মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য তার চেহারা, ধন-সম্পদ কিংবা সামাজিক মর্যাদায় নয়; বরং তার চরিত্র, আচার-আচরণ ও নৈতিক গুণাবলিতে। এসব গুণের মধ্যে বিনয় এমন এক মহৎ গুণ, যা মানুষকে আল্লাহর প্রিয় বান্দা এবং মানুষের কাছে শ্রদ্ধাভাজন করে তোলে। বিনয় অহংকারের বিপরীত। এটি দুর্বলতার পরিচয় নয়; বরং আত্মমর্যাদা বজায় রেখে আল্লাহর সামনে নিজেকে নত করা এবং মানুষের সঙ্গে নম্র ও সৌজন্যমূলক আচরণ করার নামই বিনয়।
ইসলাম মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে তাকে উত্তম চরিত্রের অধিকারী হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। তাই কুরআন ও সুন্নাহজুড়ে বিনয়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘রহমানের বান্দারা তারা, যারা পৃথিবীতে বিনম্রভাবে চলাফেরা করে। আর যখন মূর্খরা তাদের সম্বোধন করে, তখন তারা শান্তির কথা বলে’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৬৩)। এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় বান্দাদের প্রথম পরিচয়ই দিয়েছেন বিনয়ের মাধ্যমে।
প্রকৃত মুমিন কখনো রূঢ় কিংবা অহংকারী হতে পারে না। তার প্রতিটি পদক্ষেপে থাকে শালীনতা, নম্রতা ও আত্মসংযম। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘মানুষের প্রতি অহংকারবশত মুখ ফিরিয়ে নিও না এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে চলাফেরা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক ও অহংকারীকে ভালোবাসেন না’ (সুরা লোকমান, আয়াত : ১৮-১৯)।
অন্যত্র রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘আপনি আপনার অনুসারী মুমিনদের প্রতি আপনার ডানা অবনত করে দিন’ (সুরা শুআরা, আয়াত : ২১৫)। এ থেকে বোঝা যায়, বিনয় কেবল সাধারণ মানুষের জন্য নয়; বরং নেতা, শিক্ষক, আলেম, দাই ও সমাজের প্রতিটি শ্রেণির মানুষের জন্য অপরিহার্য একটি গুণ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন বিনয়ের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তিনি ছিলেন পুরো মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা, অথচ তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত সরল ও বিনয়পূর্ণ। তিনি নিজ হাতে জুতা মেরামত করতেন, পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন, অসুস্থদের খোঁজখবর নিতেন, দরিদ্রদের পাশে বসতেন, শিশুদের সালাম দিতেন এবং সাধারণ মানুষের দাওয়াতও সানন্দে গ্রহণ করতেন। ক্ষমতা ও মর্যাদা তাঁকে কখনো অহংকারী করতে পারেনি।
তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনয় অবলম্বন করে, আল্লাহ তাকে মর্যাদায় উন্নীত করেন’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৮)। আরেক হাদিসে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৯১)। আরও ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ আমার কাছে ওহি পাঠিয়েছেন যে তোমরা বিনয় অবলম্বন করো; যাতে কেউ কারও ওপর অহংকার না করে এবং কেউ কারও প্রতি জুলুম না করে’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৮৬৫)। এই হাদিসগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, বিনয় শুধু একটি উত্তম চরিত্র নয়; বরং এটি ঈমানের পূর্ণতার অন্যতম লক্ষণ এবং জান্নাতের পথে চলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ছিলেন বিনয়ের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিপুল ক্ষমতা ও মর্যাদা অর্জনের পরও তাঁরা নিজেদের আল্লাহর ক্ষুদ্র বান্দা মনে করতেন। খিলাফতের সর্বোচ্চ পদে থেকেও তাঁরা সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতেন, জনগণের খোঁজখবর নিতেন এবং নিজেদের সেবক হিসেবে ভাবতেন। তাঁদের এই জীবনাদর্শ আজও মুসলিম সমাজের জন্য অনুকরণীয়। বর্তমান সময়ে মানুষের মধ্যে আত্মপ্রচার, বড়ত্বের প্রতিযোগিতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে জাহির করার প্রবণতা এবং অহংকার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ ইসলাম শেখায়, প্রকৃত সম্মান মানুষের প্রশংসায় নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিতে। যে ব্যক্তি নিজেরকৃতিত্ব নিয়ে অহংকার করে, সে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি বিনয়ী হয়, আল্লাহ তার মর্যাদা মানুষের অন্তরে প্রতিষ্ঠিত করে দেন। বিনয়ের সুফল ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের সর্বত্র দৃশ্যমান। বিনয়ী ব্যক্তি সহজেই মানুষের ভালোবাসা ও আস্থা অর্জন করেন। পরিবারে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি পায়, দাম্পত্য জীবন সুখময় হয়, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক দৃঢ় হয় এবং সমাজে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
একজন বিনয়ী নেতা জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নেন, একজন বিনয়ী আলেম মানুষের আস্থা অর্জন করেন এবং একজন বিনয়ী ব্যবসায়ী সততা ও বিশ্বস্ততার প্রতীক হয়ে উঠেন। অন্যদিকে অহংকার মানুষের ইহকাল ও পরকাল উভয় জীবনকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। অহংকারই ইবলিসকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। অহংকারী ব্যক্তি সত্যকে অস্বীকার করে, অন্যকে তুচ্ছজ্ঞান করে এবং মানুষের ভালোবাসা হারিয়ে ফেলে। তাই একজন মুমিনের উচিত অহংকার থেকে দূরে থাকা এবং সবসময় নিজের ভুল সংশোধনের মানসিকতা রাখা।
বিনয় অর্জনের জন্য আমাদের উচিত আল্লাহর মহত্ত্ব ও নিজের অসহায়ত্ব স্মরণ করা, নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত ও হাদিস অধ্যয়ন করা, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর অনুসরণ করা, গরিব ও অসহায় মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে থাকা, আত্মসমালোচনা করা এবং অহংকারের প্রতিটি কারণ থেকে নিজেকে দূরে রাখা।
মনে রাখতে হবে, মানুষকে ছোট করলে কেউ বড় হয় না; বরং মানুষকে সম্মান করলে নিজের সম্মানই বৃদ্ধি পায়। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, যে যত বড়, সে ততবেশি বিনয়ী। কারণ বিনয় মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে, মানুষের হৃদয়ে স্থান করে দেয় এবং জান্নাতের পথে এগিয়ে দেয়।
আসুন, আমরা সবাই অহংকার, আত্মগর্ব ও আত্মপ্রচার থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহর সামনে বিনীত হই, মানুষের সঙ্গে নম্র আচরণ করি এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে বিনয়কে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করি। কেননা বিনয়ই মুমিনের সর্বশ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য, ঈমানের শোভা এবং জান্নাতমুখী জীবনের অন্যতম ভিত্তি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে বিনয়ী, নম্র ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী হওয়ার তওফিক দান করুন।
প্রভাষক, মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম
সময়ের আলো/আআ