পৃথিবী মানুষের একমাত্র আবাসস্থল। বিশুদ্ধ বায়ু, নির্মল পানি, উর্বর মাটি, সবুজ বনভূমি ও সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের সমন্বয়েই গড়ে ওঠে একটি সুস্থ পরিবেশ। অথচ আধুনিক সভ্যতার দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশের ওপর মানুষের চাপও বহুগুণ বেড়েছে। নির্বিচারে বন উজাড়, নদী দখল ও দূষণ, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, প্লাস্টিকের আগ্রাসন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং শিল্পবর্জ্যরে কারণে পরিবেশ আজ মারাত্মক হুমকির মুখে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশে পরিণত হয়েছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ আমাদের জীবনযাত্রাকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে। এ বাস্তবতায় পরিবেশ রক্ষা কেবল সরকারের একক দায়িত্ব নয়; বরং প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় কর্তব্য। কারণ পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতি শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেই বহন করতে হয়।
ইসলাম প্রকৃতিকে আল্লাহ তায়ালার একটি মহান আমানত হিসেবে বিবেচনা করে। মানুষকে পৃথিবীর মালিক নয়, বরং প্রতিনিধি (খলিফা) হিসেবে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘স্মরণ করো, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বললেন, আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি (খলিফা) সৃষ্টি করতে যাচ্ছি (সুরা বাকারা : ৩০)।’
এই আয়াত মানুষকে পৃথিবীর সম্পদ সংরক্ষণ ও সুষ্ঠুভাবে ব্যবহারের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের কারণে স্থলে ও সাগরে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে, যাতে আল্লাহ তাদেরকে তাদের কিছু কর্মের ফল আস্বাদন করান, যেন তারা ফিরে আসে।’ (সুরা রোম : ৪১)।
আজকের পরিবেশদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রেক্ষাপটে এ আয়াত গভীর তাৎপর্য বহন করে। মানুষের লোভ, অপচয় ও দায়িত্বহীন আচরণই পরিবেশগত সংকটকে তীব্রতর করছে। মহান আল্লাহ আরও নির্দেশ দেন, তোমরা পৃথিবীতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেখানে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না (সুরা আরাফ : ৫৬)।
এই নির্দেশ কেবল সামাজিক অশান্তি নয়, পরিবেশ বিনষ্টকারী সব কর্মকাণ্ড থেকেও বিরত থাকার শিক্ষা দেয়। কুরআনে আল্লাহ আরও বলেন, ‘তিনি আকাশকে সমুন্নত করেছেন এবং ন্যায়সংগত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। অতএব তোমরা সেই ভারসাম্য নষ্ট করো না’ (সুরা রহমান : ৭-৮)।
প্রকৃতির এই ভারসাম্যই পরিবেশের মূল ভিত্তি। বনভূমি ধ্বংস, নদীদূষণ, অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ এবং অপচয় সেই ভারসাম্যকে বিনষ্ট করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনেও পরিবেশ সংরক্ষণের অসংখ্য শিক্ষা রয়েছে। বৃক্ষরোপণকে কেবল পরিবেশগত কাজ নয়, বরং সদকায়ে জারিয়া হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ একটি গাছ বহু বছর ধরে মানুষ ও প্রাণীর উপকার করলে তার সওয়াবও অব্যাহত থাকে। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যদি কোনো মুসলিম একটি গাছ রোপণ করে অথবা কোনো ফসল উৎপাদন করে, অতঃপর তা থেকে মানুষ, পাখি বা কোনো প্রাণী আহার করে, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়’ (সহিহ বুখারি : ২৩২০)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘কেয়ামত সংঘটিত হয়ে গেলেও যদি তোমাদের কারও হাতে একটি চারাগাছ থাকে এবং তা রোপণ করার সুযোগ থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করে’ (মুসনাদ আহমাদ : ১২৯০২)। এ হাদিস মানুষের মাঝে ইতিবাচক কর্মপ্রচেষ্টা, আশা এবং পরিবেশ রক্ষার গুরুত্বকে অনন্যভাবে তুলে ধরে।
পরিবেশ রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং মানবজাতির টিকে থাকার পূর্বশর্ত। ইসলাম মানুষকে প্রকৃতির ধ্বংসকারী নয়, বরং রক্ষক হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা অনুসরণ করে যদি আমরা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পরিবেশবান্ধব আচরণ গড়ে তুলতে পারি, তবে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ, নিরাপদ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ উপহার দেওয়া সম্ভব হবে। মনে রাখতে হবে, পরিবেশ রক্ষার প্রতিটি ছোট উদ্যোগই একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা। আর সেই পরিবর্তনের শুরু হোক আমাদের নিজেদের থেকেই।
লেখক : খতিব, মদীনাতুন নূর মসজিদ কমপ্লেক্স, শ্রীপুর, গাজীপুর