প্রতি বছর ৮ মার্চ এলে আমরা আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন করি। অডিটোরিয়ামে সেমিনার, করপোরেট মঞ্চে করতালি, সফল নারীদের হাতে সম্মাননা- সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে অনুপ্রেরণার। এ বছরের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘অধিকার, ন্যায়বিচার ও কর্ম’ যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শুধু কথায় নয়, কাজেও সমতার ভিত্তি গড়তে হবে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘিরে আমরা যখন নারীর অধিকার, সমতা ও কর্মসংস্থানের কথা বলি, তখন একটি বিষয় বারবার সামনে আসে- অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা। আজকের ডিজিটাল যুগে সেই স্বনির্ভরতার শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে ই-কমার্স সাইট। ঘরে বসে, স্বল্প পুঁজি নিয়ে, নিজের দক্ষতা আর সৃজনশীলতাকে পণ্য বা সেবায় রূপ দিয়ে আয় করার সুযোগ তৈরি করেছে এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো। ডিজিটাল যুগে এটি কেবল একটি ব্যবসায়িক প্ল্যাটফর্ম নয় বরং নতুন সম্ভাবনার দ্বার।
অনেক নারী আছেন, যারা রান্না, হস্তশিল্প, পোশাক ডিজাইন, প্রসাধনী তৈরি কিংবা বই-খাতা সরবরাহের মতো ছোট উদ্যোগ নিয়ে কাজ শুরু করতে চান কিন্তু দোকান ভাড়া, কর্মচারী, বিদ্যুৎ বিলের হিসাব কষতে গিয়ে সাহস হারিয়ে ফেলেন। ই-কমার্স সাইট সেই প্রাথমিক বাধাগুলো অনেকটাই কমিয়ে দেয়। একটি ওয়েবসাইট বা অনলাইন শপ খুলে পণ্য প্রদর্শন, অর্ডার নেওয়া, পেমেন্ট গ্রহণ এবং ডেলিভারি ব্যবস্থাপনা- সবই করা যায় একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। অন্যদিকে ক্রেতা ঘরে বসেই পণ্য দেখে অর্ডার করতে পারেন।
বাংলাদেশে বর্তমানে ফেসবুক পেজভিত্তিক ব্যবসা খুব জনপ্রিয় হলেও, নিজস্ব ওয়েবসাইট বা প্রতিষ্ঠিত ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার সুবিধা আলাদা। যেমন- দারাজের মতো প্ল্যাটফর্মে বিক্রেতা হিসেবে যুক্ত হলে পণ্যের প্রচার, নিরাপদ লেনদেন ও নির্দিষ্ট কাস্টমার সাপোর্ট পাওয়া যায়। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে চাইলে অ্যামাজন বা আলিবাবার মতো প্ল্যাটফর্মে কাজ করার সুযোগও রয়েছে। এতে দেশীয় পণ্য বিদেশি ক্রেতাদের কাছেও পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
সমাজকর্মী পলি রহমান বলেন, ডিজিটাল বাজার মানে শুধু বিক্রি নয়, বিশ্বাস তৈরি করা। একজন ক্রেতা যখন অনলাইনে পণ্য কিনছেন, তিনি মূলত ছবির ওপর ভরসা করছেন। তাই মানসম্মত ছবি, পরিষ্কার বিবরণ এবং সঠিক মূল্য নির্ধারণ খুব জরুরি। অনেক নতুন উদ্যোক্তা এই জায়গায় ভুল করেন। ফলে প্রথম কয়েকটি খারাপ রিভিউ পুরো ব্যবসার গতি থামিয়ে দেয়। তাই শুরু থেকেই পেশাদারি মনোভাব জরুরি।
একটি ই-কমার্স সাইট মূলত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। প্রথমত এটি একটি ডিজিটাল শো-রুমের মতো কাজ করে। এখানে পণ্যের ছবি, বিবরণ, মূল্য ও বৈশিষ্ট্য সাজিয়ে রাখা হয়। ক্রেতা ঘরে বসেই পণ্য দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। দ্বিতীয়ত এটি অর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সরবরাহ করে। কোন পণ্য কত বিক্রি হলো, কত স্টক আছে- এসব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষিত থাকে। এতে ব্যবসা পরিচালনা সহজ হয়। তৃতীয়ত পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে অনলাইন লেনদেনের ব্যবস্থা থাকে। বিকাশ, নগদ বা কার্ড পেমেন্টের সুবিধা যুক্ত করা যায়। এতে নগদ টাকার ঝামেলা কমে এবং লেনদেন স্বচ্ছ থাকে। চতুর্থত ডেলিভারি সাপোর্ট। অনেক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব লজিস্টিক টিম থাকে, যারা নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেয়। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এই সুবিধাগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংককর্মী ফারজানা মাহমুদা বলেন, অনেক নারী পারিবারিক দায়িত্ব সামলে ব্যবসা করতে চান। দোকানে বসে সারাদিন সময় দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ই-কমার্স সাইট সেই সীমাবদ্ধতা দূর করে। সন্তান স্কুলে পাঠানো, সংসারের কাজ শেষ করা, এসবের ফাঁকে অনলাইনে অর্ডার চেক করা, কাস্টমারের মেসেজের জবাব দেওয়া ইত্যাদি কাজগুলো করা যায় সহজেই। সময় ব্যবস্থাপনার এই নমনীয়তা অনেক নারীকে সাহস যোগাচ্ছে এ ধরনের কাজে।
তবে শুধু প্ল্যাটফর্ম খুললেই সফলতা আসে না। বাজার বিশ্লেষণ, ক্রেতা নির্ধারণ, নিয়মিত প্রচার, সঠিক পরিকল্পনা, মানসম্মত পণ্য, পণ্যের ভালো ছবি, পরিষ্কার বিবরণ, সঠিক মূল্য নির্ধারণ- এসব বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি কাস্টমারের আস্থা অর্জন করতে হবে। সময়মতো ডেলিভারি, ভদ্র আচরণ এবং রিটার্ন পলিসি পরিষ্কার রাখা ব্যবসা দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
আরও পড়ুন
নারী দিবসের প্রেক্ষাপটে বলা যায়, ই-কমার্স শুধু ব্যবসার মাধ্যম নয়, এটি নারীর ক্ষমতায়নের হাতিয়ার। একজন নারী যখন নিজের আয়ে পরিবারকে সহায়তা করেন বা নিজের স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যান, তখন তিনি শুধু একজন উদ্যোক্তা নন- তিনি সমাজে পরিবর্তনের অংশ হয়ে ওঠেন।
ইচ্ছা মহিলার উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি মিতি নেওয়াজ বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকা, গ্রাহকের মতামত শোনা এবং প্রয়োজনে পণ্য উন্নত করা ব্যবসা টিকিয়ে রাখে। ঘরে বসেই নিজের সময় অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ থাকায় পরিবার ও ব্যবসা একসঙ্গে সামলানো সহজ হয়। ফলে অনেক নারী আত্মনির্ভরশীল হয়ে নিজের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যদি ডিজিটাল প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ ও প্রযুক্তি সহায়তা বাড়ানো যায়, তা হলে আরও বেশি নারী এই খাতে যুক্ত হতে পারবেন।
প্রযুক্তির ব্যবহার শেখা এখন আর বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন। স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই শুরু করা সম্ভব একটি ছোট অনলাইন ব্যবসা। সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে ছোট উদ্যোগও বড় ব্র্যান্ডে পরিণত হতে পারে।
এই নারী দিবসে প্রতিজ্ঞা হোক- ঘরের চার দেয়ালের ভেতর লুকিয়ে থাকা প্রতিভাগুলোকে সামনে আনা। ই-কমার্স কেবল ব্যবসার মাধ্যম নয়, এটি ক্ষমতায়নের হাতিয়ার। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নারীর আত্মবিশ্বাস বাড়ায় আর আত্মবিশ্বাসই তাকে এগিয়ে নেয় সমতার পথে।
এএডি/