আমার মা তোমাকে অনেক পছন্দ করবে, ডেবি বলল।
আমি বললাম, আমাকে কেন?
আমার সব বন্ধুদেরকে আমার মা নিজের সন্তানের মত দেখে। তার কাছে পৃথিবীর সবাই আপন। সবাইকে তিনি ভালোবাসেন, ডেবি বলল।
আমি জানি না ডেবির গ্রামটি ঠিক কেমন দেখতে। তবুও আমার চোখে ভেসে উঠলো পূর্ব আফ্রিকার একটা গ্রাম। রাজধানী কাম্পালা থেকে অনেক দূরে। লাল মাটির রাস্তা। কাঁকর বিছানো। দুইপাশে ভূট্টা খেত। কলা বাগান। মিষ্টি আলু। উঁচু নিচু ঢেউ খেলানো প্রান্তর। তারই মাঝে ছোট গ্রাম। ঘর বলতে গম্বুজ আকৃতির মাটির কটেজ। অমসৃণ মাটির দেয়াল। শনের ছাউনি। তাতে বিছানা পেতে ঘুমায় সাত-আটজন। পাশে রান্না করার চুলা। ভুট্টা সিদ্ধ হচ্ছে তাতে। কাসাভা।
কয়েকটি মুরগি খাবার খুটে খুটে খাচ্ছে। ছাগল পাশের স্বল্প পাতার শূন্য গাছে উঠে বসে আছে। ডেবির ভাইবোন ছয় জন। সবাই তার থেকে ছোট। লালমাটির উপর মাদুরে শুয়ে আছে দুই-তিন জন। শরীরের অর্ধেক আবার বাহিরে।
বিকালে যখন বৃষ্টি নামে লাল মাটির গন্ধে পুরো গ্রাম ভরে যায়। কলাবাগানের ওপাশে গরুর ঘণ্টা শোনা যায়। তারপর সন্ধ্যা নামলে সবাই আগুন জ্বালিয়ে রান্না করে। গ্রামগুলিতে বিদ্যুৎ নেই। রাতে কোটি তারার নিচে আদিম জন বসতি। কুটির গুলো থেকে আসছে হালকা লাল আলো। রান্নার চুলা, অথবা লুণ্ঠনের আলো। দূরে সাভানাতে হায়নাদের ডাক। আগুনের চারপাশে সবাই গল্প করছে।
ডেবির সাথে আমার পরিচয় সিবুতে। একটা হোস্টেলে। পিঠে একটা বড় ব্যাগ নিয়ে ডেবি আসল সন্ধ্যার কিছু আগে। আমি কিচেনে রান্না করছিলাম। আমাদের হোস্ট প্রথমে পরিচয় করিয়ে দিল। সে হাতি নাড়িয়ে লম্বা করে হাই দিল।
খুব উচ্ছল প্রাণবন্ত মেয়ে ডেবি। লম্বা। বেশ শুকনা। মাথার চুল ব্রেইট করা। হাসি দিলে তার খুব উজ্জ্বল দাঁত চোখে পড়ে। পরনে ডেনিমের শর্টস। আর স্লীভলেস টপস। তা দিয়ে তার নাভী ঢাকা পড়ে নি। নাভীতে পিয়ার্সিং করানো। ঝুলছে একটা রিং। রিং এর উপর বসানো মাথর ডায়মন্ডের মত ঝল ঝল করছে।
তাকে বললাম, তোমার কি ক্ষুধা লেগেছে? খাবে আমার সাথে আসো।
সে বলল, অনেক ক্ষুধা লেগেছে। সরাসরি কুয়ালালামপুর থেকে এসেছি। মাঝে সিঙ্গাপুরে লে ওভার ছিল। আমি কিচ্ছু খাইনি। আমি আর ডেবি টেবিলে বসে খাবার খাচ্ছি। ভাত, ঢেড়স ভাজি আর মুরগির মাংস। আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। সে উগান্ডা থেকে। অথচ এই মাঝরাতে ফিলিপাইনের এক হোস্টেলে বসে আমরা একই রকম ক্ষুধা, একই রকম ক্লান্তি আর একই রকম স্বপ্ন নিয়ে কথা বলছি।
