তাহাজ্জুদে জীবনের ক্লান্তি নিবারণ

ফারদিন মোহাম্মদ

ইসলাম

তাহাজ্জুদ নামাজ মুমিনের জীবনে কেবল একটি গতানুগতিক ইবাদত নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি ও আত্মগঠনের এক অনন্য মাধ্যম। এটি এমন এক

2026-02-28T17:11:36+00:00
2026-02-28T17:11:36+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
ইসলাম
তাহাজ্জুদে জীবনের ক্লান্তি নিবারণ
ফারদিন মোহাম্মদ
প্রকাশ: শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৫:১১ পিএম   (ভিজিট : ১১০)
সংগৃহীত ছবি
তাহাজ্জুদ নামাজ মুমিনের জীবনে কেবল একটি গতানুগতিক ইবাদত নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি ও আত্মগঠনের এক অনন্য মাধ্যম। এটি এমন এক শক্তিশালী আমল, যা মানুষের ভেতরের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা, চরম হতাশা ও পাপাচারের তীব্র প্রবণতার বিরুদ্ধে এক অভেদ্য প্রতিরোধ গড়ে তোলে। রাতের সেই নিবিড় নির্জনতায়, যখন দুনিয়ার সব কোলাহল স্তব্ধ হয়ে যায় এবং পৃথিবীর মানুষ গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন থাকে, তখন মহান রবের সামনে দাঁড়িয়ে যে বান্দা অশ্রুসিক্ত হৃদয়ে মিনতি করে, সে কখনোই শূন্য হাতে ফিরে যায় না। কারণ এই পবিত্র ক্ষণটিই হলো দোয়া কবুলের মাহেন্দ্রক্ষণ, যেখানে বান্দা তার স্রষ্টার কাছে সবচেয়ে বেশি নিভৃত ও আন্তরিক হতে পারে। মূলত আজকের এ যান্ত্রিক সভ্যতার কষাঘাতে যখন মানুষের তপ্ত হৃদয় মরুভূমি হয়ে যাচ্ছে, তখন তাহাজ্জুদের স্নিগ্ধ শিশিরবিন্দু সেই তৃষ্ণার্ত হৃদয়ে পরম প্রশান্তির এক অমিয় পরশ বুলিয়ে দিতে পারে।

আরবি ‘তাহাজ্জুদ’ শব্দটি ‘হুজুদ’ মূলধাতু থেকে উৎপন্ন। আভিধানিক দৃষ্টিতে এর অর্থ হলো নিদ্রা ত্যাগ করা বা ঘুম থেকে জেগে ওঠা। আরবি ভাষায় এই শব্দটি একটি চমৎকার বৈচিত্র্য বহন করে, এটি যেমন ঘুমানোর অর্থে ব্যবহৃত হয়, ঠিক তেমনি ঘুমের ঘোর কাটিয়ে জেগে ওঠার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়। তবে ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, রাতের গভীরে প্রিয় শয্যা ও আরামের ঘুম বিসর্জন দিয়ে মহান আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হওয়াকেই তাহাজ্জুদ বলা হয়। অর্থাৎ এটি কেবল জেগে থাকা নয়, বরং আল্লাহর প্রেমের টানে ঘুমের মায়া ত্যাগ করার এক বিশেষ নাম। এককথায় তাহাজ্জুদ হচ্ছে যখন পুরো পৃথিবী ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে, তখন একজন মুমিন তার নফস বা প্রবৃত্তিকে জয় করে জেগে ওঠে শুধু তার রবের সন্তুষ্টির জন্য।

তাহাজ্জুদ আত্মাকে শয়তানের প্ররোচনা থেকে রক্ষা করে এবং মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা তাহাজ্জুদ আদায়কারীদের প্রশংসিত স্থানে অধিষ্ঠিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেন, ‘রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করো; এটি তোমার জন্য অতিরিক্ত কর্তব্য। শিগগিরই তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রশংসিত স্থানে (মাকামে মাহমুদ) অধিষ্ঠিত করবেন’ (সুরা বনি ইসরাঈল : ৭৯)। 

আয়াতটি আমাদের শেখায় যে, বড় কোনো অর্জন বা উচ্চ মর্যাদা পেতে হলে আরাম ত্যাগ করতে হয়। যখন সবাই গভীর ঘুমে মগ্ন, তখন বিছানা ত্যাগের এ কষ্টই বান্দাকে সাধারণের কাতার থেকে তুলে আল্লাহর বিশেষ প্রিয়জনদের কাতারে নিয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে মুমিনের আধ্যাত্মিক আভিজাত্যের প্রতীক।

