মানুষ ভবিষ্যতের জন্য কত পরিকল্পনাই না করে। আগামীকাল কী করবে বা আগামী বছর কোথায় পৌঁছাবে, এসব ভাবনায় সে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য হলো, আমাদের হাতে নিশ্চিতভাবে আছে কেবল বর্তমান মুহূর্তটুকু। অতীত আর ফিরে আসবে না এবং ভবিষ্যৎ আসবে কি না আমরা তাও জানি না। অথচ আজকের এই সময়টুকুই নীরবে আমাদের জীবন গড়ে দিচ্ছে।
পবিত্র কুরআনের অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু অর্থের দিক থেকে অত্যন্ত গভীর সুরা আল-আসর আমাদের এই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। এই সুরায় মহান আল্লাহ সময়ের শপথ করে মানুষকে সতর্ক করেছেন যে, মানুষ মূলত ক্ষতির মাঝেই রয়েছে। তবে তারা এর ব্যতিক্রম, যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে। অল্প কয়েকটি আয়াতের এই সুরায় মানুষের জীবনকে সফল ও অর্থবহ করার পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা রয়েছে। প্রথম শিক্ষাটি হলো ঈমান। মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে তার জীবনের একটি উদ্দেশ্য রয়েছে এবং এই পৃথিবীর জীবনই শেষ কথা নয়, তখন তার জীবনবোধ সম্পূর্ণ বদলে যায়। সে তখন কেবল নিজের স্বার্থ নিয়ে চিন্তা করে না, বরং অন্যায় থেকে দূরে থাকে।
দ্বিতীয় শিক্ষা হলো সৎকাজ। ভালো মানুষ হওয়ার দাবি কেবল কথায় প্রমাণ করা যায় না; মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার কর্মে ও আচরণে প্রকাশ পায়। সততা, দায়িত্বশীলতা, ন্যায়পরায়ণতা এবং মানুষের প্রতি সহানুভূতি একটি সুন্দর জীবনের অপরিহার্য অংশ।
পৃথিবীতে আমরা কতটুকু সম্পদ রেখে গেলাম, তার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কতটুকু ভালো কাজ মানুষের হৃদয়ে রেখে যেতে পারলাম। এরপর এসেছে সত্যের কথা। সত্যের পথে দাঁড়ানো সবসময় সহজ নয়। অনেক সময় মানুষ একা হয়ে যায় কিংবা সমালোচনার মুখোমুখি হয়। তবু সত্যের মূল্য কখনো কমে না। একজন মানুষ শুধু নিজে সত্যের পথে চললেই তার দায়িত্ব শেষ হয় না, বরং কল্যাণের উদ্দেশ্যে অন্যকেও সত্যের পথে আহ্বান করার দায়িত্ব তার রয়েছে। সত্যের এই পথের সঙ্গেই গভীরভাবে জড়িত রয়েছে ধৈর্যের শিক্ষা। জীবন সবসময় মানুষের ইচ্ছামতো চলে না। কখনো প্রিয় কিছু হারাতে হয়, কখনো বা পরিশ্রমের সঠিক মূল্য মেলে না। এসব সংকটময় মুহূর্তেই ধৈর্যের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। ধৈর্য মানে কেবল নীরবে কষ্ট সহ্য করা নয়; বরং হতাশ না হয়ে এবং অন্যায়ের পথ বর্জন করে কঠিন সময়েও নিজের নৈতিক অবস্থান দৃঢ়ভাবে ধরে রাখা।
আজকের পৃথিবীতে সফলতার সংজ্ঞা ক্রমেই বাহ্যিক অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। কার কত পদ বা সম্পদ রয়েছে, তা দিয়েই অনেক মানুষ নির্ধারিত হয়। অথচ একজন মানুষ বাহ্যিকভাবে অনেক কিছু অর্জন করেও যদি নিজের সততা ও বিবেক হারিয়ে ফেলেন, তবে সেই অর্জনের ভেতরে প্রকৃত শান্তি থাকতে পারে না। সুরা আল-আসর আমাদের অন্য এক সফলতার সন্ধান দেয়। এটি এমন এক সফলতা, যেখানে মানুষ নিজের বিশ্বাস ধরে রাখে, ভালো কাজ করে এবং কঠিন সময়েও ধৈর্য হারায় না। পৃথিবীর চোখে হয়তো তারা সবচেয়ে সফল নন, কিন্তু বিবেকের কাছে শান্ত থাকার যে প্রশান্তি, তার সঙ্গে কোনো বাহ্যিক অর্জনের তুলনা হয় না।
সময়ের আলো/জেডআই