ফ্রান্সকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং যুক্তিবাদী সমাজের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়। বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য, শিল্প ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে দেশটির অবদান
ফ্রান্সের বহুল প্রচলিত একটি কুসংস্কার হলো, শুক্রবার ১৩ তারিখকে ঘিরে ভয়। ছবি : প্রতীকী
ফ্রান্সকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং যুক্তিবাদী সমাজের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়। বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য, শিল্প ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে দেশটির অবদান বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। তবু এত অগ্রগতির পরও কিছু শতাব্দীপ্রাচীন বিশ্বাস আজও ফরাসি সমাজে টিকে আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত একটি কুসংস্কার হলো, শুক্রবার ১৩ তারিখকে ঘিরে ভয়। এখনও অনেক ফরাসি এই দিনটিকে অশুভ মনে করেন। কেউ গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকেন, কেউ নতুন উদ্যোগ শুরু করেন না, আবার অনেকে ভ্রমণ বা বড় ধরনের পরিকল্পনাও অন্য দিনে সরিয়ে দেন।
যিশু খ্রিষ্টের শেষ নৈশভোজ। ছবি : সংগৃহীত
এই বিশ্বাসের শিকড় খুঁজতে গেলে ইতিহাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের দিকে তাকাতে হয়। খ্রিষ্টান ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, যিশু খ্রিষ্টের শেষ নৈশভোজে উপস্থিত ছিলেন মোট ১৩ জন। সেই ঘটনার পরের দিন, অর্থাৎ শুক্রবারে যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দুটি ঘটনাকে একসঙ্গে যুক্ত করে ১৩ সংখ্যা এবং শুক্রবার- উভয়কেই অশুভ হিসেবে দেখার প্রবণতা গড়ে ওঠে।
ইতিহাসের আরেকটি ঘটনাও এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে মনে করেন গবেষকরা। ১৩০৭ সালের ১৩ অক্টোবর, যা ছিল শুক্রবার, সেদিন ফ্রান্সের রাজা চতুর্থ ফিলিপের নির্দেশে নাইটস টেম্পলার সংগঠনের শত শত সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাদের অনেককে নির্যাতন করা হয় এবং মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ইতিহাসের এই ভয়াবহ অধ্যায় শুক্রবার ১৩-কে অমঙ্গলের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হয়।
ফ্রান্সের রাজা চতুর্থ ফিলিপের নির্দেশে নাইটস টেম্পলার সংগঠনের শত শত সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। ছবি : সংগৃহীত
তবে বর্তমান ফ্রান্সে সবাই যে এই বিশ্বাসে আস্থাশীল, তা নয়। সমাজের একটি অংশ শুক্রবার ১৩-কে নিছক কুসংস্কার হিসেবেই দেখেন। অন্যদিকে, অনেক মানুষ এখনও এই দিনে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ, বাড়ি কেনা, চাকরি পরিবর্তন বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকেন। তাদের বিশ্বাস, অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি এড়িয়ে চলাই ভালো।
আবার এই দিনের সঙ্গে একটি ভিন্নধর্মী বিশ্বাসও জড়িয়ে আছে। ফ্রান্সে শুক্রবার ১৩ এলেই জাতীয় লটারির টিকিট বিক্রি প্রায়ই বেড়ে যায়। কারণ, অনেকেই মনে করেন এই দিনটি দুর্ভাগ্যের নয়, বরং সৌভাগ্যের প্রতীক হতে পারে। অর্থাৎ একই দিনকে কেউ অশুভ হিসেবে দেখলেও, অন্যরা এটিকে ভাগ্য বদলের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করেন।
শুক্রবার ১৩-কে ঘিরে এমন বিশ্বাস শুধু ফ্রান্সেই সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং লাতিন আমেরিকার কিছু অঞ্চলেও এই দিনকে ঘিরে নানা কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। তবে, সব দেশের ধারণা এক নয়। ইতালিতে ১৩ সংখ্যাকে তুলনামূলকভাবে শুভ মনে করা হয়, সেখানে ১৭ সংখ্যাকে বেশি অশুভ ধরা হয়। অন্যদিকে স্পেনে শুক্রবার নয়, বরং মঙ্গলবার ১৩ তারিখকে দুর্ভাগ্যের দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিজ্ঞান অবশ্য এই বিশ্বাসের পক্ষে কোনো প্রমাণ খুঁজে পায়নি। মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শুক্রবার ১৩-কে ঘিরে মানুষের ভয় মূলত ‘কনফার্মেশন বায়াসের’ ফল। অর্থাৎ কেউ যদি আগে থেকেই বিশ্বাস করেন দিনটি অশুভ, তাহলে ওই দিনে ঘটে যাওয়া কোনো নেতিবাচক ঘটনাকে তিনি সহজেই সেই বিশ্বাসের প্রমাণ হিসেবে ধরে নেন। কিন্তু, একই দিনে ঘটে যাওয়া ইতিবাচক ঘটনাগুলো সাধারণত ততটা গুরুত্ব পায় না। গবেষণাতেও এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি, যা দেখায় শুক্রবার ১৩ তারিখে দুর্ঘটনা বা দুর্যোগ অন্য দিনের তুলনায় বেশি ঘটে।
আজকের তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ এই ধারণাকে কুসংস্কার বলেই মনে করে। তারপরও শুক্রবার ১৩ ফরাসি সংস্কৃতির একটি পরিচিত অনুষঙ্গ হয়ে রয়েছে। বই, চলচ্চিত্র, টেলিভিশন অনুষ্ঠান এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে এই দিনকে রহস্য, ভয় ও রোমাঞ্চের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অনেক পরিবারে এখনও বয়োজ্যেষ্ঠরা এই দিনে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি না নেওয়ার পরামর্শ দেন।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা এই বিশ্বাসের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি না থাকলেও ইতিহাস, ধর্মীয় কাহিনি, লোকবিশ্বাস এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণে শুক্রবার ১৩ এখনও মানুষের কৌতূহলের বিষয়। আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও দিনটি এলেই অনেকের মনে অজান্তেই এক ধরনের সতর্কতা কাজ করে। কেউ একে নিছক কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেন, আবার কেউ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেন। এ কারণেই শুক্রবার ১৩ আজও ফ্রান্সের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আলোচনার অংশ হয়ে আছে।