বর্তমান অশান্ত ও সংক্ষুব্ধ পৃথিবীতে মানবজাতির সামগ্রিক জীবনধারা আজ গভীর আদর্শহীনতায় তাড়িত ও বিপথগামী। মানুষের মন থেকে মহৎ গুণাবলির সুবাস ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে, আর সমাজে সত্যনিষ্ঠা, পরম ন্যায়পরায়ণতা, সুদৃঢ় কর্তব্যবোধ এবং পারস্পরিক সহনশীলতার চরম অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।
এসব মহৎ গুণের অনুপস্থিতির দরুনই আধুনিক মানবসমাজ দিকভ্রান্ত হয়ে পৃথিবীকে সঠিক ও কল্যাণকর পথনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। অথচ সত্য কথা বলা এবং আমৃত্যু সত্যের ওপর অটল থাকা মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ গুণাবলির মধ্যে অন্যতম একটি প্রধান গুণ। সত্যবাদিতা কেবল মানুষের একটি সাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই নয়, বরং এটি মানুষের মুমিন জীবনের অন্যতম প্রধান ও অপরিহার্য একটি প্রথম শর্ত। যে অন্তরে বা সমাজে বিন্দুমাত্র সত্যতার অস্তিত্ব নেই, সেখানে নৈতিকতা বা প্রকৃত মুসলমানিত্বের মানদণ্ডও টিকে থাকতে পারে না। বর্তমান অশান্ত সমাজে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক শান্তি ফিরিয়ে আনতে সত্যের সুদৃঢ় প্রতিষ্ঠা তাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
সত্যের ঠিক বিপরীত অবস্থানে রয়েছে সর্বনাশা মিথ্যা, যা মানবজাতিকে ধোঁয়াশা ও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। মিথ্যা মানুষকে চিরতরে ধ্বংস করে দেয় এবং পৃথিবীতে যত অন্যায়, অপরাধ ও পাপ সংঘটিত হয় তার মূল উৎস এই মিথ্যা থেকেই নিঃসৃত। মিথ্যা মানুষের বিবেককে আচ্ছন্ন ও মোহাবিষ্ট করে সত্যের সুপরিসর আওতা থেকে তাকে বহুদূরে অপসৃত করে।
এক কথায় নির্দ্বিধায় বলা যায়, সত্যের মাঝেই রয়েছে মানুষের চরম মুক্তি, আর মিথ্যার অতল গহ্বরে রয়েছে নিশ্চিত ধ্বংস। এই মহাসত্যের বাণী স্মরণ করিয়ে দিয়ে পবিত্র কুরআন মাজিদে সুরা বাকারার ৪২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত জোরালোভাবে ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশ্রিত করো না এবং জেনেশুনে সত্যকে গোপন করো না।’
মিথ্যা কেবল ধর্মীয় ও নৈতিকতার বিচারেই মারাত্মক অন্যায় নয়, বরং একজন মিথ্যাবাদী তার ইহকালীন ও পরকালীন জীবনের প্রতিটি পদে পদে লাঞ্ছিত, অপদস্থ ও অপমানিত হয় এবং তার প্রতিটি কর্মে সে ব্যর্থতার মুখ দেখে। তাই পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালা সব ঈমানদার বান্দাদের মিথ্যা ও অসত্যের পথ চিরতরে পরিত্যাগ করে একমাত্র সত্য ও সুন্দরের সুশীতল ছায়ায় ফিরে আসার জন্য বারবার আহ্বান জানিয়েছেন।
পবিত্র কুরআনের শাশ্বত ও চিরন্তন বাণী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সবসময় সত্যবাদীদের সঙ্গী হও’ (সুরা তওবা, আয়াত : ১১৮)। সত্য মানুষকে চিরকাল আল্লাহর সরল ও সঠিক পথের সন্ধান দেয়, পক্ষান্তরে মিথ্যা মানুষকে শয়তানের নানা প্ররোচনা ও কুমন্ত্রণার দিকে ধাবিত করে। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতদের সদা-সর্বদা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সত্যকে আঁকড়ে ধরার এবং সত্য গ্রহণের জোর উপদেশ দিয়ে গেছেন।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা সবসময় সত্য কথা বলো এবং সত্য বলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করো না, যদিও তা পরম আত্মীয়ের বিরুদ্ধে যায়।’
সত্যই হচ্ছে মানুষের প্রকৃত আদর্শিক ও সুন্দর জীবন, সত্যই হলো মানবজীবনের একমাত্র কল্যাণময় ও স্নিগ্ধ আলো। সত্য কখনোই অমঙ্গল বয়ে আনে না, বরং সত্যই মানুষের সুমহান চরিত্রের মূল মেরুদণ্ড। সত্য ও ন্যায়নীতিই হলো মানুষের ইহকাল ও পরকালের পাথেয়, যা সঠিক পথিককে তার গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। সত্য মানুষকে সমাজে উচ্চ মর্যাদা ও সম্মানে ভূষিত করে এবং নানামুখী বিপদাপদ থেকে রক্ষা করে।
পক্ষান্তরে মিথ্যা মানুষকে অন্ধকারের অতল গহ্বরে ও ধ্বংসের শেষ প্রান্তে নিয়ে যায়। মিথ্যা মানুষকে সত্য ও সুন্দর জীবনযাপন করার আনন্দ থেকে প্রতারিত ও বঞ্চিত করে। মিথ্যা মানেই কুৎসিত অন্ধকার, ক্লেশপূর্ণ তপস্যার এক প্রগাঢ় আধার। সমাজ থেকে মিথ্যা ও অনৈতিকতা দূর না হওয়া পর্যন্ত মানবজাতি কখনোই একটি শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণময় সমাজ বিনির্মাণ করতে পারবে না।
সমাজ থেকে এসব কুসংস্কার ও মিথ্যা দূর করতে হলে সত্যের চর্চা অপরিহার্য, কারণ সত্যের অদম্য প্রভাবে মিথ্যা ধ্বংস হতে বাধ্য। পবিত্র কুরআনে এক ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘সত্য ও ন্যায়ের সঠিক প্রতিষ্ঠা হলে মিথ্যা ও অন্যায় চিরতরে ব্যর্থ হয়ে যায়।’
মিথ্যার কপালে ব্যর্থতাই একমাত্র প্রাপ্য। সত্য মানুষকে সৎকর্মের দিকে ধাবিত করে, আর মিথ্যা মানুষকে বিপথগামী ও ফাসেকির দিকে নিয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা সর্বদা সত্য বলার অভ্যাস গড়ে তোলো। কেননা সত্য মানুষকে নেকির পথ প্রদর্শন করে এবং কালক্রমে জান্নাতের সুউচ্চ মাকামের দিকে নিয়ে যায়।’ যে ব্যক্তি সর্বদা সত্য কথা বলে এবং সত্যের ওপর অবিচল থাকার চেষ্টা করে, সে আল্লাহর দরবারে একজন প্রকৃত সত্যবাদী হিসেবে পরিগণিত হয়।
পক্ষান্তরে মিথ্যা মানবজাতির সবচেয়ে বড় শত্রু, যা সমাজে ফিতনা-ফাসাদ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। সত্য প্রতিষ্ঠার মহান লক্ষ্যেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই পৃথিবীতে আগমন ঘটেছিল। তাই আসুন, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সত্যকে অর্জন করে একটি সুন্দর ও সার্থক জীবন গড়ে তুলি।
লেখক : আলেম ও প্রাবন্ধিক
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে