দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর আজ সন্ধ্যায় দিল্লি থেকে দুই দিনের সফরে ঢাকায় আসছেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের পর এটি মার্কিন প্রশাসনের কোনো উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তার প্রথম ঢাকা সফর। আলোচনায় প্রাধান্য পাবে সদ্য স্বাক্ষরিত ঢাকা-ওয়াশিংটন বাণিজ্য চুক্তি এবং এর ভবিষ্যৎ বাস্তবায়ন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ভূরাজনীতি ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলকে গুরুত্ব দেবে।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, জো বাইডেন প্রশাসনের সময় সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু একাধিকবার ঢাকা সফর করেন।
বর্তমান প্রশাসনে তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন কাপুর, যিনি নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতি বিশ্লেষণে দক্ষ হিসেবে পরিচিত। তিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতা বুঝতে তার পক্ষে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। পল কাপুরের সফর ঘিরে নিজেদের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখতে একাধিক প্রস্তুতিমূলক বৈঠক করেছে ঢাকা। এ সফরে ঢাকার পক্ষ থেকে সদ্য সই করা বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ পথ-নির্দেশনা নির্ধারণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
শুল্ক ইস্যুতে কয়েক দফা বৈঠকের পর ৯ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে প্রেসিডেন্টের শুল্কারোপ-সংক্রান্ত আদেশকে আইনবহির্ভূত বলা হয় এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের নির্বাহী আদেশ দেন। এতে চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এবারের বৈঠকে সে বিষয়ে স্পষ্টতা আনার চেষ্টা হবে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ, ব্যবসায়ীদের ভিসা-সহযোগিতা, জ্বালানি ও রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ও তুলবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল নিয়ে আলোচনা জোরদার করতে চায়। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র এই সফরে ভূরাজনীতি, প্রতিরক্ষা, নির্দিষ্ট লক্ষ্যযুক্ত বিনিয়োগ, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের প্রতি গুরুত্ব দেবে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তি বেচতে চায়। ওয়াশিংটন চায়, বাংলাদেশ জিসমিয়া ও আকসা নামের দুটি সামরিক চুক্তিতে যুক্ত হোক। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের পূর্বসূরি রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার গত ২০১৮ সালেই বাংলাদেশের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তি বেচার ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন।
গত ৮ বছর ধরে এই ইস্যুতে ওয়াশিংটন ঢাকাকে চাপে রেখেছে। দুই পক্ষের মধ্যে এই ইস্যুতে চলমান ধারাবাহিক বৈঠক এখন শেষের স্তরে। পশ্চিমের এই দেশটি চায় যে জিসমিয়া (জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন এগ্রিমেন্ট) এবং আকসা (অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস সার্ভিং এগ্রিমেন্ট) নামের দুইটি সামরিক চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দিক বাংলাদেশ। এ বিষয়ে দুই পক্ষের আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে।
ভূরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন চায় না ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক আরও গভীর হোক। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন সিনেট শুনানিতে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশের সরকার ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে এ বিষয়ে সরাসরি আলোচনা করার কথা বলেন। কূটনীতিকদের ধারণা, এবারের সফরেও চীন প্রসঙ্গ উঠতে পারে।
এদিকে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তিটি চরমভাবে বৈষম্যমূলক বলে উল্লেখ করে গত শনিবার এক ব্রিফিংয়ে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যখন শুল্ক-সংক্রান্ত বিষয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছিল, তখন সাধারণ মানুষকে ধারণা দেওয়া হয়েছে যে শুধু শুল্ক নিয়ে আলোচনা চলছে। পাল্টা শুল্কের হার কীভাবে ৩৫ থেকে ২০ শতাংশে কমিয়ে আনতে পারবে সেটি, তার জন্য কিছু কেনাকাটার (প্রকিউরমেন্ট) চুক্তি করলেই নাকি হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত যে চুক্তি হয়েছে, তা দেখে আমরা হতভম্ব, আমরা স্তম্ভিত।
তার ভাষ্য, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে সমমানের চুক্তি না হলে বাংলাদেশ তা করতে পারবে না, যুক্তরাষ্ট্রের সেবা প্রদানকারীদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সমান সুযোগ দিতে হবে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল বাণিজ্যেও মার্কিন মানদণ্ডের প্রতিফলন রাখতে হবে।
এশিয়া প্যাসিফিক ফাউন্ডেশন অব কানাডার জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান সামাজিক মাধ্যম এক্সে লেখেন, কাপুরের সফরে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ ও অংশীদারদের কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয় গুরুত্ব পাবে।
ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, স্টেট ডিপার্টমেন্টের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক ব্যুরোর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি এস. পল কাপুর ৩ মার্চ দুই দিনের সফরে পৌঁছাবেন।
সফরকালে তিনি সরকারের কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে অভিন্ন স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার বিষয় স্থান পাবে।
সময়ের আলো/আরবিএন