স্থবিরতা কাটিয়ে কাজে গতি ফেরার আশা দুই সিটিতে

সমীরণ রায়

জাতীয়

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর চরম স্থবিরতায় পড়ে রাজধানীর দুই প্রধান নগর সেবা সংস্থা

2026-03-04T06:27:56+00:00
2026-03-04T06:27:56+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
স্থবিরতা কাটিয়ে কাজে গতি ফেরার আশা দুই সিটিতে
নতুন প্রশাসক নিয়োগ
সমীরণ রায়
প্রকাশ: বুধবার, ৪ মার্চ, ২০২৬, ৬:২৭ এএম 
সংগৃহীত ছবি
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর চরম স্থবিরতায় পড়ে রাজধানীর দুই প্রধান নগর সেবা সংস্থা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। 

প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা, সিদ্ধান্তহীনতা ও সমন্বয় সংকটে থমকে যায় উন্নয়ন ও সেবামূলক কার্যক্রম। এর সরাসরি প্রভাব প্রতিফলিত হয় নাগরিক জীবনে। মশক নিয়ন্ত্রণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ভাটা পড়ায় রাজধানীবাসী চরম ভোগান্তিতে পড়েন। দক্ষিণ সিটিতে জন্মনিবন্ধনের সার্ভার জটিলতা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে, যদিও পরে নতুনভাবে কার্যক্রম শুরু হয়।

তবে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠনের প্রেক্ষাপটে দুই সিটিতে নতুন প্রশাসক নিয়োগ পরিস্থিতি বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান এবং ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম দায়িত্ব নিয়েই নাগরিক আস্থা পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। পরিচ্ছন্নতা, মশক নিয়ন্ত্রণ ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দিয়েছেন তারা।

তারা বলেছেন, নাগরিক সেবা প্রদানের মাধ্যমে নগরবাসীর আস্থা অর্জনই হবে প্রধান কাজ। ঢাকা মহানগরীতে সমস্যা অনেক। এসব সমস্যা সমাধানে কাজ করতে চাই। পরিচ্ছন্ন ঢাকা, মশক নিধনসহ বাসযোগ্য নগরী গড়তে নাগরিকদেরও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও সচেতনতা প্রয়োজন। 

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সেবামূলক কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে জনস্বাস্থ্য, জন্ম, মৃত্যু এবং বিয়ে রেজিস্ট্রি, সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও মাতৃসদন পরিচালনা, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, হাসপাতাল ও ডিসপেনসারি, চিকিৎসা, সাহায্য ও স্বাস্থ্যশিক্ষা পরিচালনা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম, খাল-ড্রেনের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম, পানি সরবরাহ ও পানি নিষ্কাশন প্রণালির ব্যবস্থা করা। রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, সড়কবাতি স্থাপন ও সংস্কার।

কিন্তু সব কাজেই এসেছিল স্থবিরতা। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজস্ব আদায়ে ধস নামে ঢাকার সিটি করপোরেশনে। এ কারণেও সংস্থা দুটি এগোতে পারেনি। তবে জনবল সংকট তো রয়েছেই। প্রকৌশল, বর্জ্য, ভান্ডার ও ক্রয়, রাজস্ব, নগর পরিকল্পনা, সংস্থাপনসহ প্রতিটি বিভাগে জনবলের ঘাটতি রয়েছে। 

দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ না হওয়ায় একজন কর্মকর্তাকে একসঙ্গে দুই-তিনটি দফতরের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের অবস্থাও একই। একজনের কাঁধে একাধিক জোন। সংস্থা দুটির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যেই স্পষ্ট জনবল সংকট কতটা প্রকট। যেহেতু দুই সিটি করপোরেশনেই নতুন দুই প্রশাসক যোগদান করেছেন, আশা করা যাচ্ছে এসব সমস্যার সমাধান হবে অচিরেই বলে আশা করেন তারা। 

সিটি করপোরেশনের উন্নয়নমূলক কাজের বড় অংশ করে থাকে প্রকৌশল বিভাগ। কিন্তু তৎকালীন সরকারের সময় ২০২৩-২৪ অর্থবছরের যেসব কাজ শুরু হয়েছিল, সেগুলোই শুধু চলমান ছিল। কিন্তু ওই সময়ের পর বাকি যে কাজগুলো শুরু হওয়ার কথা ছিল, সেগুলো আর শুরু হয়নি। বেশিরভাগই ঠিকাদাররা কাজ ফেলে চলে গিয়েছিলেন। দুই সিটি করপোরেশনের অধীনে ১১৫টি মার্কেটের অধিকাংশই দীর্ঘদিন সংস্কারের বাইরে ছিল।

অন্যদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে ওই বছরের ৮ আগস্ট। ওই বছরের ১৯ আগস্ট দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনে মেয়রদের অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেয় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। 

কিন্তু ওই আদেশে কাউন্সিলরদের অপসারণ করেনি। আওয়ামী লীগের হওয়ায় মামলা-হামলা ও মবের ভয়ে সিটি করপোরেশনে আসেননি তারা। ফলে স্থবির হয়ে পড়ে সিটি করপোরেশনের সেবা কার্যক্রম। একই সঙ্গে ওই তৎকালীন মেয়ররা যেসব উন্নয়নমূলক কাজ শুরু করেছিলেন, সেগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে বিশেষ করে ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সব উন্নয়নকাজে স্থবিরতা দেখা দেয়। 

একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে পারেনি সংস্থা দুটি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দক্ষিণ সিটির রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে মাত্র ৭১১ কোটি। ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬৩০ কোটি টাকা। অন্যদিকে উত্তর সিটির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ১ হাজার ২৫০ কোটি, ঘাটতি ৩৮০ কোটি।  

সংস্থা দুটির একাধিক কর্মকর্তারা বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সিটি করপোরেশন নতুন কোনো কার্যক্রম হাতে নেয়নি। তবে শুধু রুটিন কার্যক্রমগুলো চলমান ছিল। দুটি সংস্থার সাবেক প্রশাসকরা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া অন্যান্য বিভাগীয় প্রধানরাও কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। 

নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত প্রশাসকই দেওয়ার কথা কিন্তু তারা যেহেতু নতুন কোনো সেবা কার্যক্রম হাতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত দেননি, তাই বিভাগীয় প্রধানরা শুধু রুটিনমাফিক কাজগুলো করেছেন। পাশাপাশি শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ছিল আতঙ্ক। বিশেষ করে গত সাড়ে ১৫ বছরে যারা নিয়োগ পেয়েছেন, তারাই ছিলেন বেশি আতঙ্কে। এসব কারণেই মশার উপদ্রব রাজধানীতে নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। 


বিশেষ করে এডিস ও কিউলেক্স মশা। এ মশায় প্রতিদিনই আক্রান্ত হচ্ছে নগরবাসী। দিনে ডেঙ্গু রোগবাহী এডিস, আর সন্ধ্যার পর কিউলেক্সের আক্রমণে অতিষ্ঠ নগরবাসী। বাড়ছে মশাবাহিত রোগীর সংখ্যা। হাটবাজার, অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক সবখানেই ময়লার স্তূপ। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেকেলে ও নাজুক হওয়ায় সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। রান্নাঘর, হাটবাজার, কসাইখানা ও হাসপাতালের বর্জ্য নিরাপদে অপসারণ না হওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করছে।

নগর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্থবিরতা কাটাতে এখন প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত, প্রকল্প তদারকি জোরদার, রাজস্ব আদায়ে গতিশীলতা এবং শূন্যপদে দক্ষ জনবল নিয়োগ। উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত না হলে ড্রেনেজ, সড়ক উন্নয়ন ও নগর পরিকল্পনায় কাক্সিক্ষত অগ্রগতি আসবে না। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাগত শ্লথ গতি কাটিয়ে টেকসই নগর ব্যবস্থাপনায় যেতে হলে জবাবদিহি ও পেশাদারিত্ব অপরিহার্য।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, দুই সিটি করপোরেশনগুলোর কিছু সংকট আগে থেকেই ছিল। তবে  ২০২৪ সালের সরকার পরিবর্তনের পর সেগুলো তীব্র আকার ধারণ করে। 

রাজস্ব আদায়, মেয়র ও কাউন্সিলর না থাকায় নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি সংস্থা দুটি। জনবল ও রাজস্ব সংকট প্রশাসকরা চাইলে মোকাবিলা করতে পারতেন কিন্তু তৎকালীন সময়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ছাড়া কোনো কাজ করতে পারেনি। ফলে এক ধরনের স্থবিরতা ছিল দুই সিটি করপোরেশনে। তবে দুই সিটিতেই নতুন প্রশাসক যোগদান করেছেন, আমরা আশা করছি, হয়তো সব সংকট কাটিয়ে নতুন উদ্যমে গতি বাড়বে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সহ-সভাপতি নগর পরিকল্পনাবিদ সৈয়দ শাহরিয়ার আমিন বলেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে ঢাকার দুই সিটিতে স্থবিরতা দেখা দেয়। এতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়। এই দুই সিটিতে মেয়র ও কাউন্সিলর ছিল না। 

তারা থাকলে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে। সংগত কারণে মশক নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতাসহ সেবামূলক কার্যক্রমে গতি ছিল না। এমনকি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মধ্যে রাস্তা প্রশস্ত করা, খেলার মাঠ ও স্কুল তৈরি এবং বহুতল বিল্ডিংয়ে প্রফেশনাল তদারকি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। আর জনবল সংকট রয়েছে এই দুই সংস্থার। তবে দুই সিটিতেই নতুন প্রশাসক বসেছেন। এখন আমরা আশা করছি, নাগরিক সেবা রাজধানীবাসী পাবেন।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ঢাকার নগরায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাগত শ্লথগতি ও অবহেলা। স্বাধীনতার পর শহরের পরিধি ও জনসংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে কিন্তু পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সেই গতিতে এগোয়নি। 

তবে ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাজের ধীরগতির প্রধান কারণ ছিল সমন্বয়হীনতা এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব। শুধু সঠিক ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমেই নাগরিক ভোগান্তি দূর করা সম্ভব। যেহেতু সংস্থা দুটিতে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, আশা করি নগরবাসী তার ন্যায্য সেবা পাবেন।

সময়ের আলো/এআর


  বিষয়:   স্থবিরতা  গতি  আশা 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: