রাজধানী শুধু একটি শহরের নাম নয়; এটি কোটি মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম, জীবিকা ও সম্ভাবনার কেন্দ্র। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা, চাকরি কিংবা নতুন জীবনের আশায় ঢাকায় আসেন। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো— অনেকের জন্য এই শহরের প্রথম অভিজ্ঞতা আতিথেয়তার নয়; বরং আতঙ্কের।
একসময় রাজধানীতে ছিনতাইয়ের কথা উঠলেই মানুষের মনে গুলিস্তানের নাম ভেসে উঠত। আজ সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। উত্তরা, আব্দুল্লাহপুর, টঙ্গী, মহাখালী, ফার্মগেট, শাহবাগ, বিভিন্ন বাস টার্মিনাল, হাসপাতাল এলাকাসহ রাজধানীর বহু স্থানে এখন মানুষকে সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করতে হয়।
দিন-রাতের ব্যবধানও যেন ধীরে ধীরে কমে আসছে। ব্যস্ত সড়ক, যানজট কিংবা জনসমাগম— কোনোটিই আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না। অপরাধের ধরনও পাল্টে গেছে।
মোটরসাইকেলে এসে মুহূর্তের মধ্যে মোবাইল ফোন বা ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া, চলন্ত রিকশা থেকে যাত্রীকে হ্যাঁচকা টানে ফেলে দেওয়া, নারীদের কানের দুল, স্বর্ণের চেইন কিংবা অলংকার ছিনিয়ে নেওয়া, নির্জন স্থানে রিকশা ঘুরিয়ে নিয়ে সর্বস্ব লুটে নেওয়া— এসব এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা।
আবার কোথাও ঠিকানা জিগ্যেস করার অজুহাতে, কোথাও পরিচিত মানুষের ভান করে, কোথাও কথার ফাঁদে ফেলে মানুষের মানিব্যাগ, মোবাইল ফোন ও নগদ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। অপরাধীরা বুঝে গেছে, ব্যস্ত নগরের অসতর্ক মুহূর্তই তাদের সবচেয়ে বড় সুযোগ।
সম্প্রতি রাজধানীতে এক প্রধান শিক্ষিকার মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো দেশকে নাড়া দিয়েছে। চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসে রিকশায় যাওয়ার সময় ছিনতাইকারীদের টানে তিনি রিকশা থেকে পড়ে প্রাণ হারান। একটি ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা মুহূর্তেই একটি পরিবারের স্বপ্ন, আশ্রয় ও নিরাপত্তাবোধ কেড়ে নেয়।
এমন অসংখ্য ঘটনা হয়তো সংবাদপত্রের শিরোনামও হয় না। কিন্তু প্রতিটি ঘটনার পেছনে থাকে একটি আতঙ্কিত পরিবার, এক শিশুর কান্না, এক মায়ের দীর্ঘশ্বাস কিংবা একজন পরিশ্রমী মানুষের বহু বছরের কষ্টার্জিত সম্পদ। ছিনতাইয়ের শিকার হওয়া আর ছিনতাইয়ের আশঙ্কা নিয়ে পথ চলা— দুটিই মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী ভয় সৃষ্টি করে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো— অনেক ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগই করেন না। কেউ মনে করেন, হারানো জিনিস আর ফিরে পাওয়া যাবে না; কেউ আবার আইনি ঝামেলা এড়াতে চান। অনেক সময় অস্ত্রের মুখে ছিনিয়ে নেওয়া ঘটনাও ‘হারানো’ হিসেবে সাধারণ ডায়েরিতে সীমাবদ্ধ থাকে।
ফলে প্রকৃত অপরাধের চিত্র সরকারি পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হয় না। অপরাধীরা বুঝে যায়, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ কম হবে, আর এ সুযোগই তাদের আরও বেপরোয়া করে তোলে। প্রশ্ন হলো, কেন এমন একটি সমাজ তৈরি হচ্ছে, যেখানে কয়েক মিনিটের লোভ একজন মানুষকে অন্যের জীবন, সম্মান ও নিরাপত্তাকে তুচ্ছ করতে শেখায়? একজন মানুষ জন্মগতভাবে ছিনতাইকারী হয়ে জন্মায় না।
এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের নৈতিক অবক্ষয়, মাদকাসক্তি, বেকারত্ব, দ্রুত ধনী হওয়ার মানসিকতা, দুর্বল পারিবারিক বন্ধন এবং অনেক ক্ষেত্রে আইনের শাস্তি থেকে সহজে রেহাই পাওয়ার সংস্কৃতি। যখন সমাজে হালাল উপার্জনের চেয়ে সহজ অর্থের আকর্ষণ বড় হয়ে ওঠে, তখন অপরাধ শুধু বাড়ে না, ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ঘটনাতেও পরিণত হতে শুরু করে। এই পরিস্থিতি শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়; এটি নৈতিকতারও সংকট।
তাই এর সমাধানও শুধু গ্রেফতার অভিযানে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রয়োজন রাষ্ট্রের কার্যকর উদ্যোগ, সমাজের নৈতিক পুনর্জাগরণ এবং মানুষের ভেতরে দায়িত্ববোধ ফিরিয়ে আনা। ইসলাম এই সংকটের সমাধানে শুধু আইন নয়, মানুষের বিবেককেও জাগ্রত করার শিক্ষা দিয়েছে।
ইসলাম মানুষের জান, মাল ও সম্মানকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে। বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে নবীজি ঘোষণা করেছিলেন, মানুষের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান একে অপরের জন্য পবিত্র।
পবিত্র কুরআনেও আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ গ্রাস করো না’ (সুরা বাকারা : ১৮৮)।
এই শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত নৈতিকতার বিষয় নয়; এটি একটি নিরাপদ সমাজ গঠনের ভিত্তি। যে সমাজে মানুষ অন্যের সম্পদকে আমানত মনে করে, সেখানে ছিনতাই, চুরি, প্রতারণা কিংবা ডাকাতির স্থান থাকতে পারে না। কারণ একজন মুমিন জানে, পৃথিবীর আইনকে হয়তো কখনো ফাঁকি দেওয়া সম্ভব, কিন্তু আল্লাহর বিচারের বাইরে যাওয়া অসম্ভব।
নবীজি আরও বলেছেন, ‘মুসলিম সে ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে’ (সহিহ আল-বুখারি)। এই হাদিস শুধু কাউকে কষ্ট না দেওয়ার শিক্ষা নয়; বরং এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখায়, যেখানে মানুষ ঘর থেকে বের হলে জানবে— তার জীবন, সম্পদ ও সম্মান নিরাপদ।
কিন্তু শুধু নৈতিক শিক্ষা দিয়েই সমস্যার সমাধান হবে না। নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। রাজধানীর অন্ধকার ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, গলি, বাসস্ট্যান্ড, ফুটওভার ব্রিজ এবং ছিনতাইপ্রবণ এলাকায় আধুনিক সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও কার্যকর পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
পুলিশের নিয়মিত টহল আরও জোরদার করতে হবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পুলিশ, আনসার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেনাবাহিনীর সমন্বিত টহলও নাগরিকদের নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে।
তবে রাষ্ট্রের পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্বও কম নয়। সন্তানকে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য প্রস্তুত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাকে হালাল উপার্জনের মর্যাদা, অন্যের হক, আমানতদারিতা এবং আল্লাহভীতির শিক্ষা দিতে হবে। যে শিশুর হৃদয়ে ছোটবেলা থেকেই নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ গড়ে ওঠে, সে বড় হয়ে অন্যের সম্পদের দিকে লোভের দৃষ্টিতে তাকায় না।
মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং গণমাধ্যম— সবাইকে এই নৈতিক পুনর্জাগরণে ভূমিকা রাখতে হবে। ইমামদের খুতবায়, শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে, অভিভাবকদের পারিবারিক আলোচনায় এবং গণমাধ্যমের সচেতনতামূলক প্রচারে মানুষের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের চেতনা জাগ্রত করতে হবে। কারণ নিরাপদ সমাজ শুধু আইন দিয়ে গড়ে ওঠে না; গড়ে ওঠে বিবেকবান মানুষ দিয়ে।
সময়ের আলো/জেডআই