বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ফিফা বিশ্বকাপ এমন এক মঞ্চ, যেখানে প্রতিটি ম্যাচই ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। আর সেই ম্যাচ যদি হয় সেমিফাইনালের, তা হলে তার গুরুত্ব কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বিশ্বকাপের অসংখ্য স্মরণীয় লড়াইয়ের সাক্ষী হয়েছে ফুটবলপ্রেমীরা। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা, জার্মানি-ইতালি কিংবা ফ্রান্স-জার্মানির মতো বহু ঐতিহাসিক দ্বৈরথ জায়গা করে নিয়েছে ফুটবল ইতিহাসে।
এবার সেই তালিকায় যুক্ত হতে যাচ্ছে আরেকটি নতুন অধ্যায়। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের দুই শক্তিধর দেশ ফ্রান্স ও স্পেন। অবাক করার বিষয় হলো, বিশ্বকাপের প্রায় এক শতাব্দীর ইতিহাসে দুই দল কখনোই সেমিফাইনালে একে অপরের বিপক্ষে খেলেনি। ফলে এবারের ম্যাচটি শুধু একটি ফাইনালের টিকেট নির্ধারণ করবে না, বরং বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ফ্রান্স-স্পেন সেমিফাইনাল হিসেবেও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বিশ্বকাপে ফ্রান্সের সাফল্য এবং ধারাবাহিকতা স্পেনের তুলনায় অনেক বেশি সমৃদ্ধ। ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে ফরাসিরা ধীরে ধীরে নিজেদের বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশেষ করে গত তিন দশকে তাদের ধারাবাহিক সাফল্য ঈর্ষণীয়। ২০২৬ বিশ্বকাপসহ ফ্রান্স এখন পর্যন্ত মোট অষ্টমবারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলতে যাচ্ছে।
১৯৫৮ সালে প্রথমবার শেষ চারে উঠে ব্রাজিলের কাছে হেরে গেলেও সেই আসরে জাস্ট ফনটেইন ১৩ গোল আজও বিশ্বকাপের এক আসরে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড হয়ে আছে। এরপর ১৯৮২ ও ১৯৮৬ সালে মিশেল প্লাতিনির নেতৃত্বে শক্তিশালী দল নিয়েও সেমিফাইনালের বাধা পেরোতে পারেনি ফ্রান্স। তবে ১৯৯৮ সালে নিজেদের মাটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে তারা এবং পরে ব্রাজিলকে হারিয়ে জিতে নেয় প্রথম শিরোপা।
এরপর থেকে ফ্রান্সের সাফল্যের গ্রাফ আরও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। ২০০৬ সালে জিনেদিন জিদানের অনবদ্য নেতৃত্বে পর্তুগালকে হারিয়ে আবারও ফাইনালে উঠেছিল ‘লে ব্লু’রা। যদিও ইতালির কাছে টাইব্রেকারে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয়। ২০১৮ সালে দিদিয়ের দেশমের অধীনে বেলজিয়ামকে হারিয়ে ফাইনালে উঠে ক্রোয়েশিয়াকে পরাজিত করে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতে ফ্রান্স।
এরপর ২০২২ সালে মরক্কোকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে ওঠে তারা, যদিও আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারে পরাজিত হয়ে রানার্সআপ হয়। সব মিলিয়ে আগের সাতটি সেমিফাইনালের মধ্যে চারটিতে জয় পেয়েছে ফ্রান্স এবং চারবার বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে। এবারের সেমিফাইনালে জয় পেলে টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার বিরল কীর্তি গড়বে ফরাসিরা।
অন্যদিকে স্পেনের বিশ্বকাপ ইতিহাস তুলনামূলকভাবে অনেক কম সমৃদ্ধ। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে তারা যতটা সফল, বিশ্বকাপে সেই সাফল্য দীর্ঘদিন ধরা দেয়নি। ১৯৫০ সালে তারা ফাইনাল রাউন্ডে খেলেছিল, কিন্তু তখন বর্তমানের মতো সেমিফাইনাল ব্যবস্থা ছিল না। চতুর্থ স্থানে থেকে শেষ করেছিল স্পেন।
আধুনিক নকআউট কাঠামোয় স্পেন প্রথমবার সেমিফাইনালে ওঠে ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে। সেই আসরে কার্লেস পুয়োলের একমাত্র গোলে জার্মানিকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে স্পেন। পরে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার অতিরিক্ত সময়ের গোলে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে ইতিহাসে প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়নের স্বাদ পায় ‘লা রোহা’রা।
এরপর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২ টানা তিনটি বিশ্বকাপে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি তারা। ফলে ২০২৬ সালে আবার শেষ চারে ওঠে নতুন করে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছে স্প্যানিশরা। এবার নিয়ে মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলছে স্পেন, আর আগের একমাত্র সেমিফাইনালেই জয় পাওয়ার সুবাদে এই পর্যায়ে তাদের সাফল্যের হার এখনও শতভাগ।
বিশ্বকাপে দুই দলের মুখোমুখি লড়াইও খুব বেশি হয়নি। সবশেষ দেখা হয়েছিল ২০০৬ সালের বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে। সেই ম্যাচে স্পেন শুরুতে এগিয়ে গেলেও পরে ফ্রান্স দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে ৩-১ গোলে জয় তুলে নেয়। জিনেদিন জিদানের সেই বিখ্যাত গোল এখনও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন। প্রায় দুই দশক পর আবার বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা হচ্ছে দুই দলের। তবে এবার মঞ্চ আরও বড়, কারণ এটি নকআউটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি সেমিফাইনাল।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালে মুখোমুখি হওয়ায় এই ম্যাচের গুরুত্ব অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। ফ্রান্স চাইবে তাদের সমৃদ্ধ সেমিফাইনাল ইতিহাস আরও উজ্জ্বল করতে, আর স্পেন চাইবে তাদের শতভাগ সেমিফাইনাল সাফল্য ধরে রেখে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিতে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি