শৃঙ্খলা একটি সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ সমাজের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। পরিবার থেকে রাষ্ট্র- জীবনের প্রতিটি স্তরেই শৃঙ্খলার প্রয়োজন। মানুষ যদি নিজের ইচ্ছামতো চলতে গিয়ে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে, তা হলে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সমাজ- সব ক্ষেত্রেই বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। বিপরীতে মানুষ যখন দায়িত্বশীলতা, নিয়মনীতি, পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্যের প্রতি যত্নশীল হয়, তখন সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
ইসলাম শুধু ইবাদতের শিক্ষা দেয় না; বরং মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল করার দিকনির্দেশনাও দেয়। ইসলামের বিভিন্ন বিধান গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মানুষের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ, দায়িত্বশীলতা, আত্মসংযম ও পারস্পরিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা তৈরি করা।
সময়ের শৃঙ্খলা
ইসলাম মানুষকে সময়ের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন হতে শেখায়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের নির্ধারিত সময় এর বড় উদাহরণ। একজন মুসলিমকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে নামাজ আদায় করতে হয়। ফজর থেকে এশা পর্যন্ত নামাজের সময়গুলো মানুষের জীবনে নিয়ম ও শৃঙ্খলার এক অনন্য শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের ওপর নির্ধারিত সময়ে ফরজ করা হয়েছে’ (সুরা নিসা : ১০৩)।
যে ব্যক্তি নামাজের মাধ্যমে সময়ের মূল্য উপলব্ধি করতে শেখে, তার জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও সময়ানুবর্তিতা গড়ে ওঠার কথা। তাই ইসলামি জীবনব্যবস্থায় সময় নষ্ট করা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; বরং এটি জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ অপচয়ের নাম।
নিয়ম মেনে চলার শিক্ষা
ইসলামের ইবাদতগুলোও নির্দিষ্ট নিয়মের অধীন। নামাজের জন্য পবিত্রতা, নির্দিষ্ট সময়, কেবলামুখী হওয়া ও নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে। রোজার শুরু ও শেষেরও নির্ধারিত সময় আছে। হজের রয়েছে নির্দিষ্ট স্থান, সময় ও বিধান। এগুলো মানুষের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়- শৃঙ্খলা মানে নিজের ইচ্ছাকে লাগামহীনভাবে অনুসরণ করা নয়; বরং সঠিক নিয়মের অধীনে নিজেকে পরিচালিত করা। যে ব্যক্তি ইবাদতের ক্ষেত্রে নিয়ম মানতে অভ্যস্ত হন, তার উচিত সামাজিক জীবনেও নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।
জনজীবনে শৃঙ্খলা
রাস্তা, বাজার, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান- সব জায়গায় মানুষের পারস্পরিক চলাচলের জন্য কিছু নিয়ম প্রয়োজন। এসব নিয়মের উদ্দেশ্য মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া নয়; বরং সবার অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
যেমন- ট্রাফিক আইন মেনে চলা, নির্ধারিত স্থানে গাড়ি পার্ক করা, রাস্তা দখল না করা, যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলা, লাইনে দাঁড়ানো, জনসাধারণের চলাচলে বাধা সৃষ্টি না করা- এসব বিষয় বাহ্যিকভাবে মনে হলেও একটি সভ্য সমাজের পরিচয় বহন করে। একজন মুসলিমের আচরণে যদি ঈমান ও নৈতিকতার প্রভাব থাকে, তা হলে সে নিজের সুবিধার জন্য অন্যের অধিকার নষ্ট করতে পারে না।
অন্যের অধিকার রক্ষা
শৃঙ্খলার একটি বড় অংশ হলো অন্যের অধিকারকে সম্মান করা। ইসলাম মানুষের জানমাল, সম্মান ও অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত মুসলিম সে, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)।
এই শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত আচরণের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। সমাজে এমন কোনো আচরণ করা উচিত নয়, যার কারণে অন্য মানুষ অযথা কষ্ট, ক্ষতি বা বিপদের সম্মুখীন হয়। রাস্তায় বেপরোয়া গাড়ি চালানো, ফুটপাথ দখল করা, উচ্চশব্দে অন্যকে বিরক্ত করা, সরকারি সম্পদ নষ্ট করা কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে জনসাধারণের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা- এসবই সামাজিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী।
রাস্তার শৃঙ্খলা ও ইসলামি মূল্যবোধ
সড়কে নিয়ম মেনে চলা একটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক দায়িত্ব। ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে কয়েক মিনিট সময় বাঁচানো গেলেও এর ফলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, অন্যের জীবন বিপন্ন হতে পারে। ইসলাম মানুষের জীবনকে অত্যন্ত মূল্যবান হিসেবে দেখেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো প্রাণকে প্রাণের বিনিময় ছাড়া অথবা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করার অপরাধ ছাড়া হত্যা করল, সে যেন সব মানুষকে হত্যা করল’ (সুরা মায়িদা : ৩২)।
তাই সড়কে নিজের নিরাপত্তার পাশাপাশি অন্যের নিরাপত্তার কথাও বিবেচনা করা ঈমানি ও নৈতিক দায়িত্বের অংশ। আইন মেনে চলা এখানে শুধু প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা নয়; বরং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষার একটি মাধ্যম।
সারিতে দাঁড়ানোও শৃঙ্খলা
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ছোট ছোট কিছু বিষয় সামাজিক শৃঙ্খলার বড় পরিচয় বহন করে। কাউন্টারে, হাসপাতালে, টিকেটের লাইনে কিংবা কোনো সেবাকেন্দ্রে নিজের পালার অপেক্ষা করা তার অন্যতম। কেউ যদি নিজের সুবিধার জন্য অন্যকে পেছনে ফেলে সামনে চলে যায়, তা হলে সে শুধু একটি নিয়ম ভঙ্গ করে না; বরং অন্যের অধিকারেও হস্তক্ষেপ করে। ইসলাম মানুষকে অন্যের হক নষ্ট না করার শিক্ষা দিয়েছে। তাই শৃঙ্খলা রক্ষা শুরু হতে পারে এমন ছোট ছোট অভ্যাস থেকেই।
সরকারি সম্পদের প্রতি দায়িত্বশীলতা
সরকারি সম্পদ মূলত জনগণের সম্পদ। রাস্তা, সেতু, পার্ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, গণপরিবহনসহ বিভিন্ন জনসেবামূলক স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণে জনগণের অর্থ ও শ্রম ব্যয় হয়। এসব সম্পদ নষ্ট করা, ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিসাধন করা কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করা দায়িত্বশীল নাগরিকের কাজ নয়। ইসলাম আমানত রক্ষার শিক্ষা দিয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানত তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও’ (সুরা নিসা : ৫৮)। জনসম্পদ রক্ষা করাও এক ধরনের সামাজিক আমানত। তাই এর প্রতি যত্নশীল হওয়া আমাদের নৈতিক ও নাগরিক দায়িত্ব।
পরিচ্ছন্নতাও শৃঙ্খলার অংশ
পরিচ্ছন্নতা মানুষের ব্যক্তিগত সৌন্দর্য যেমন বাড়ায়, তেমনি একটি দেশ ও সমাজের সভ্যতার পরিচয়ও বহন করে। যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা, নালা-নর্দমায় বর্জ্য ফেলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করা কিংবা জনসাধারণের স্থান অপরিচ্ছন্ন রাখা অন্যের জন্য ভোগান্তির কারণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়াকেও তিনি সদকা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাই নিজের ঘর পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি রাস্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, বাজার ও জনসাধারণের স্থান পরিচ্ছন্ন রাখার অভ্যাসও গড়ে তুলতে হবে।