রাত সাড়ে বারোটা। হোস্টেলের সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। বাহিরে শান্ত শহর। ওসমিনা পাহাড় শ্রেনি ঘুমিয়ে থাকা সিবুকে পাহারা দিচ্ছে। অভ্যয় দিচ্ছে ঘুমাও বাচ্চা আমার। আমার আদুরে মেয়ে, সিবু। সিবু প্রণালি তে পিয়ার থেকে ছুটে যাচ্ছে ফেরি।
গেটের বাহিরে নিচে দুইটা কুকুর ঝিমাচ্ছে। ডেবি এসে আমার পাশে বসল। প্রতিদিন এখানে বসে আজ কাজ করি। তারপর শেষ রাতে ঘুমাতে যাই।
আমাকে একটা ফেইভার করবে? ডেবি বললো। কণ্ঠে তার বিনয়। আমি ম্যাক থেকে চোখ সরিয়ে খুব মিষ্টি করে তার দিকে তাকালাম।
ডেবি বলল, আমার সাথে সেভেন-ইলেভেন যাবে? আমার সিগারেট শেষ। সেভেন-ইলেভেন কত দূর এখান থেকে?
আমি বললাম, চল যাই। পাশেই তো। চার পাঁচ মিনিট লাগবে।
গেইট খুলে বাহিরে চলে আসলাম। কুকুর গুলো উঠে দাড়ল। কিন্তু কিছু বলল না। তারপর আবার আরাম করে শুয়ে পরল। পোষা কুকুর এরা। কালো আসপাল্টের রাস্তা। দুইপাশে এক তলা দোতলা বাড়ি। নিচু পাঁচিল। ফুল নুয়ে পড়ছে পথে পথে। কালো পিচের উপর নাম নাজানা ফুল লুটিয়ে পড়ে আছে। পাশে একটা মালবেরির ঝোপ। লাল, কালো আঙুলের মত মালবেরি ঝুলছে। থোকায় থোকায়। গাছের নিচে পড়ে গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়েছে গুটি কয়েক। আমরা টপকে তা পেরিয়ে চলে এলাম।
পথে অন্ধকার বেশি নয়। শহরটা বেশ খোলামেলা। আকাশ দেখা যায়। রাতের ধূসর ছাই রঙ্গা আকাশের দিকে আমি মাথা উঁচু করে তাকালাম। শহরের অদূরে ওসমিনা পাহাড় শ্রেনী দাঁড়িয়ে আছে। আকাশের নিচে আবছা আবছা দেখা যায়। গলির মোড় পেরিয়ে আমরা বড় রাস্তায় উঠে আসলাম। মোড়ে কয়েকটি ছেলে মেয়ে পান করছে। সিবুর খুব সাধারণ দৃশ্য। পাশেই ম্যাংগো অ্যাভিনিউ।
আমরা তাদেরকে পেরিয়ে সেভেন-ইলেভেনের সামনে চলে আসলাম। ডেবি এক প্যাকেট সিগারেট নিল প্রথমে। চেস্টারফিল্ড। আমি জিজ্ঞেস করলাম, লাইটার? বলল, আমার কাছে আছে। আমি বললাম, আমার জন্য অপেক্ষা করো, আমি বিয়ার নিয়ে আসি। আমি চিলার খুলে দুই বোতল বিয়াল তুলে নিলাম। স্যান মিগ। ১৮৯০ সালের কোম্পানি। স্প্যানিশরা শুরু করেছিলেন ব্রিউইং। আজও একইভাবে একই বোতলে বাজারজাতকরণ করে আসছে। বোতলটা দারুণ সুন্দর। ভিন্টেজ। বোতলের লিখাগুলি মিনিমালিস্ট। এক রঙ্গা।
আমরা হাঁটছি এলোমেলোভাবে। পায়ে স্লিপার। আমার সাইজটা একটু বড়। ডেবি আসার পর আমার স্লিপার দখল করেছে। আমি হাঁটছি টেনে টেনে। হাতে বিয়ারের বোতল। মুখ খোলা। রাস্তাটার এইদিকে খুব নির্জন। গাড়ি নেই। কোন শব্দ নেই। দিনের বেলায় এই রাস্তায় দুই একটা গাড়ি যেতে দেখা যায়। কিন্তু এখন মধ্য রাতে একেবারে ফাঁকা। আমি আত্মবিশ্বাসী। এই শহর নিরাপদ। বাম পাশে একটা ভাঙা বাড়ি। লতাপাতায় ঘেরা। আধুনিক একটা শহরে এমন বাড়ি থাকাটা বেমানান। সেদিন এ্যানা (হোস্টেল ম্যানেজার) বলেছিল, ঐদিকে তুমি রাতে যেও না। ওখানে কয়েক বছর আগে একটা মেয়ের লাশ পাওয়া গেছে। কেউ জানে না, লাশটি কোথায় থেকে এসেছে।
আমরা ঘুরে আবার হোস্টেলে চলে আসলাম। চাবি সবার কাছেই থাকে। যখন খুশি বের হওয়া যায়। আবার হোস্টেলে প্রবেশ করাও যায়। অবাধা স্বাধীনতা। আমরা এসে ডিভানে হেলান দিয়ে বসলাম। মাথার নিচে কুশন দিয়ে আমি শুয়ে পড়লাম। ডেভি আমার পায়ের কাছে বসে সিগারেট খাচ্ছে। সিগারেটের গন্ধটা আমার মোটেও খারাপ লাগছে না। আমার আরাম আরাম লাগছে। ডেবি আমার পা ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করলো, ম্যাগস, ডু ইউ হ্যাভ ইস্যুস উইথ ব্ল্যাক গার্ল?
আমি বললাম, কালো তো একটা রং। নো বিগ ডিফারেন্স। আসল কথা তোমার ভিতরে কি আছে? ডেবি বলল, তোমার উত্তর আমার পছন্দ হয়েছে।
ডেবি বেড়ে উঠেছে পূর্ব আফ্রিকার দেশ উগান্ডাতে। সাবানা, বনাঞ্চল, ভিক্টোরিয়া লেক উগান্ডার প্রকৃতিকে বিশেষ রূপ দিয়েছে। বিস্তৃত প্রান্তর। কিছুটা উচ নিচু। ঢেউ খেলানো। সকালের কুয়াশা সরে যেতেই ধীরে ধীরে হেঁটে বেড়াচ্ছে একদল জিরাফ। বিচরণ করছে গন্ডার। শনের বনে লুকিয়ে আছে সিংহ। হরিণের পাল ঘাস খাচ্ছে, আর পাছে পাছে শিকারির উপর নজর রাখছে। পাশের ডোবায় হা করে রোদ পোহাচ্ছে কুমির। আরো বহুদূরে বৃষ্টি বনের অন্ধকারে বাস করছে পৃথিবীর শেষ কয়েকটি মাউন্টেন গরিলা।
জীবন এখানে আদিম। সমান্তরাল। প্রকৃতি এখানে প্রধান নিয়ামক। ভারসাম্য মেনে চলে। শিকারি ও শিকারের মধ্যে চলে আদিম প্রতিযোগিতা। প্রতিটা দিন সুযোগ। উপভোগ কর। বেচে থাক। অন্যথায় শাকারির থাবায় প্রাণ দাও।
আফ্রিকা মানুষের প্রথম ঠিকানা। মানুষের জন্মভূমি! কোন এক নদীর তীরে, কোন এক বাবাব গাছের ছায়ার, পূর্ব আফ্রিকার কোন এক সাভানায় কোন নারী পুরুষ একে অপরের হাত ধরেছিল। এখানে মানুষ আগুন জ্বালাতে শিখেছে। গল্প বলা শুরু করেছিল। এই পূর্ব আফ্রিকার কোন স্থানে মানুষেরা ভালবেসে সংসার শুরু করেছিল। হাজার জাহার বছর আগে। উষ্ণমণ্ডলীয় বন, সাভানা, মরুভূমি, পর্বত এবং ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু। আমাদের পূর্ব পুরুষের রক্তে, ঘামে আফ্রিকার মাটি হয়েছে লাল। প্রকৃতির সাথে অবিরাম সংগ্রাম করে নিজের পরিবারকে রক্ষা করেছে। কৃষি কাজ, সন্তান জন্মদান, ভাষার বিকাশ ঘটছে এই আফ্রিকায়। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের রক্তে আজও আফ্রিকার স্মৃতি বহন করে চলেছে।
সারাদিন শিকার করেছে। বনে গিয়ে ফুল মূল সংগ্রহ করেছে। কোন লেকে, নদীতে গিয়ে গোসল করেছে তারা। তারপর সন্ধ্যায় আগুন জ্বালিয়ে মাংস পুড়িয়ে খেয়েছেন তারা। আগুনের পাশে গোল বসে রাতের খাবার খেতে খেতে আবিষ্কার হয়েছে ভাষার। জন্মেছে গল্প বলার মতো দারুণ আবেগি ব্যাপার। পরের দিনের পরিকল্পনা। যুদ্ধ প্রস্তুতি বহু শতাব্দী ধরে চলেছে এই যুদ্ধ। হোম স্যাপিয়েন্স আর নিয়ান্ডারথালদের মধ্যে সেই ভয়াবহ যুদ্ধ। আরো একটু উত্তরে যেখানে আফ্রিকা ইউরোপের দেখা পেয়েছে।
ডেবির বয়স সাতাশ। পেশায় একজন ইংরেজি শিক্ষক। উগান্ডাতে তার পরিবার ছেড়ে এসেছে দুই বছর আগে। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়াতে পার্ট টাইম ইংরেজি পড়ায়। ভালান্টারি কাজ করে। তার একটা ওয়েব সাইটো আছে। আমাকে বললো, তুমি আমার কাছে ইংরেজি শিখ।
আমি বললাম, ডেভি, আমার স্কোর সাড়ে সাত। নয়ের মধ্যে।
সে বললো, তাতে কি তোমার উচ্চারণটা নেটিভদের মত না। আমি হেসে বললাম, আমি কিন্তু টাকা দিতে পারব না। সে বলল, আমাকে তাহলে সিগারেট কিনে দিও।
মৃদু গান হচ্ছে, আই ক্যান্ট স্টোপ ফলিং লাভ ইউ। ঘরের আলো কমানো। ডাইনিং টেবিলের পাশে একটা আলো জ্বলছে কেবল। বাকি ঘরে অন্ধকার। ডেবি নিসংকোচ। সামাজিক আড়ষ্টতা নেই। আমি ডেবিকে দেখছি না কেবল। পুরো এক মহাদেশ দেখছি। বিস্তৃত সাভানা, লাল মাটির পথ, ভিক্টোরিয়া লেকে পাড়ে প্রাচীন বন। তাতে লুকানো সোনা। অজানা রহস্য, ভয় আর শিহরন। ডেবি সেই আদিম মানবী। লিলিথ। সিগারেট শেষ করে পা ছড়িয়ে দিয়েছে আমার কোলের কাছে।
কোনো একদিন সত্যিই আমি উগান্ডার সেই লাল মাটির ডেবিদের গ্রামে যাব। ডেবির মা আমাকে দেখে বলবেন, এসো, খেয়ে নাও। পৃথিবীর সব মায়ের ভাষা আলাদা হতে পারে, কিন্তু আদর করার ভাষাটা বোধহয় একই।
সময়ের আলো/জেডআই