বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ২ মার্চ এক গৌরবোজ্জ্বল মাইলফলক। আজ জাতীয় পতাকা উত্তোলন দিবস- যে দিনটি বাঙালির আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে দৃশ্যমান রূপ দিয়েছিল।
১৯৭১ সালের এই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন প্রাঙ্গণের ঐতিহাসিক বটতলায় প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। পতাকা উত্তোলন করেন তৎকালীন ডাকসুর ভিপি আ স ম আবদুর রব। সবুজ জমিনের ওপর লাল বৃত্তের মাঝে সোনালি মানচিত্র খচিত সেই পতাকা ছিল স্বাধীনতার স্পষ্ট ঘোষণা, দিকনির্দেশনা এবং প্রতিরোধের প্রতীক।
সেদিন দুপুরে ও রাতে যথাক্রমে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং তৎকালীন সচিবালয়ে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো হয়। ছাত্রসমাজের এই সাহসী পদক্ষেপ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে জনতার মাঝে। পাকিস্তানি শাসন-শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তখনকার আন্দোলন নতুন গতি পায়। ইতিহাসবিদদের মতে, ২ মার্চের পতাকা উত্তোলন ছিল মুক্তিযুদ্ধের মানসিক ও রাজনৈতিক প্রস্তুতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
দেশের বাইরে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয় ১৮ এপ্রিল ১৯৭১ সালে ভারতের কলকাতায়। সেখানে ডেপুটি হাইকমিশনের প্রধান এম হোসেন আলী পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন- যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দেয়।
২ মার্চের সেই উত্তাল দিনটির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আ স ম আবদুর রব জানিয়েছিলেন, সমাবেশটি বটতলায় হলেও পতাকাটি তিনি উত্তোলন করেছিলেন তৎকালীন কলা ভবন ভবনের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের ছাদে, যাতে সেটি সবার দৃষ্টিগোচর হয়। ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’-এর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
পরবর্তীতে ২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসে জয় বাংলা বাহিনী পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে তার পরিবর্তে এই লাল-সবুজ পতাকা উত্তোলন করে। এরপর পতাকাটি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং তিনি নিজ হাতে সেটি সেখানে উত্তোলন করেন। প্রথম পতাকার নকশা করেছিলেন তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা শিব নারায়ণ দাস। ওই পতাকার মাঝে ছিল বাংলাদেশের মানচিত্র।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’র প্রথম ১০ চরণকে জাতীয় সংগীত এবং কাজী নজরুল ইসলামের ‘চল চল চল’ গানটিকে রণসংগীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
সেখানেই পতাকার মাঝখান থেকে মানচিত্রটি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং পটুয়া কামরুল হাসান জাতীয় পতাকাকে বর্তমান রূপ দেন। অবশেষে, ৪ নভেম্বর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান প্রণয়ন ও গ্রহণের সময় সবুজ জমিনে লাল বৃত্তের এই পতাকাটিকেই দাপ্তরিকভাবে জাতীয় পতাকা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
সময়ের আলো/কেএইচও