মদিনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নবীজির দূরদর্শিতা

ইফতেখার আব্দুর রহমান

ইসলাম

নবীজি নবুয়ত লাভের পর সুদীর্ঘ ১৩ বছর নিজ মাতৃভূমি মক্কায় ধর্ম প্রচার করেন। সুদীর্ঘ এই সময়টিতে তিনি দ্বীনের বিপ্লবাত্মক আদর্শ

2026-09-02T13:31:14+00:00
2026-09-02T13:31:14+00:00
 
  বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৮ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইসলাম
মদিনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নবীজির দূরদর্শিতা
ইফতেখার আব্দুর রহমান
প্রকাশ: বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:৩১ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
নবীজি নবুয়ত লাভের পর সুদীর্ঘ ১৩ বছর নিজ মাতৃভূমি মক্কায় ধর্ম প্রচার করেন। সুদীর্ঘ এই সময়টিতে তিনি দ্বীনের বিপ্লবাত্মক আদর্শ প্রথমে গোপনে এবং পরবর্তীতে প্রকাশ্যে প্রচার করেন। ফলস্বরূপ তৎকালীন কুরাইশদের ধর্মমত, নৈতিক, চারিত্রিক, অর্থব্যবস্থা এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে প্রবল প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। মূলত ইসলাম ধর্ম প্রচারের ফলে তাদের দুনিয়াবি সব স্বার্থবিরোধী বাধাপ্রাপ্ত হয়। যার কারণে কুরাইশরা মুসলমানদের জীবন অত্যাচার ও নিপীড়নে জর্জরিত করে তুলে। যা মুসলিম ঈমানদারদের একটি নিজস্ব স্বাধীন অঞ্চলের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করায়। যেখানে তারা নির্বিঘ্নে তাদের ধর্ম পালন করতে পারবেন। অতঃপর আল্লাহর নির্দেশে মুসলমানগণ মদিনায় হিজরত করেন। যা পর্যায়ক্রমে মুসলমানদের একটি রাষ্ট্র হিসেবে পরিণত হয়। মদিনাকে রাষ্ট্র হিসেবে রূপদানের ক্ষেত্রে নবীজি বেশ কিছু বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

মদিনাকে স্থান হিসেবে নির্বাচন

Advertisement
একজন দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক তার ভাবী রাষ্ট্র হিসেবে এমন স্থানকে নির্বাচন করবেন যার আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব রয়েছে এবং যা হবে প্রাকৃতিকভাবে সমৃদ্ধ। মদিনা ছিল এসব শর্ত বিবেচনায় একটি উপযুক্ত স্থান। মদিনা ছিল তৎকালীন আরবের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল। যা তার ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রাকৃতিক কারণে পুরো আরবব্যাপী প্রসিদ্ধ ছিল। পাশাপাশি এটি ছিল আরবদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্যিক রুট। কুরাইশদের ইয়েমেন হয়ে সিরিয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য করার জন্য এই পথ ছাড়া অন্য কোনো পথ ছিল না। ফলে মদিনাকে ইসলামি রাষ্ট্র করা গেলে কুরাইশদের বাণিজ্যিকভাবে চাপে ফেলার এটি ছিল মোক্ষম হাতিয়ার। আবার মদিনা ছিল একটি আন্তর্জাতিক অঞ্চল। অর্থাৎ পূর্ববর্তী আসমানি গ্রন্থগুলোয় সবশেষ নবী আগমনের বিষয়ে ইয়াসরিব অঞ্চলের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। যার ফলশ্রুতিতে আহলে কিতাবগণ বিশেষত ইহুদি গোষ্ঠী পূর্ব থেকেই এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করা শুরু করে। মদিনার আদিবাসী পৌত্তলিক গোত্রগুলো, খ্রিস্টান ও ইহুদি গোত্রগুলো মিলে মদিনা একটি আন্তর্জাতিক অঞ্চলে পরিণত করে। মদিনার এই আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য পরবর্তীতে ইসলামের সুমহান বাণী সারা বিশ্বে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করে।

আকাবার শপথ ও চুক্তি

নবুয়তের দশম বর্ষে আকাবায় ইয়াসরিব থেকে আগত ৬ জন ব্যক্তিকে কথা বলার অবস্থায় দেখতে পান। অতঃপর তাদের ইসলামের দাওয়াত দিলে তারা ইসলামের চিরন্তন বাণী শুনে ইসলাম গ্রহণ করে। শুধু ইসলাম গ্রহণ করেই তারা ক্ষান্ত হননি। তারা তাদের গোত্রের কাছে ফিরে গিয়ে ইসলামের সত্য-সুন্দর ধর্ম প্রচার করতে থাকেন। যার ফলশ্রুতিতে আকাবার দ্বিতীয় ও তৃতীয় শপথের ঘটনা ঘটে। আবার দ্বিতীয় শপথের সময় নবীজির হজরত মুসয়াব ইবনে উমাইর (রা.)-কে মদিনায় শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করেন। এর পরবর্তীতে আকাবার তৃতীয় শপথে আগত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে ১২ জন নাকীব নিযুক্ত করে দেন। যারা তাদের স্বগোত্রের কাছে ফিরে গিয়ে ইসলামের প্রচারক হিসেবে কাজ করেন। আর এই সামগ্রিক বিষয়গুলো নবীজির পক্ষে জনমত গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং তাকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সমর্থনের বৈধ ভিত্তি দেয়। ফলত যখন তিনি মদিনায় আগমন করেন তখন বিপুল জনমতের ভিত্তিতে তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে অভিষিক্ত হন। যা ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ফল।

মসজিদে নববীর ভিত্তি স্থাপন

নবীজির মদিনায় পৌঁছেই প্রথমে একটি মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন যা শুধু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার স্থানই ছিল না, এটি ছিল মুসলিম জনতার মিলন কেন্দ্র। এই মসজিদকে কেন্দ্র করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনা রাষ্ট্রের শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। স্বাভাবিকভাবেই একটি রাষ্ট্র কাঠামোর প্রাথমিক প্রয়োজনগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র, যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববীকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলেন।
ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপন

মুসলমানদের হিজরতের পরে অন্যতম একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দেয় মুহাজির সাহাবিগণের পুনর্বাসন। মুহাজিরগণ ছিলেন এমন একদল ব্যক্তি যারা তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি ও অর্থসম্পদ ত্যাগ করে নিঃস্ব হাতে হিজরত করেছিলেন। মদিনায় তাদের না ছিল মাথা গোঁজার ঠাঁই আর না ছিল একবেলা খাওয়ার মতো অর্থকড়ি। এই বিষয়টি একটি বড় সামাজিক সংকট হিসেবে দেখা দেয় যা উদীয়মান এই মুসলিম রাষ্ট্রের সম্ভাবনাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার জন্য যথেষ্ট ছিল। 


নবীজির এর গুরুত্ব অনুধাবন করে এমন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন যার নজির সমগ্র বিশ্বে আর একটিও নেই। তিনি মুহাজির ও আনসার সাহাবিদের মাঝে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে দেন। যেখানে সম্পর্ক কোনো স্বার্থের ভিত্তিতে নয় ঈমানের ভিত্তিতে হবে। যার ফলে মুহাজিরগণ আনসারদের সম্পত্তি উত্তরাধিকার হতেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং নিজেদের মাল ও জান দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে আর যারা আশ্রয় দিয়েছে ও সহায়তা করেছে, তারা একে অন্যের বন্ধু।’ নবীজির গৃহীত ওই পদক্ষেপের ফলে এই মহাসংকট থেকে মদিনা রাষ্ট্র পরিত্রাণ পায় এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।

মদিনা সনদ

নবীজির মদিনায় উপস্থিত হয়ে সেখানে বিদ্যমান গোত্রগুলোর মাঝে টানাপোড়েনের সম্পর্ক প্রত্যক্ষ করেন। তিনি উপলব্ধি করলেন যে এ সম্প্রদায়গুলোর মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি না করলে তার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। তাই তিনি একটি বিধিবদ্ধ সনদ প্রবর্তন করেন। এ সনদে নবীজির প্রত্যেক সম্প্রদায়ের সুযোগ-সুবিধা ও স্বার্থের প্রতি লক্ষ্য রাখেন। আর এই সনদটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিখিত সংবিধান ‘মদিনা সনদ’।

পার্শ্ববর্তী গোত্রগুলোর সঙ্গে শান্তিচুক্তি

একটি রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ হলো কূটনীতি বা পররাষ্ট্রনীতি। তাই নবীজির মদিনা রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও তার সংরক্ষণ ব্যবস্থার জন্য অভ্যন্তরীণ দৃঢ়তা বিধানের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের উপকণ্ঠে বসবাসকারী গোত্রগুলোর সঙ্গে মিত্রতার সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য তিনি পশ্চিম অঞ্চল ও সীমান্তবর্তী গোত্রগুলো পরিদর্শন করেন এবং তাদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন। ফলে এসব গোত্র মুসলমানদের সঙ্গে প্রতিরক্ষার ব্যাপারে মিত্র শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। অতঃপর মদিনার চতুর্দিকের গোত্রগুলো মুসলমানদের সঙ্গে শত্রুতা করার পরিবর্তে বিশেষ সাহায্যকারী হয়ে ওঠে। আর এই পদক্ষেপটি মদিনা রাষ্ট্রের অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সময়ের আলো/জেডআই
  বিষয়:   নবীজি  মদিনা  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: