ফজরের আজান শেষ হয়েছে। একে একে মুসল্লিরা মসজিদে প্রবেশ করছেন। ঠিক তখনই বাবার হাত শক্ত করে ধরে টলমল পায়ে ভেতরে ঢোকে একটি ছোট্ট শিশু। তার চোখে কৌতূহল, মুখে নিষ্পাপ হাসি। সে এখনও কেরাত বোঝে না, ফিকহ জানে না, দীর্ঘ দোয়া মুখস্থ হয়নি। সে শুধু জানে— বাবা যেখানে যান, আমিও সেখানে যাব। আল্লাহর ঘরই যেন তার সবচেয়ে আপন ঠিকানা।
কিন্তু আমরা কি সেই অনুভূতিকে আপন করে নিতে পারি? বাস্তবে অনেক মসজিদেই দেখা যায়, কোনো শিশু একটু নড়াচড়া করলেই কেউ ধমক দিয়ে ওঠেন, কেউ বিরক্তি প্রকাশ করেন, কেউ আবার অভিভাবককে বলে বসেন, ‘এত ছোট বাচ্চা নিয়ে মসজিদে আসবেন না’। হয়তো মুহূর্তের জন্য মসজিদে নীরবতা ফিরে আসে। কিন্তু আমরা কি একবারও ভেবে দেখি, সেই শিশুটির কোমল মনে কী দাগ রেখে দিলাম? তার প্রথম মসজিদ-স্মৃতি যদি হয় ভয়, ধমক আর অপমান, তা হলে সে আবার আনন্দ নিয়ে আল্লাহর ঘরে ফিরবে কীভাবে?
মদিনায় নবীজির মসজিদের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। একদিন তিনি নামাজ পড়াচ্ছিলেন। এমন সময় তাঁর নাতি হাসান (রা.) ও হুসাইন (রা.) তাঁর পিঠে উঠে বসেন। তিনি তাদের ধমক দেননি; বরং সেজদা দীর্ঘ করেছিলেন, যাতে শিশুরা নিজেরাই নেমে যেতে পারে। আবার কোনো শিশু কান্না করলে তিনি নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন। কারণ তিনি জানতেন, একজন মায়ের হৃদয় তখন সন্তানের কাছেই পড়ে থাকে। এটাই ছিল নববী শিক্ষা। শিশুদের জন্য মসজিদকে ভয়ের নয়, ভালোবাসার জায়গা বানানো। এই বিষয়টি আমি নিজের জীবনেও গভীরভাবে অনুভব করি।
আমার ছেলের বয়স ছয় বছর। ছোটবেলা থেকেই তাকে সঙ্গে নিয়ে মসজিদে যাই। এখন অনেক সময় এমনও হয়, আমার বের হতে সামান্য দেরি হলে সে আমাকে অপেক্ষা না করেই দ্রুত মসজিদের দিকে রওনা দেয়। মসজিদে গিয়ে সে ইমামের পাশে দাঁড়ায়, কথা বলে, নামাজ পড়ে। আমাদের ইমামও তাকে নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করেন। কখনো মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, কখনো একটি চকলেট হাতে তুলে দেন। হয়তো সেই চকলেটের দাম খুব বেশি নয়, কিন্তু একটি শিশুর হৃদয়ে মসজিদের প্রতি যে ভালোবাসা তৈরি হয়, তার মূল্য কোনো অর্থে পরিমাপ করা যায় না।
আজ সে চকলেটের জন্য নয়, ভালোবাসার টানেই মসজিদে যায়। আমার আড়াই বছরের মেয়েও যখন দেখে বাবা আর ভাই মসজিদে যাচ্ছে, সেও যেতে চায়। সুযোগ-পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে তাকেও সঙ্গে নিই। সে এখনও নামাজের বিধান বোঝে না। কিন্তু বাবার পাশে দাঁড়িয়ে মানুষকে রুকু-সেজদা করতে দেখা, মসজিদের শান্ত পরিবেশ অনুভব করা, আজানের ধ্বনি শোনা— এসবই তার শৈশবের স্মৃতির অংশ হয়ে যাচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি, ঈমানের বীজ অনেক সময় দীর্ঘ বক্তৃতায় নয়; বরং এমন ছোট ছোট অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই একটি শিশুর হৃদয়ে অঙ্কুরিত হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন উদ্যোগের কথাও জানা যায়। কোথাও শিশুদের মসজিদে এলে হাসিমুখে স্বাগত জানানো হয়। কোথাও ছোট্ট উপহার বা চকলেট দিয়ে উৎসাহ দেওয়া হয়। আবার কোথাও নিয়মিত জামাতে অংশ নেওয়া শিশুদের বই, শিক্ষা-উপকরণ কিংবা সাইকেল দিয়ে উৎসাহিত করা হয়। উদ্দেশ্য একটাই— শিশুর হৃদয়ে মসজিদের প্রতি ভালোবাসার বীজ বপন করা। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, শিশুরা যা খুশি তাই করবে। অভিভাবকদেরও দায়িত্ব কম নয়
সন্তানকে মসজিদে আনার আগে ওজু শেখাতে হবে, পরিচ্ছন্নতা শেখাতে হবে, কাতারে দাঁড়ানোর আদব শেখাতে হবে। অন্য মুসল্লির ইবাদতে বিঘ্ন না ঘটে, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে। ধীরে ধীরে তাকে মসজিদের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত করতে হবে। কারণ আদব শেখানোও একটি ইবাদত। অন্যদিকে বয়োজ্যেষ্ঠ মুসল্লিদেরও মনে রাখতে হবে, আজ যে শিশুটি একটু দৌড়াচ্ছে, কয়েক বছর পর সেই শিশুই হয়তো এই মসজিদের মুয়াজ্জিন হবে, ইমাম হবে, হাফেজ হবে, আলেম হবে কিংবা একজন আদর্শ মুসল্লি হবে। একটি কঠোর ধমক হয়তো তাকে বছরের পর বছর মসজিদ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। আবার একটি স্নেহমাখা হাসি তাকে আজীবনের জন্য আল্লাহর ঘরের সঙ্গে বেঁধে রাখতে পারে।
আমরা প্রায়ই অভিযোগ করি— নতুন প্রজন্ম মসজিদমুখী নয়। কিন্তু নিজেদেরও প্রশ্ন করা দরকার, আমরা কি তাদের জন্য শুধু মসজিদের দরজা খুলেছি, নাকি হৃদয়ের দরজাও খুলেছি? একটি শিশুর প্রথম মসজিদ-স্মৃতি যদি হয় ভালোবাসা, সম্মান আর আপন করে নেওয়ার অনুভূতি, তা হলে সেই স্মৃতিই তার ঈমানি জীবনের ভিত্তি হয়ে থাকবে। একটি সমাজের ভবিষ্যৎ শুধু বড়দের সেজদায় নয়; শিশুদের ছোট ছোট পদচারণেও লুকিয়ে থাকে।
তাই আসুন, আমরা এমন মসজিদ গড়ে তুলি, যেখানে ইবাদতের গাম্ভীর্য থাকবে, আবার শিশুর নিষ্পাপ হাসিও থাকবে; যেখানে শৃঙ্খলা থাকবে, আবার মমতাও থাকবে; যেখানে ধমকের চেয়ে দোয়া বেশি শোনা যাবে, আর তাড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে ভালোবাসা দিয়ে কাছে টেনে নেওয়া হবে। তাই শিশুদের মসজিদ থেকে দূরে ঠেলে দেব না; বরং ভালোবাসা দিয়ে আল্লাহর ঘরের আপন মানুষ করে তুলব। কারণ একটি শিশুর হৃদয়ে মসজিদের প্রতি ভালোবাসা জন্মাতে পারলে, সে শুধু একজন নিয়মিত মুসল্লিই হবে না; ইনশাআল্লাহ একজন দায়িত্বশীল, চরিত্রবান ও আল্লাহভীরু মানুষ হিসেবেও গড়ে উঠবে। আমাদের আজকের সামান্য স্নেহই হয়তো আগামী দিনের একটি ঈমানদীপ্ত প্রজন্মের ভিত্তি রচনা করবে।
লেখক : আলেম ও প্রাবন্ধিক
সময়ের আলো/জেডআই