আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুরো জীবনটাই ঘটনাবহুল এবং প্রতিটি ঘটনাতেই আমাদের জন্য রয়েছে শিক্ষা ও চিন্তার অনেক উপাদান। চল্লিশ বছর বয়সে নবুয়ত লাভের আগের জীবনে তিনি অনেক কাজ করেছেন। কখনো মাঠে রাখাল হিসেবে কাজ করেছেন, কখনো বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বিদেশে ভ্রমণ করেছেন।
মক্কার মরুভূমিতে একবার পিতৃহারা বালক মুহাম্মদ প্রতিবেশী বালকদের সঙ্গে মাঠে ছাগল চড়াচ্ছিলেন। নবীজি (সা.)-এর বয়স তখন আট বা দশ। মক্কায় তখনও সন্ধ্যা নামেনি। অন্য সবাই বাড়ির পথ ধরেছে। তিনি সবার থেকে আলাদা হয়ে একটু নির্জনে চলে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফেরার সময় হঠাৎই তাঁর সামনে দুজন লোকের আগমন ঘটে। লোক দুজনকে তিনি আগে কখনো দেখেননি। তাদের চেহারা ছিল অসাধারণ দীপ্তিতে আলোকোজ্জ্বল। নান্দনিক শুভ্রতা ও কোমলতায় সবিশেষ আকর্ষণীয়। তাদের দেহ থেকে যেন আপার্থিব সুগন্ধির বাতাস বইছিল। গায়ের পোশাক ছিল অপরূপ সৌন্দর্যে ভরপুর। আগন্তুকদের একজন অন্যজনকে জিগ্যেস করেন— ইনিই কি তিনি?
এরপর তারা এগিয়ে এসে নবীজি (সা.)-এর বাহুযুগল কোমল ছোঁয়ায় আঁকড়ে ধরেন। একজন অপরজনকে বলেন, একে শুইয়ে দাও। নবীজি (সা.)-কে তারা নিবিড় আদরে শুইয়ে দেন। আগেরজন আবার বলেন, এর বক্ষ বিদীর্ণ করে দাও। এরপর নবীজি (সা.)-এর বক্ষ বিদীর্ণ করা হয়। কিন্তু তাতে নবীজি (সা.) সামান্য পরিমাণ কষ্টও অনুভব করেননি। তাঁর শরীর থেকে বিন্দু পরিমাণ রক্তও বের হয়নি। এরপর তাদের একজন বলেন, এর বুক থেকে হিংসা, বিদ্বেষ, শত্রুতা ও পরশ্রীকাতরতা বের করে দাও। যাকে আদেশ করা হয়, তিনি রক্ত পিণ্ডের মতো কী একটা জিনিস বের করেন এবং ওটা ছুড়ে ফেলে দেন। একইজন পুনরায় বলেন, তাঁর বুকের মাঝে দয়া, মায়া, স্নেহ ও অনুগ্রহ প্রবণতা ঢুকিয়ে দাও।
এ কথা শুনে অন্যজন বুকের ভেতর থেকে যে পরিমাণ জিনিস বের করে ছুড়ে ফেলেছিলেন সেই পরিমাণ রুপার মতো কী একটা জিনিস বক্ষের মধ্যে ভরে দেন। এরপর তারা নবীজি (সা.)-এর ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি নেড়ে বলেন, আমাদের কাজ শেষ। যান, এবার শান্তিতে জীবনযাপন করুন।
তখন পথ চলতে গিয়ে নবী মনের ভেতর অনির্বচনীয় একটা তৃপ্তি অনুভব করতে থাকেন। তিনি বুঝতে পারেন, ছোট ছোট বাচ্চাদের প্রতি তাঁর অন্তরে অগাধ স্নেহ ও মমতা বিরাজ করছে। আর বড় মানুষের প্রতি সেখানে অপরিসীম শ্রদ্ধা ও ভক্তি জেগে উঠছে। এটা নবীজি (সা.)-এর বক্ষ উন্মুক্ত করার একটা ঘটনা। এভাবে বিভিন্ন সময়ে নানা উপলক্ষে আল্লাহ তায়ালা তাঁর বক্ষ উন্মুক্ত করেছেন। একবার নয়, দুবার নয়; চার চারবার। বক্ষ উন্মোচনের এই ঘটনাগুলো স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন— আমি কি তোমার বক্ষ উন্মুক্ত করে দিইনি? কী গভীর ও মমতামাখা এক প্রশ্ন! এটা নিছক কোনো প্রশ্ন নয়। প্রশ্নের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সীমাহীন সান্ত্বনা ও পরম ভালোবাসার ছোঁয়া।
নবীজি (সা.)-এর মক্কা জীবনের পুরোটা সময় প্রতিকূলতায় টলটলায়মান ছিল। চারদিকে অসহায়ত্বের অন্ধকার। সেই সঙ্গে চাপা কষ্টের গোঙানি পরিবেশকে গুমোট করে রেখেছিল। মক্কার মোড়লদের আধিপত্য আর নিপীড়নে মুসলমানরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন। অনেকে পরিবারের পক্ষ থেকে প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হচ্ছিলেন। আত্মীয়তার মধুর সম্পর্ক তিক্ততায় রূপ নিচ্ছিল। ব্যবসায়ীদের ব্যবসা-বাণিজ্য হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিল। খোদ নবীজি (সা.)-এর ওপরও চলছিল ভীষণ দুর্ভোগ। এমন নিদারুণ মুহূর্তে আল্লাহ তায়ালা ঐশী সান্ত্বনার শীতলতা ছড়িয়ে দিয়ে বলেন, আমি কি তোমার বক্ষ উন্মুক্ত করে দিইনি?
হালের কষ্ট দেখে কেন ভেঙে পড়ছ? পেছনের দিকে ফিরে তাকাও। আমি তো কখনো তোমাকে ছেড়ে যাইনি। এর আগেও তোমাকে কষ্ট থেকে বের করে এনেছি। এবারও আনব। অতীত সাক্ষী। ভবিষ্যৎ আশ্বাস। এই আশ্বাসকে জোরালো করে আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘আমি তোমার ওপর থেকে প্রচণ্ড বোঝা নামিয়ে দিয়েছি। যা তোমার পিঠকে নুইয়ে ফেলেছিল।’
প্রতিটি শব্দের পরতে পরতে যেন পরম মমতা আর বিপুল ভরসা ঝলমল করছে। সেই ঝলমলে ক্যানভাবে লেখা আছে, আল্লাহ যার সহায় হয়ে যান, তার তো ভাবনার কিছু থাকে না। ভয়, উদ্বেগ ও উৎপীড়নে সে তো মনোবল হারাতে পারে না। এই সান্ত্বনা, মমতা ও ভরসা শুধু নবীজি (সা.)-এর জন্য নয়। কেয়ামত পর্যন্ত আগত প্রতিটি মানুষের জন্যই মমতা ও ভরসার এই দুয়ার খোলা থাকবে।
একবার নবীজি (সা.) আল্লাহর কাছে নিবেদন জানিয়ে বলেন, ‘ইয়া আল্লাহ! আমার আগে যত নবী গত হয়েছেন তাদের সবাইকে আপনি সীমাহীন সম্মান ও মর্যাদা দান করেছেন। ইবরাহিমকে বন্ধু বানিয়েছেন। মুসার সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন। দাউদকে দিয়েছেন সুমধুর কণ্ঠ। সেই কণ্ঠে মোহিত হয়ে পাহাড়-পর্বতও তাঁর সঙ্গে তসবিহ পাঠ করত। সুলাইমানের জন্য বাতাস ও শয়তানকে অনুগত করেছেন। ঈসার হাতে মৃতকে জীবিত করেছেন। তো আমার জন্য আপনি কী করেছেন?
জবাবে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি তো তোমাকে তাঁদের সবার চেয়ে উত্তম জিনিস দান করেছি। তোমাকে আমার হাবিব বানিয়েছি। তোমার স্মরণকে আমি সমুন্নত করেছি। পৃথিবীর যেখানেই আজান উচ্চারিত হয়, সেখানেই আমার নামের পরে মুহাম্মাদ নাম উচ্চারিত হয়। শুধু কি আজান? সালাত, সালাম, ইকামত; সর্বত্রই আমার নামের পাশে তোমার নাম। আরশ থেকে শুরু করে কুরআনের পাতায় পাতায় যেখানে আমার নাম উচ্চারিত হয়, সেখানে তোমার নামকেও আমি জুড়ে দিয়েছি। তা ছাড়া আমি তোমাকে আরশের ধনাগার থেকে অমূল্য এক ধন দিয়েছি। সেই ধন হলো— লা হাওলা ওয়া লা কুওওতা ইল্লা বিল্লাহ।’
কার জীবনে কষ্ট নেই? ‘চিরসুখীজন’ যারা, তাদেরও মনের গহিনে কোনো না কোনো কষ্ট লুকিয়ে থাকে। একেকজনের কষ্টের ধরন একেক রকম। এ জন্য সব কষ্ট বাইরে থেকে দেখা যায় না। অনেক কষ্ট বাইরে থেকে দেখা গেলেও তার প্রচণ্ডতা ও গভীরতা অনুমান করা যায় না। মানুষের ভালোর জন্য সাধনা করেও নবীজি (সা.) অনেকের মন পাচ্ছিলেন না। তাদের ছুড়ে দেওয়া কষ্টের শেকল চারদিক থেকে তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছিল। ঘোর অমানিশা আর কাফেরদের অস্বস্তিকর উৎপাতে তাঁর মুষড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। এমন যাতনাক্লিষ্ট সময়ে আল্লাহ তায়ালা তাঁর ওপরে আকাশভরা সান্ত্বনা ঢেলে দিলেন। তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি আছে।’ মানে স্বস্তি পরবর্তীতে আসবে, এমন অপেক্ষা করার দরকার নেই। বরং প্রতিটি কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি জড়িয়ে আছে। বাইরে থেকে দেখা যাবে শুধু কষ্ট। কিন্তু ভেতরে ডুব দিলে দেখা যাবে সেখানে স্বস্তির তলজোয়ার বয়ে চলছে।
‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি আছে’— এই কথাটি আল্লাহ তায়ালা একই সঙ্গে দুবার বলেছেন। নিশ্চয় এর পেছনে গভীর একটা তাৎপর্য আছে। আল কুরআনের বর্ণনাভঙ্গি থেকে বোঝা যায়, দুবারই একই কষ্টের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কষ্টের সঙ্গে উল্লিখিত দুই স্বস্তি আলাদা আলাদা। মানে কষ্ট একটা, কিন্তু স্বস্তি ভিন্ন ভিন্ন। এ জন্য ইবনে আব্বাস (রা.)-এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলতেন, একটি কষ্ট কখনো দুটি স্বস্তিকে পরাজিত করতে পারে না। প্রতিটা কষ্টের সঙ্গে দুটি স্বস্তি কী করে থাকে?
যেকোনো কষ্টের সময় একটা স্বস্তি থাকে বাইরের। আরেকটা ভেতরের। বাইরের স্বস্তি হচ্ছে, কষ্টের সময় কারও সাহায্য পাওয়া যায়। অপ্রত্যাশিতভাবে কষ্ট লাঘবের কোনো সুযোগ চলে আসে। আর ভেতরের স্বস্তি হচ্ছে, এই কষ্ট মানুষকে আল্লাহর কাছে নিয়ে যায়। তাঁর সঙ্গে হৃদয়ের যোগাযোগ ও সম্পর্ক আরও গভীর হয়ে ওঠে। ইবাদতে তৃপ্তি পাওয়া যায়। দোয়া করলে মন ভরে ওঠে। পার্থিব মোহ কমে যায়। এভাবেই একটি কষ্টের সঙ্গে দুটি স্বস্তি সমান্তরাল এগিয়ে চলে। যতটুকু কষ্ট বুকের ওপর চাপ দিয়ে যায়, তার চেয়ে দ্বিগুণ স্বস্তি হৃদয়কে উজ্জীবিত করে যায়। কষ্ট অনুপাতে আসমান থেকে আল্লাহর সাহায্য নাজিল হয়। আর ধৈর্য ও সহনশীলতা অনুযায়ী মানবজীবনে তা বিলিবণ্টন হয়।
কোনো মানুষই নিজের চেষ্টা ও সামর্থ্য দিয়ে সব অসাধ্য সাধন করতে পারে না। আবার হাত গুটিয়ে বসে থেকে শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করলেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসে না। দুটোই একসঙ্গে লাগবে। আল্লাহকে ভুলে গিয়ে অমানুষিক পরিশ্রম করলে হয়তো প্রাচুর্য আসবে, কিন্তু তাতে বরকত ও স্বস্তি থাকবে না। আয় বাড়বে, কিন্তু তাতে শান্তি থাকবে না।
একসঙ্গে দুটোই করতে হবে। এ জন্য আল্লাহ তায়ালা নবী (সা.)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন, যখন তুমি পার্থিব কাজকর্ম ও পরিশ্রম থেকে অবসর হবে তখন প্রবলভাবে আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন হবে। দেহ-মন-আত্মা নিয়ে তাঁর আনুগত্যে ডুবে যাবে। ভক্তি ও বিশ্বাস নিয়ে তাঁর কুদরতি পায়ে পড়ে থাকবে।
তখন আয়ে বরকত আসবে এবং মনে প্রশান্তি আসবে। ভালোবাসার প্রাচুর্যে জীবন ভরে উঠবে। স্বস্তি ও সৌন্দর্যে ঝিকিমিকি করে উঠবে জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত। একজন মুমিনের জীবনে এর চেয়ে বেশি কিছু কি আর দরকার আছে?
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে