প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে মানুষের মর্যাদা

আশিকুজ্জামান নাঈম

ইসলাম

মানবজীবনের অন্যতম মূল্যবান ও শ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো উন্নত চরিত্র। আর মানুষের চরিত্রকে অক্ষুণ্ন ও সুরক্ষিত রাখতে হলে ব্যক্তিগত পবিত্রতা ও

2026-08-31T10:25:34+00:00
2026-08-31T10:25:34+00:00
 
  সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬,
১৬ ভাদ্র ১৪৩৩
সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬
ইসলাম
প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে মানুষের মর্যাদা
আশিকুজ্জামান নাঈম
প্রকাশ: সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ১০:২৫ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মানবজীবনের অন্যতম মূল্যবান ও শ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো উন্নত চরিত্র। আর মানুষের চরিত্রকে অক্ষুণ্ন ও সুরক্ষিত রাখতে হলে ব্যক্তিগত পবিত্রতা ও আত্মসংযমের বিকল্প নেই। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমান সমাজের একশ্রেণির মানুষ নৈতিক পবিত্রতা ও শালীনতা বজায় রাখার ব্যাপারে চরমভাবে উদাসীন হয়ে পড়েছে। মানুষের অন্তর থেকে মহান আল্লাহর ভয় ও পরকালের জবাবদিহিতার অনুভূতি ক্রমান্বয়ে দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। এর ফলে আজ দেশব্যাপী অশ্লীলতা ও ব্যভিচারের মতো মারাত্মক অপরাধ ছড়িয়ে পড়েছে। 

অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, আমাদের সমাজে এই পাপ কাজগুলো যেন দিন দিন সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। এমনকি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায় করেন বা নিয়মিত ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকেন, এমন কিছু মানুষও নানাভাবে এই পাপে জড়িয়ে পড়ছেন। ব্যভিচার বা জিনা এমন এক ধ্বংসাত্মক সামাজিক ব্যাধি, যার ভয়াবহতা এতটাই প্রকট যে, ইসলামি শরিয়তে এর শাস্তি সুনির্দিষ্টভাবে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। 

প্রথমত অবিবাহিত অপরাধীর জন্য রয়েছে একশত বেত্রাঘাতের বিধান। দ্বিতীয়ত বিবাহিত অপরাধীর জন্য রয়েছে রজমের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডের বিধান। তা ছাড়া বিভিন্ন ইসলামি গবেষক ও বিশিষ্ট আলেমদের মতে, ব্যভিচার যখন কোনো সমাজ কিংবা রাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে গজব ও আজাব নেমে আসে। জিনাকার বা ব্যভিচারী ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত অপছন্দ করেন। এই মহামারি থেকে সমাজকে রক্ষা করতে হলে প্রতিটি মানুষকে কঠোরভাবে নিজের প্রবৃত্তি ও আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

ব্যক্তিগত পবিত্রতা ও চরিত্র সুরক্ষার জন্য কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপায় রয়েছে, যা মেনে চলা প্রতিটি মুমিনের জন্য আবশ্যক। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান উপায় হলো সর্বাত্মকভাবে নিজের দৃষ্টিকে সংযত ও নিয়ন্ত্রণ করা। চোখের হেফাজত করতে পারলে নিজেকে যাবতীয় পাপাচার থেকে পবিত্র রাখা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে মোবাইল ও ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহারের কারণে আমাদের চোখের গুনাহ ও দৃষ্টির অপরাধ ভয়ংকরভাবে বেড়ে চলেছে।

সমাজে মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল অশ্লীলতা। আজ আমাদের যুবসমাজের একটা বিশাল অংশের মূল্যবান সময় কেটে যাচ্ছে মোবাইল ফোনে বিভিন্ন গুনাহ ও অশালীন বিষয়বস্তু দেখার পেছনে। যৌবনে পদার্পণের পর অনতিবিলম্বে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া পবিত্রতা রক্ষার অন্যতম সুন্নতি মাধ্যম। সঠিক সময়ে বিয়ে করলে মানুষের ব্যক্তিগত শালীনতা ও নৈতিক পবিত্রতা রক্ষা পায়। 

বিয়ে হলো প্রায় সব নবী ও রাসুলগণের একটি সুন্নত। তবে যাদের বিয়ে করার সামর্থ্য নেই বা আর্থিক ও পারিপার্শ্বিক কারণে বিলম্ব ঘটছে, তাদের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) সিয়াম বা রোজা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, নবীজির সঙ্গে আমরা কতক যুবক ছিলাম এবং আমাদের কাছে কোনো সম্পদ বা বিয়ের সামর্থ্য ছিল না। এ অবস্থায় আমাদেরকে নবীজি বললেন, ‘হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যাদের বিয়ে করার সামর্থ্য আছে, তারা যেন বিয়ে করে। কেননা বিয়ে তার দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং নৈতিক পবিত্রতা রক্ষা করে। আর যার বিয়ে করার সামর্থ্য নেই, সে যেন সাওম পালন করে। কেননা সাওম বা রোজা তার যৌন প্রবৃত্তি ও উত্তেজনাকে দমন করবে।’ (বুখারি, হাদিস নং ৫০৬৬)

নারীদের শতভাগ পর্দা ও শরিয়তের বিধান রক্ষা করাও ব্যক্তিগত পবিত্রতা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি। পর্দার সঠিক পরিবেশ বজায় রাখার মাধ্যমেই সমাজকে অপরাধমুক্ত করা সম্ভব। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘তোমরা (নারীরা) ঘরে অবস্থান করো এবং জাহেলি যুগের নারীদের মতো প্রসাধন প্রদর্শন করে খোলামেলা চলাফেরা করো না’ (সুরা আহযাব, আয়াত : ৩৩)। 

বর্তমান ভদ্রসমাজে একটি মারাত্মক ফেতনা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে পরপুরুষ ও পরনারীর অবাধ মেলামেশা বা বন্ধুত্বের সংস্কৃতি, যা ইসলামি শরিয়তে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কোনো পুরুষ কিংবা নারীর উচিত নয় বেগানা ব্যক্তির সঙ্গে নির্জনে অবস্থান করা। এ বিষয়ে সতর্ক করে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা নারীদের কাছে প্রবেশ করার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকো।’


অশ্লীলতার দিকে ধাবিত করতে পারে- এমন সব কথা, কাজ ও মাধ্যম থেকে দূরে থাকা মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব। সুতরাং মানুষের চোখ এবং কানের পরিপূর্ণ হেফাজত নিশ্চিত করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হইও না। নিশ্চয়ই এটি অশ্লীল কাজ এবং অত্যন্ত মন্দ পথ’ (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩২)। 

অশালীন কোনো কিছু শোনা, কুরুচিপূর্ণ বস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাত করা, অশ্লীল ছবি, ভিডিও বা সিনেমা দেখা কিংবা বাজে কিছু পাঠ করা সবকিছুই এই আয়াতের নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। চরিত্র সুরক্ষার জন্য বন্ধু নির্বাচনেও অত্যন্ত সচেতন ও সতর্ক হতে হবে। কারণ চরিত্রহীন বা অসৎ কিছু বন্ধুর প্রভাবে অনেক সময় মানুষের নিজের সুন্দর চরিত্রও নষ্ট হয়ে যায়। ভালো সঙ্গ সবসময় মানুষকে সৎ পথে পরিচালিত করে।

ব্যক্তিগত পবিত্রতা ও চরিত্র হেফাজত করার রয়েছে অপরিসীম দুনিয়াবি ও পরকালীন ফায়দা। যারা নিজেদের পবিত্রতা রক্ষা করেন, কেয়ামতের কঠিন ময়দানে তাদেরকে মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর বিশেষ আরশের নিচে ছায়া দান করবেন। 

এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেছেন, সাত ধরনের সৌভাগ্যবান ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন তাঁর আরশের ছায়া দান করবেন। তাদের মধ্যে এমন একজন ব্যক্তিও অন্তর্ভুক্ত, যাকে কোনো কুলজাত ও সুন্দরী সম্ভ্রান্ত নারী অনৈতিক কাজের দিকে আহ্বান করলে সে স্পষ্টভাবে বলে দেয়, ‘আমি আল্লাহকে ভয় করি’ (বুখারি, হাদিস নং ১৩৩৪)। একজন খাঁটি ও পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে হলে নৈতিক পবিত্রতা ও শালীনতা রক্ষা করা অপরিহার্য। আল্লাহ পাক আমাদের এই কঠিন পথে অবিচল থাকার তওফিক দান করুন।

লেখক : প্রাবন্ধিক, দোহা, কাতার

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 


  বিষয়:   প্রবৃত্তি  নিয়ন্ত্রণ  মানুষ  মর্যাদা 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: