জাতীয় পার্টির সংস্কার চায় বিএনপি

সাব্বির আহমেদ

জাতীয়

এক সময়ের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা) এবার সংসদ থেকে বহু দূরে। ভোট ও মাঠের রাজনীতিতে দলটি অনেকটা বিপর্যস্ত। ২০২৪

2026-02-27T23:51:59+00:00
2026-02-27T23:51:59+00:00
 
  সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬,
৯ ভাদ্র ১৪৩৩
সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
জাতীয় পার্টির সংস্কার চায় বিএনপি
সাব্বির আহমেদ
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১১:৫১ পিএম 
প্রতীকী ছবি
এক সময়ের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা) এবার সংসদ থেকে বহু দূরে। ভোট ও মাঠের রাজনীতিতে দলটি অনেকটা বিপর্যস্ত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর জাপাকে নিষিদ্ধের জোরালো দাবিও ওঠে। বিএনপির সমর্থন থাকায় ওই যাত্রায় বেঁচে যায় দলটি। সুযোগ পেয়েও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবি ঠেকাতে পারেনি কয়েক টুকরো হওয়া হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি। দলটির এই অবস্থায় সরকারি দল বিএনপি চায় জাপা নিজেদের সংস্কার করে রাজনীতির মাঠে ফিরে আসুক। স্বাভাবিক হোক তাদের নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক কার্যক্রম। বিএনপির এই চাওয়ায় জাপা নেতারাও একমত। তারাও চান, দলের গঠনমূলক সংস্কার, নেতৃত্বে পরিবর্তন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে জাতীয় পার্টির অনেক নেতা দল ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন। নিজেদের ব্যবসায় মনোযোগী হচ্ছেন। আর আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী জাপা নেতারা এখনও নিজেদের আড়াল করে চলছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বহু নেতাকর্মী ইতিমধ্যে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। 

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য এটিইউ তাজ রহমান সময়ের আলোকে বলেন, এই মুহূর্তে দলের সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে নেতৃত্বে পরিবর্তন আসতে হবে। গঠনতন্ত্রে থাকা একক ক্ষমতাকে বিলুপ্ত করতে হবে। নইলে দলের অবস্থা আরও করুণ হবে। 

তিনি বলেন, জাপা এবার একটি আসনও পায়নি। এটা আমাদের জন্য চরম অপমানজনক। এ জন্য নেতৃত্বে ব্যর্থতার দায় নিতে হবে এবং দলে সংশোধনী আনতে হবে। কিন্তু বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদের দলে সংস্কার চান না। জাপার এই নেতা মনে করেন, টুকরো টুকরো জাতীয় পার্টিকে এক করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। নইলে সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় নির্বাচনেও শোচনীয় পরাজয় হবে।

বিএনপির একজন নীতিনির্ধারক সময়ের আলোকে বলেন, বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে। আমরা চাই গণতান্ত্রিক সব দল তার নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করুক। নিষিদ্ধ করে কাউকে দমিয়ে রাখা যায় না। এই যে জামায়াতে ইসলামিকে নিষিদ্ধ করেছিল আওয়ামী লীগ। তাতে কোনো লাভ হয়নি। তাদের উত্থান হয়েছে ভোটে। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টির বর্তমান যা অবস্থা রাজনীতির প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে তাদের অভ্যন্তরীণ সংস্কার দরকার। সংস্কারহীন জাতীয় পার্টি জনগণ মেনে নেবে না। 
আরও পড়ুন

আরেক সিনিয়র নেতা সময়ের আলোকে বলেন, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা কোনো সমাধান নয়। এ রকম হলে ভবিষ্যতের রাজনীতিতে চরম বিরূপ প্রভাব পড়বে। জাতীয় পার্টিকে সংশোধন হতে হবে। জনগণের রাজনীতি করতে হবে।

সর্বশেষ নির্বাচনে এইচ এম এরশাদের প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টির পুরোপুরি ভরাডুবি হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্র চালুর পর এই প্রথম দলটির কোনো প্রার্থী নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির কোনো প্রার্থী মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারেননি। জামানত হারিয়েছেন দলটির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীসহ কয়েক ডজন নেতা। এর মধ্যে জাতীয় পার্টির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রংপুরেও চরম ভরাডুবির মুখে পড়ে দলটি। নির্বাচনের ফলের পর ভোটের রাতেই লাঙ্গল সামনে রেখে ‘জাতীয় পার্টির জানাজা’ করে ব্যঙ্গাত্মক একটি ছবি কেউ শেয়ার করে সোশ্যাল মিডিয়ায়। মুহূর্তেই ছবিটি ভাইরাল হয়ে যায়। এমন ফলকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ জাতীয় পার্টির রাজনীতির শেষ হিসেবে দেখছেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাপা ২০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এর মধ্যে দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের রংপুর-৩ আসনে তৃতীয় হয়েছেন। জাপার মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী গাইবান্ধা-১ আসনে নির্বাচন করে মাত্র ৩৪ হাজারের কাছাকাছি ভোট পেয়েছেন। এই আসনে জয়ী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. মাজেদুর রহমান ১ লাখ ৪০ হাজার ৭২৬ ভোট পেয়েছেন।

যদিও দলটির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী অভিযোগ তুলেছেন, এই নির্বাচনে পরিকল্পিতভাবে জাতীয় পার্টিকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত সাড়ে ১৭ বছর আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি করে জাপা তাদের স্বকীয়তা হারিয়েছে। এমনকি আওয়ামী লীগের দুঃশাসন ও বিতর্কিত নির্বাচনকে বৈধতা দিতে ভূমিকা রেখে দলটি জনগণ থেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

বিগত নির্বাচনগুলোর ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩৪ আসন পেয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা নেয়। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত ‘রাতের ভোট’ বলে পরিচিত নির্বাচনে জাতীয় পার্টি আসন পায় ২২টি। এবারও দলটি প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সংসদে জায়গা করে নেয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালে বিরোধী দলবিহীন নির্বাচনে জাতীয় পার্টির আসন ছিল ১১টি। তাদের প্রাপ্ত ভোট ৩ শতাংশের মতো ছিল।

সেনাপ্রধান থেকে ক্ষমতা গ্রহণ করে টানা ৯ বছর দেশ শাসন করেন এইচ এম এরশাদ। গণ আন্দোলনের মুখে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতন ঘটলে দেশে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩৫টি আসনে জয়লাভ করেছিল। দলটির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ জেলে থেকে রংপুরে পাঁচটি আসনে জয়ী হয়েছিলেন। দলটির প্রার্থীরা ভোট পেয়েছিলেন ১২ শতাংশ। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জাতীয় পার্টির আসন সংখ্যা ছিল ৩২। ভোট পেয়েছিল ১৬ শতাংশ। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। জাতীয় পার্টির সমর্থনে সরকার গঠন করে। ওই নির্বাচনেও এরশাদ পাঁচটি আসনে জয়ী হন।

২০০১ সালে জাতীয় পার্টি আসন পায় ১৪টি। ভোটের সংখ্যা ৭ শতাংশে নেমে আসে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের অংশ হিসেবে ভোট করে দলটি। তারা আসন পায় ২৮টি এবং ভোট পায় ৭ শতাংশ।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কয়েক দফা ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের মতো জাপাকে নিষিদ্ধ করতে সরকারকে চাপ দিয়েছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও জামায়াতে ইসলামীসহ আরও কিছু দল। নুরুল হক নুরের দল গণঅধিকার পরিষদ এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের কাছে চিঠিও জমা দেয়।

যদিও বড় দল বিএনপি এতে সায় দেয়নি। তারা সবসময় নিষিদ্ধের বিপক্ষে ছিল। জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধের প্রসঙ্গে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে বিএনপি নয়। নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড বা কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা বিএনপি সমর্থন করে না বলে দলের তখনকার অবস্থান জানান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ।

ওই সময় জাপা মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বিএনপির হস্তক্ষেপ কামনা করেন। গণতন্ত্রের স্বার্থে এখন জাতীয় পার্টিকে রক্ষা করার দায়িত্ব বিএনপির বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ভোটে ভরাডুবির পর মাঠেও স্বস্তিতে নেই জাতীয় পার্টি। একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা। শহিদ মিনারে যাওয়ার পর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একটি ইউনিটের নেতাকর্মীদের ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগানের মুখে ফুল ও ব্যানার রেখেই শহিদ মিনার এলাকা ত্যাগ করতে হয় তাদের।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের সময়ের আলোকে বলেন, সরকারি দলগুলো সবসময় আমাদের ওপর ছড়ি ঘোরাতে চায়। তারা জাতীয় পার্টিতে হস্তক্ষেপ করে। জাতীয় পার্টিতে সংস্কার অনেক আগেই হয়ে আছে। নতুন করে সংস্কার করার কিছু নেই। দলের মধ্যে ভেজাল সৃষ্টি করতে একটি চক্র সবসময় চেষ্টা করছে।

এএডি/


  বিষয়:   জাতীয় পার্টি  বিএনপি  তারেক রহমান  রাজনীতি 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: