আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সর্বোত্তম আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। এই সৌন্দর্য শুধু মুখমণ্ডল বা বাহ্যিক পোশাকে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পরিচ্ছন্নতা, পরিপাট্য ও শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপনের মধ্যেও এর প্রকাশ ঘটে। ইসলাম তাই মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট অভ্যাসকেও গুরুত্ব দিয়েছে। খাওয়া, পান করা, ঘুম, পোশাক, পরিচ্ছন্নতা- জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে সুন্দর, ভারসাম্যপূর্ণ ও কল্যাণকর দিকনির্দেশনা। নখ কাটা তেমনই একটি ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ সুন্নত, যা একজন মুসলিমের পরিচ্ছন্নতা, রুচিবোধ ও সভ্যতার পরিচয় বহন করে।
নবীজি (সা.) মানুষের স্বাভাবিক পরিচ্ছন্নতার অংশ হিসেবে নখ কাটার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। হাদিসে নখ কাটা, গোঁফ ছোট করা, বগলের লোম পরিষ্কার করা এবং নাভির নিচের লোম অপসারণকে ফিতরাত বা মানবস্বভাবের অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, ইসলাম পরিচ্ছন্নতাকে শুধু স্বাস্থ্যগত বিষয় হিসেবে নয়, বরং ঈমানি জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
অযথা নখ বড় করে রাখা ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। লম্বা নখে সহজেই ময়লা, জীবাণু ও অপবিত্রতা জমে থাকে, যা ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার পরিপন্থী। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও দেখিয়েছে যে, হাতের নখ নানা ধরনের জীবাণুর আশ্রয়স্থল হতে পারে। অপরিষ্কার নখের মাধ্যমে খাবারের সঙ্গে জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে বিভিন্ন সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই নিয়মিত নখ কেটে পরিষ্কার রাখা শুধু সুন্নত নয়; সুস্থ, পরিচ্ছন্ন ও সচেতন জীবন গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন।
নখ কাটার ক্ষেত্রে ডান হাত দিয়ে শুরু করা এবং পরে বাম হাতের নখ কাটা উত্তম। একইভাবে পায়ের নখ কাটার সময়ও ডান পা আগে কাটা শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত। তবে কোন আঙুলের নখ আগে বা পরে কাটতে হবে- এ বিষয়ে কুরআন বা সহিহ হাদিসে কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই।
সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন ক্রম, যেমন ডান হাতের কনিষ্ঠা থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতায় নখ কাটার যে নিয়ম প্রচার করা হয় তার কোনো নির্ভরযোগ্য শরয়ি ভিত্তি নেই। প্রখ্যাত আলেম ইবনে দাকিকুল ঈদ (রহ.)-ও উল্লেখ করেছেন, এ বিষয়ে কোনো সহিহ দলিল পাওয়া যায় না। তাই কোনো প্রচলিত রীতিকে সুন্নত বা মুস্তাহাব মনে করার আগে তার শরয়ি প্রমাণ থাকা অপরিহার্য।
আমাদের সমাজে নখ কাটাকে ঘিরে নানা কুসংস্কারও প্রচলিত রয়েছে। কেউ মনে করেন, জন্মবারে নখ কাটা অমঙ্গলজনক। কেউ আবার সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনকে শুভ বা অশুভ বলে মনে করেন। অথচ ইসলামে এসব বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি নেই। কুরআন ও সুন্নাহর কোথাও সপ্তাহের কোনো দিনে নখ কাটতে নিষেধ করা হয়নি। একজন মুসলিমের জীবন কুসংস্কারের ওপর নয়, বরং কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক বিশুদ্ধ জ্ঞানের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত।
দাঁত দিয়ে নখ কাটা আমাদের সমাজের আরেকটি প্রচলিত অভ্যাস। অনেকে অজান্তেই এটি করে থাকেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি মোটেও নিরাপদ নয়। নখের নিচে জমে থাকা জীবাণু ও ময়লা সহজেই মুখের ভেতরে প্রবেশ করে বিভিন্ন সংক্রমণের কারণ হতে পারে। পাশাপাশি এতে দাঁতের এনামেল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই এই অভ্যাস থেকে বিরত থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। মনে রাখা দরকার, ইসলামে কোনো সুন্নতই তুচ্ছ নয়।
আন্তরিক নিয়তের সঙ্গে করা একটি সাধারণ আমলও আল্লাহর কাছে মূল্যবান হয়ে ওঠে। নখ কাটা হয়তো কয়েক মিনিটের কাজ, কিন্তু যদি তা সুন্নতের অনুসরণ, পরিচ্ছন্নতার চর্চা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয় তবে সেটিও ইবাদতে পরিণত হয়।
সময়ের আলো/কেএইচ