নবীজি বলেছেন, ‘আল্লাহ ওই ব্যক্তির ওপর রহমত নাজিল করেন, যিনি রাতে নিদ্রা থেকে জেগে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করেন এবং তার স্ত্রীকে নিদ্রা থেকে জাগিয়ে দেন। অতঃপর তিনি (তার স্ত্রী) তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করেন। এমনকি যদি তিনি (স্ত্রী) ঘুম থেকে জেগে উঠতে না চান, তা হলে তার মুখে পানির ছিটা দিন (আবু দাউদ ও নাসাঈ)। পৃথিবীতে যারা আল্লাহর প্রিয় বান্দা বা সালেহীন হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাহাজ্জুদ ছিল তাদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, আমরা যদি শ্রেষ্ঠ মানুষদের কাতারে শামিল হতে চাই, তবে আমাদেরও তাদের মতো রাতের নির্জনতাকে বেছে নিতে হবে। মানুষ চলার পথে ছোট-বড় অনেক ভুল করে।

এই হাদিসটি আমাদের আশ্বস্ত করে যে, তাহাজ্জুদ হলো অতীতের গুনাহ ধুয়ে ফেলার একটি চমৎকার মাধ্যম। এটি আত্মার জন্য একটি ‘ক্লিনজিং প্রসেস’ বা পরিষ্কার করার প্রক্রিয়ার মতো কাজ করে। সবচেয়ে চমৎকার শিক্ষা হলো তাহাজ্জুদ কেবল গত হয়ে যাওয়া পাপ মোচন করে না, বরং ভবিষ্যতে পাপ কাজ থেকে অন্তরকে বাঁচিয়ে রাখে। এটি মুমিনের অন্তরে এমন এক আলোকবর্তিকা যা বিবেককে জাগ্রত করে, যা তাকে অন্যায়ের সামনে গেলেই বাধা দেয়। সামগ্রিকভাবে বলতে এটি আমাদের গত দিনের ক্লান্তি ও পাপ দূর করে এবং আগামী দিনের জন্য আত্মিক শক্তি ও পবিত্রতা সঞ্চয় করতে সাহায্য করে।

তাহাজ্জুদ কেন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার? এর প্রধান রহস্য নিহিত রয়েছে এর বিশেষ সময়ের মধ্যে। যখন নিঝুম রাত গভীর হয়, পৃথিবীর যাবতীয় শোরগোল স্তব্ধ হয়ে আসে এবং প্রতিটি প্রাণ সজাগ পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে, ঠিক তখনই শুরু হয় এক অলৌকিক রহমতের ক্ষণ। ​সহিহ হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী রাতের শেষ তৃতীয়াংশে মহান আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন। এটি তাঁর বিশেষ রহমত ও সান্নিধ্যের এক অপূর্ব প্রকাশ। তিনি তখন কোনো মাধ্যম ছাড়াই তাঁর বান্দাদের সরাসরি ডাকতে থাকেন। মহান রব পরম মমতায় ঘোষণা করেন- ‘কে আছো, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দেব। কে আছো, যে আমার কাছে কিছু চাইবে? আমি তাকে তা দান করব। কে আছো, যে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। (বুখারি ও মুসলিম)

দুনিয়ার সামান্য কারও সাক্ষাৎ পেতে কত কাঠখড় পোড়াতে হয়! অথচ বিশ্বজাহানের মালিক প্রতি রাতে আপনার আরজি শুনতে নিজেই ডাকছেন। যখন কেউ আপনার কষ্ট জানে না, তখন স্বয়ং রাজাধিরাজ আপনার অপেক্ষায় থাকেন।
​নিভৃত রাতের এই প্রার্থনা লোক দেখানোমুক্ত এবং কবুলিয়াতের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। যাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, তাহাজ্জুদ তাদের জন্য ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি। এক ফোঁটা চোখের পানিই পারে আপনার ভাগ্য বদলে দিতে, আপনার সারাজীবনের অপূর্ণতাকে পূর্ণতায় বদলে দিতে।

মোটকথা তাহাজ্জুদ কোনো সাধারণ ইবাদত নয়, বরং এটি স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির এক নিভৃত প্রেমের আলাপন। যখন পৃথিবীর সব কোলাহল স্তব্ধ হয়ে যায় এবং মানুষের দেওয়া আশার বাণীগুলো ফিকে হয়ে আসে, তখন তাহাজ্জুদের জায়নামাজই হয়ে ওঠে মুমিনের শ্রেষ্ঠ আশ্রয়। যান্ত্রিক জীবনের হাজারো ব্যস্ততা আর দুশ্চিন্তার ভিড়ে পরম প্রশান্তি খুঁজে পাওয়ার এর চেয়ে উত্তম মাধ্যম আর নেই। আসুন, অন্তত দুই রাকাত নামাজের মাধ্যমে আমরাও রাতের নিস্তব্ধতায় রবের সান্নিধ্য খুঁজি। কারণ মানুষের কাছে চাইলে অনেক সময় ছোট হতে হয়, কিন্তু আল্লাহর কাছে চাইলে তিনি মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। রাতের সেই এক ফোঁটা চোখের পানিই হতে পারে আমাদের সারা জীবনের প্রাপ্তি আর অনন্তকালের মুক্তির সুনিশ্চিত পরোয়ানা।

শিক্ষার্থী, আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া 

সময়ের আলো/আআ



Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: