাল গম্বুজ এবং সুদৃশ্য মিনার।
সবুজাভ গম্বুজ, সাদা মার্বেলের দেয়াল এবং প্রশস্ত প্রাঙ্গণ- সব মিলিয়ে এটি একটি শান্ত ও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এর ভেতরে মোজাইক পাথর ও রঙিন কাচের কারুকাজ এবং আরবি ক্যালিগ্রাফির অসাধারণ সমন্বয় একে পর্যটকদের জন্য এক অনন্য দর্শনীয় স্থানে পরিণত করেছে। এখানে একটি মসজিদ, লাইব্রেরি এবং দর্শনার্থীদের জন্য সুব্যবস্থা রয়েছে।
এই কমপ্লেক্সটি শুধু একটি সমাধি নয়, বরং এটি একটি প্রাণবন্ত জ্ঞানকেন্দ্র। মসজিদের বিশাল আঙিনায় নামাজ আদায়ের পাশাপাশি এখানে হাদিসের শিক্ষার্থীরা ইলমে নববীর চর্চা করেন। কমপ্লেক্সের বিশাল আঙিনায় রোপণ করা নানা ধরনের ফুল ও ফলের গাছ স্থানটিকে এক শান্ত ও আধ্যাত্মিক আবহ প্রদান করে। সারা বছরই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাদিসপ্রেমীরা প্রিয় শায়খের ফয়েজ ও বরকত নিতে এখানে সমবেত হন।
বর্তমান সময়ে উজবেকিস্তান সরকার এই স্থানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে। আন্তর্জাতিক পর্যটকরাও এখানে ভিড় করেন, বিশেষ করে যারা ইসলামি ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে আগ্রহী। ফলে ইমাম বুখারির সমাধি কমপ্লেক্স শুধু ধর্মীয় নয়, বরং সাংস্কৃতিক বিনিময়েরও একটি কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে।
সময়ের আলো/আআ