অপেক্ষা বাড়ছে সাকিবের, ফেরা হচ্ছে না পাকিস্তান সিরিজে

মেহেদী হাসান

খেলা

বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী নামগুলোর একটি সাকিব আল হাসান। মাঠে তার পারফরম্যান্স দেশের ক্রিকেটকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে

2026-03-02T22:40:11+00:00
2026-03-02T22:40:11+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
খেলা
অপেক্ষা বাড়ছে সাকিবের, ফেরা হচ্ছে না পাকিস্তান সিরিজে
মেহেদী হাসান
প্রকাশ: সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬, ১০:৪০ পিএম 
সাকিব আল হাসান। সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী নামগুলোর একটি সাকিব আল হাসান। মাঠে তার পারফরম্যান্স দেশের ক্রিকেটকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে বহুবার। অথচ এখন আলোচনার কেন্দ্রে তিনি ক্রিকেটের জন্য যতটা নন, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক ও আইনি বাস্তবতার কারণে। 

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার ফেরার সম্ভাবনা নতুন করে আলোচনায় এলেও সামনে রয়েছে একাধিক মামলা ও প্রশাসনিক জটিলতা। তাই প্রশ্নটা সরল হলেও উত্তর জটিল- জাতীয় দলে ফেরার আগে আদালতের লড়াই কি শেষ করতে পারবেন সাকিব?

চলতি মাসে ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজকে সামনে রেখে সাকিবের জাতীয় দলে ফেরার গুঞ্জন জোরালো হয়েছিল। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) থেকেও তাকে ফেরাতে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাঠানো হয়েছে বলেও জানা গেছে। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে, বাস্তবতা তত কঠিন হয়ে উঠছে। সিরিজ শুরুর আর বেশি দেরি নেই। এই স্বল্প সময়ে জটিল আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় বাড়ছে। ফলে বহু প্রত্যাশার সেই প্রত্যাবর্তন আবারও অনিশ্চয়তার কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে।

বিসিবির মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেনও স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি আসন্ন সিরিজে সাকিবের ফেরা নিয়ে। সময়ের আলোকে তিনি জানিয়েছেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে সব রকম কাজ সম্পন্ন। সাকিবের আইনজীবীকে সব বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এ বিষয়ে সবই এখন ওপেন সিক্রেট। তাই নতুন করে কিছু জানার নেই।’

গত দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে তার প্রত্যাবর্তন প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছিল। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে মাগুরা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সক্রিয় রাজনীতির অংশ হয়ে উঠেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে তার দেশে ফেরা ও জাতীয় দলে খেলার বিষয়টি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।

তবে সরকার পরিবর্তনের পরপরই সাকিব আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব চালিয়ে যান। পাকিস্তান ও ভারতে অনুষ্ঠিত ম্যাচে অংশ নেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ২০২৪ সালের অক্টোবরে মিরপুরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে একটি টেস্ট খেলেই বিদায় নিতে চান। সেটিকে তিনি নিজের বর্ণাঢ্য টেস্ট ক্যারিয়ারের উপযুক্ত সমাপ্তি হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বর্তী সরকার নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে তাকে দেশে ফেরার অনুমতি দেয়নি। সেই সিদ্ধান্তে তার বিদায়ি টেস্ট খেলার স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়।

পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয় গত ২৪ জানুয়ারি। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) জানায়, প্রাপ্যতা সাপেক্ষে সাকিবকে হোম ও অ্যাওয়ে সিরিজের জন্য বিবেচনায় রাখা হবে। অনেকেই এটিকে কৌশলগত বার্তা হিসেবে দেখেছিলেন। তবে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার পর সাকিব ইস্যুতে সরকারি অবস্থান কিছুটা নমনীয় হয়। 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অভ্যুত্থান পরবর্তী মামলাগুলো পুনর্নিরীক্ষার নির্দেশ দেন এবং বলেন, কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকও জানান, আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধান হলে সাকিবের ফেরা অসম্ভব নয়।

সাকিবের ফেরা নিয়ে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের মন্তব্য ছিল, ‘রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আইনজীবীর মাধ্যমে তাদের যে আইনগত বিষয়গুলো রয়েছে, সেগুলো মোকাবিলা করে যদি নিরাপরাধ হয়ে তারা (সাকিব ও মাশরাফী) দেশের মাঠে এসে খেলে, আমি একজন ক্রীড়াবিদ হিসেবে তাদের স্বাগত জানাব। আমরা এ ব্যাপারে শতভাগ নমনীয় থাকব ইনশাআল্লাহ।’

বিসিবির সহ-সভাপতি ফারুক আহমেদ সাকিবের ফেরা নিয়ে যেমনটা বলেছেন, ‘সাকিবের ব্যাপারটা ক্রিকেট বোর্ড থেকে যা যা করার দরকার, মামলার কাগজপত্রগুলো জায়গামতো দেওয়া হয়েছে। এখন সরকার সিদ্ধান্ত নেবে এবং অবশ্যই আমরা আমাদের ক্রিকেট বোর্ড থেকে যে কাজটা করার ছিল সেটা করে ফেলেছি।’ ফারুকের বক্তব্যে স্পষ্ট ক্রিকেট বোর্ড তাদের দায়িত্ব শেষ করেছে, এখন সিদ্ধান্ত সরকারের কোর্টে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, তিনটি মামলা এখনও তার পথের প্রধান বাধা। প্রথমটি চেক ডিজঅনার মামলা। আইএফআইসি ব্যাংকের বনানী শাখা থেকে ‘সাকিব আল হাসান অ্যাগ্রো ফার্ম লিমিটেড’ ব্যবসায়িক ঋণ নেয়। পরবর্তীতে ৪১.৫ লাখ টাকার দুটি চেক অপর্যাপ্ত তহবিলের কারণে প্রত্যাখ্যাত হয়। ঢাকার একটি আদালত এ ঘটনায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। যদিও ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঋণ পুনঃতফসিল নিয়ে আলোচনা চলছে এবং ডাউন পেমেন্ট হিসেবে ২২ লাখ টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত পরোয়ানা কার্যকর থাকছে।

দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হত্যা মামলা। ২০২৪ সালের আগস্টের শেষদিকে আদাবর থানায় দায়ের করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে সাকিবকে আসামি করা হয়। অভিযোগটি এক পোশাক শ্রমিকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। ঘটনার সময় সাকিব কানাডায় গ্লোবাল টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে ছিলেন বলে জানা গেছে। তদন্ত এখনও চলমান, চার্জশিট দাখিল হয়নি। তদন্ত কর্মকর্তারা তার ইমিগ্রেশন রেকর্ড যাচাই করছেন। মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় একাধিকবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়েছে।

তৃতীয় মামলাটি হলো দুর্নীতি দমন কমিশনের করা অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থ পাচার সংক্রান্ত। ২০২৫ সালের ১৭ জুন দুদক শেয়ারবাজার কারসাজি ও ২৫৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাকিবসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। যদিও এখনও কোনো চার্জশিট বা গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়নি, তার ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। পরবর্তী শুনানি মার্চের শুরুতে হওয়ার কথা।

আইনজীবীদের মতে, চেক ডিজঅনার মামলা জামিনযোগ্য এবং সমঝোতা হলে দ্রুত নিষ্পত্তির সুযোগ আছে। হত্যা মামলার ক্ষেত্রে সাকিব ঘটনার সময় দেশে ছিলেন না এ তথ্য প্রমাণিত হলে তদন্তে তার সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তবে দেশের আইন বলে, জনপ্রিয়তা নয়, আইনের সমান প্রয়োগই এখানে মূল বিষয়।

চলতি মাসের ১১ মার্চ পাকিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ। সেই সিরিজে সাকিবের নাম থাকবে কি না, তা নির্ভর করছে আইনি অগ্রগতির ওপর। সব মিলিয়ে সাকিবের জাতীয় দলে ফেরা এখন আর কেবল ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্ত নয়, এটি রাজনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ার সমন্বিত ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল। ভক্তদের আবেগ, বোর্ডের অবস্থান এবং সরকারের বার্তা- সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হলেও সম্ভাবনার দুয়ার পুরোপুরি বন্ধ নয়। তবে আদালতের লড়াই শেষ না হলে মাঠে ফেরার পথ এখনও অনিশ্চিতই থেকে যাচ্ছে।

সময়ের আলো/আআ



  বিষয়:   অপেক্ষা  বাড়ছে  সাকিবের  ফেরা  পাকিস্তান  ক্রিকেট 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: