দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা রাখার বড় দুই নিয়ামক হচ্ছে রফতানি আয় এবং রেমিট্যান্স। বছরে প্রায় ৫৫ বিলিয়ন ডলারের রফতানি আয় আসে দেশে। রেমিট্যান্স আসে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। মধ্যপ্রাচ্যের ত্রিমুখী যুদ্ধের কারণে বড় এ দুটি খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাবে। ইতিমধ্যে মাত্র এক দিনের ব্যবধানে ব্যারেল প্রতি প্রায় ১০ ডলার দাম বেড়ে গেছে জ্বালানি তেলের।
এই অবস্থার মধ্যেই গতকাল সোমবার ইরানের হামলায় কাতারের জ্বালানি স্থাপনা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে এলএনজি উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে দেশটিতে। এর প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের ওপরও। কারণ কাতার থেকে এলএনজি আমদানি করে বংলাদেশ। সেখানে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে দেশের বাজারে দাম বেড়ে যাবে। ফলে জীবনযাত্রার ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়বে। সুতরাং মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেশ বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে। আর যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্ষতির পরিমাণও অনেক বেড়ে যাবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধের কারণে দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এটাই বাস্তব। তবে এই যুদ্ধের ধাক্কা সামলানোর উপায় কী, বা বাংলাদেশ সরকার এই পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বাভাবিক গতি কীভাবে বজায় রাখতে পারে সেটিই চিন্তার বিষয়।
এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য শুরুতেই একটা বড় ধাক্কা। কারণ দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোটেই ভালো না।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বেসামাল দুর্নীতি, টাকা পাচারসহ লুটপাটের কারণে দেশের অর্থনীতি একেবারে ভেঙে পড়েছিল। গত দেড় বছরে বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকার ভগ্নদশা থেকে অর্থনীতিকে টেনে তোলার চেষ্টা করেছে। ১৫ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের কাছে নিয়ে গেছে। তবে ইন্টেরিম সরকার অর্থনীতিতে গতি আনতে পারেনি নানা রকম সীমাবদ্ধতার কারণে। সুতরাং বিএনপি সরকার রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়েছে অর্থনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে। এই ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যেই যদি আবার যুদ্ধের মতো বড় বাধা এসে সামনে দাঁড়ায় তা হলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য মেরামতের যে উদ্যোগ নেবে নতুন সরকার, সে উদ্যোগ স্বাভাবিকভাবেই চরম বাধাগ্রস্ত হবে।
তিনি বলেন, যুদ্ধ যদি বেশি দীর্ঘায়িত হয় তা হলে দেশের অর্থনীতির বহুমুখী ক্ষতি হবে। তাই সম্ভাব্য ক্ষতি সামাল দিতে সরকারকে আগে থেকেই কিছু পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। যেমন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও বন্ধুপ্রতিম দেশ থেকে সাহায্য ও ঋণ নেওয়া। অর্থনৈতিক সংস্কার করে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করা। রফতানি বৃদ্ধি করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো। দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যবহার করা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া।
এ ছাড়া বাংলাদেশকে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় আরও কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে, যেমন বাস্তবসম্মত বাজেট প্রণয়ন, আর্থিক নীতি প্রণয়ন করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বাণিজ্য নীতি প্রণয়ন করে রফতানি বৃদ্ধি করা। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য উৎপাদন বাড়াতে বিশেষ নজর দিতে হবে। কেন না যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্য, জ্বালানি থেকে শুরু করে অনেক কিছুরই দাম বেড়ে যাবে। অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো গেলে দেশে খাদ্যের কোনো সংকট দেখা দেবে না। এ জন্য কৃষক যাতে ঠিকমতো ফসল ফলাতে পারেন তার সবরকম ব্যবস্থা নিতে হবে।
যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে যেসব খাতে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, আমদানি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করতে পারে। এ ছাড়া তৈরি পোশাক শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান ঝুঁকির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে যা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রধান আমদানি উৎসগুলোতে অস্থিরতার কারণে জ্বালানি তেল, গ্যাস, এবং এলএনজির দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে যা সরাসরি উৎপাদন খরচ এবং পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে। মাত্র একদিনের ব্যবধানে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ১০ ডলার বেড়ে গেছে। একদিন আগে রোববার যেখানে বিশ্ববাজারে ব্যারেল প্রতি জ্বালানি তেলের দাম ছিল ৭০ থেকে ৭১ ডলার, সেখানে গতকাল সোমবার দাম উঠেছে ৮০ থেকে ৮১ ডলার। যুদ্ধের মধ্যে এখন প্রতিদিনই জ্বালানি তেলের দাম বাড়তেই থাকেব। আশঙ্কা করা হচ্ছে কয়েক দিনের মধ্যেই জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ থেকে ১২০ ডলারে ঠেকবে। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে দেশের বাজারে খুবই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
যুদ্ধের কারণে আমদানি ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে। বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার কারণে কাঁচামাল আমদানি ব্যয় বাড়ছে, যা তৈরি পোশাক শিল্পসহ অন্যান্য স্থানীয় শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেবে।
একই কারণে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি উসকে দিচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় ডলারের সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
যুদ্ধের কারণে রফতানি খাতের ওপর ঝুঁকি বাড়বে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান বাজারগুলোতে ক্রেতাদের চাহিদা কমে যেতে পারে, যা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ঠিক একই কারণে রেমিট্যান্স ও শ্রমবাজারের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়বে। মধ্যপ্রাচ্য বা উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপত্তা ঝুঁকির পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি পর্যায়ে আমদানি নির্ভরতা কমানো, কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করা এবং জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
অবশ্য বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, যুদ্ধের কারণে আপাতত বাংলাদেশের চিন্তার কিছু নেই। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলেও আজ (২ মার্চ) পর্যন্ত বাংলাদেশের চিন্তার কোনো কারণ নেই। দুই-চার দিনের মধ্যে এই সংঘাতের সমাধান ঘটলে জ্বালানিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে বাংলাদেশের আশঙ্কার কিছু নেই।
তিনি বলেন, ‘আমরা দেখছি, পরিস্থিতি কোনদিকে যায়। ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীণ ঘুরে আসতে হয়। সে ক্ষেত্রে জাহাজ ভাড়া বেড়ে যায়, যার প্রভাবে সব পণ্যের দাম বাড়ে। তবে এ ধরনের কোনো পরিস্থিতি আমাদের এখনও তৈরি হয়নি।’
সময়ের আলো/আরবিএন