আইন মানা ও বিবেকের ভূমিকা
শৃঙ্খলা শুধু আইনের ভয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং মানুষের বিবেক ও আল্লাহভীতিও এর বড় ভিত্তি। একজন মানুষ যদি মনে করেন, ‘পুলিশ নেই, তাই নিয়ম মানব না’- তা হলে তার শৃঙ্খলা বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণনির্ভর। কিন্তু একজন মুমিন মনে করেন, ‘মানুষ আমাকে না দেখলেও আল্লাহ আমাকে দেখছেন।’ এই বিশ্বাস তাকে গোপনেও সৎ থাকতে সাহায্য করে।
তবে রাষ্ট্রের বৈধ আইন ও নিয়ম মেনে চলা নাগরিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কোনো নিয়মের বিষয়ে আপত্তি থাকলে তা আইনসম্মত ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে প্রকাশ করা উচিত; বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা বা অন্যের অধিকার নষ্ট করা কোনোভাবেই সমাধানের পথ নয়।
পরিবার থেকেই শুরু হোক শৃঙ্খলা
একটি সুশৃঙ্খল রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে প্রথমে সুশৃঙ্খল পরিবার গড়ে তুলতে হবে। শিশুকে ছোটবেলা থেকেই সময়মতো ঘুমানো, সময়মতো জাগা, নামাজ আদায়, পড়াশোনা করা, বড়দের সম্মান করা, ছোটদের স্নেহ করা, নিজের জিনিস নিজে গুছিয়ে রাখা এবং অন্যের অধিকার সম্মান করার শিক্ষা দিতে হবে। শুধু উপদেশ দিয়ে শৃঙ্খলাবোধ তৈরি হয় না; বড়দের নিজেদের আচরণেও তার বাস্তব উদাহরণ দেখাতে হয়। সন্তান যদি দেখে বাবা-মা নিয়ম মেনে চলছেন, সময়ের মূল্য দিচ্ছেন এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করছেন, তা হলে তার মধ্যেও একই গুণ তৈরি হবে।
শৃঙ্খলিত নাগরিক, সুন্দর দেশ
একটি দেশের উন্নয়ন শুধু বড় বড় স্থাপনা, প্রশস্ত রাস্তা কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না। দেশের প্রকৃত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দায়িত্বশীল ও শৃঙ্খলাবদ্ধ নাগরিক। আমরা যদি প্রত্যেকে নিজের জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করি- রাস্তার নিয়ম মানি, অন্যের অধিকার রক্ষা করি, জনসম্পদ সংরক্ষণ করি, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখি, সময়ের মূল্য দিই এবং আইনসম্মত নিয়মনীতি মেনে চলি- তা হলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবেই।
ইসলাম মানুষকে শুধু ভালো মুসলিম হতে শেখায় না; বরং ভালো মানুষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হতেও শিক্ষা দেয়। তাই আমাদের শৃঙ্খলা যেন শুধু মসজিদের ভেতরে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং বাজারে, রাস্তায়, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন ঘটে। মনে রাখতে হবে- শৃঙ্খলা চাপিয়ে দেওয়া কোনো বিষয় নয়; এটি গড়ে তুলতে হয় ঈমান, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও আত্মসংযমের মাধ্যমে। আর একজন মুমিনের জন্য এর সবচেয়ে বড় প্রেরণা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জবাবদিহির অনুভূতি।
আমরা যদি নিজের জায়গা থেকে নিয়ম মেনে চলি এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করি, তা হলে শুধু নিজের জীবনই সুন্দর হবে না; আমাদের পরিবার, সমাজ ও দেশও হয়ে উঠবে আরও শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও কল্যাণময়। সুশৃঙ্খল নাগরিকই পারে একটি সুন্দর দেশ গড়তে- আর একজন সচেতন মুমিনের কাছে সেই শৃঙ্খলাও হতে পারে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মাধ্যম।
লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি