বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠা যেকোনো দলের জন্যই উদযাপনের বড় উপলক্ষ। কিন্তু থমাস টুখেলের কাছে শুধু ফল নয়, পারফরম্যান্সও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই নরওয়েকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইংল্যান্ড শেষ চারে জায়গা করে নেওয়ার পরও সন্তুষ্ট হতে পারেননি থ্রি লায়ন্স কোচ। বরং ম্যাচ শেষে নিজের দলকেই কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন। টুখেলের স্পষ্ট বার্তা, আর্জেন্টিনার মতো দলের বিপক্ষে এমন ফুটবল খেললে ফাইনালে ওঠা সম্ভব নয়।
মিয়ামি স্টেডিয়ামে পিছিয়ে পড়েও জুড বেলিংহামের জোড়া গোলে জয় তুলে নেয় ইংল্যান্ড। টানা দ্বিতীয় নকআউট ম্যাচে পিছিয়ে থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে জিতলেও টুখেলের চোখে সেটি ছিল সতর্কবার্তা, আত্মতুষ্টির কারণ নয়। সেদিন ম্যাচ শেষে টুখেল বলেন, ‘ফলটা দারুণ। আমরা শেষ চারে উঠে গেছি, এটা অসাধারণ। কিন্তু আমাদের পারফরম্যান্সে আমি মোটেও খুশি নই। কোনো দিক থেকেই না। খেলোয়াড়দের চেষ্টা ছিল, কিন্তু আমরা নিজেরাই নিজেদের জন্য ম্যাচটা কঠিন করে তুলেছি। আমাদের খেলায় ছিল অনেক এলোমেলো ভাব, অসংখ্য টেকনিক্যাল ভুল, গতি কম ছিল, ধারাবাহিকতাও ছিল না। সত্যি বলতে, আজ আমরা ভাগ্যবান ছিলাম।’
ইংল্যান্ডের লড়াইয়ের মানসিকতার প্রশংসা করলেও তার মূল বার্তা ছিল পরিষ্কার, সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারাতে হলে দলকে আরও অনেক উন্নতি করতে হবে। অবশ্য টুর্নামেন্টে এটি প্রথম নয়, যখন ফলের চেয়ে পারফরম্যান্সকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন টুখেল। এর আগে শেষ ষোলোতে মেক্সিকোর বিপক্ষে নাটকীয় জয়ের পরও তিনি বলেছিলেন, দল বীরত্বপূর্ণ লড়াই করেছে ঠিকই, কিন্তু ইংল্যান্ড এখনও নিজেদের সেরা ফুটবল খেলতে পারেনি।
টুখেলের কোচিং দর্শনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, সাফল্যের পরও খেলোয়াড়দের স্বস্তিতে থাকতে না দেওয়া। নরওয়ের বিপক্ষে জয়ের নায়ক জুড বেলিংহামও সেই ‘টাফ লাভ’ নীতিরই অংশ। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ছয় গোল করে অধিনায়ক হ্যারি কেইনের সমান সর্বোচ্চ গোলদাতা বেলিংহাম।
তবে টুর্নামেন্ট শুরুর আগে তাকে নিশ্চিতভাবে প্রথম একাদশের ‘নাম্বার টেন’ ভাবেননি টুখেল। বরং বারবার বলেছেন, সেই জায়গার জন্য মর্গান রজার্সের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে বেলিংহামকে। শুধু নাম বা খ্যাতির কারণে কাউকে দলে জায়গা দেওয়া হবে না বলেও স্পষ্ট করেছিলেন তিনি। মাঠে আবেগ নিয়ন্ত্রণ নিয়েও বেলিংহামকে প্রকাশ্যে সতর্ক করেছিলেন ইংল্যান্ড কোচ।
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের আগ পর্যন্তও অনিশ্চয়তা ছিল, বেলিংহাম নাকি রজার্স, কে খেলবেন। শেষ পর্যন্ত সুযোগ পান রিয়াল মাদ্রিদের এই মিডফিল্ডার, আর সেই আস্থার প্রতিদানও দিয়েছেন দারুণভাবে। নরওয়ের বিপক্ষে জোড়া গোল করে দলকে সেমিফাইনালে তুলেছেন তিনিই। টুখেলের এই কঠোর মানসিকতা নতুন নয়। চেলসির দায়িত্বে থাকাকালেও একই পদ্ধতিতে খেলোয়াড়দের কাছ থেকে সেরাটা বের করে এনেছিলেন তিনি। ২০২১ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রিমিয়ার লিগে সাউদাম্পটনের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নামানো ক্যালাম হাডসন-ওডয়কে মাত্র ৩১ মিনিট খেলিয়ে আবার তুলে নেন তিনি।
সেই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় টুখেল বলেছিলেন, ‘তার মনোভাব, এনার্জি এবং কাউন্টার-প্রেসিংয়ে আমি সন্তুষ্ট ছিলাম না। আমরা শতভাগ চাই।’ তবে সমালোচনার পরই খেলোয়াড়কে নতুন সুযোগ দেওয়াও ছিল তার দর্শনের অংশ। ‘আগামীকাল থেকে সব ভুলে যেতে হবে’- বলেছিলেন টুখেল। এমনকি তিন দিন পর অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ম্যাচেই আবার প্রথম একাদশে ফিরিয়ে আনেন হাডসন-ওডয়কে।
জার্মান মিডফিল্ডার কাই হাভার্টজও টুখেলের এই কঠোর ভালোবাসার অভিজ্ঞতা পেয়েছিলেন। কঠিন সময়েও তার সামর্থ্যরে ওপর আস্থা রেখেছিলেন টুখেল, আবার একই সঙ্গে উচ্চমান ধরে রাখার তাগিদও দিয়েছেন।
ক্রিস্টাল প্যালেসের বিপক্ষে ৪-১ গোলের জয়ের পর হাভার্টজকে নিয়ে টুখেল বলেছিলেন, ‘তাকে বারবার নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করতে হবে। চেলসির আক্রমণভাগের খেলোয়াড় হিসেবে এটাই বাস্তবতা।’ কয়েক সপ্তাহ পর সেই হাভার্টজই ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালের একমাত্র গোল করে চেলসিকে ইউরোপ সেরা করেছিলেন। ইংল্যান্ডের এবারের বিশ্বকাপ যাত্রাও সহজ ছিল না।
কঙ্গোর বিপক্ষে পিছিয়ে থেকেও জয়, মেক্সিকোর বিপক্ষে দীর্ঘ সময় ১০ জন নিয়ে লড়াই, এরপর নরওয়ের বিপক্ষে আবারও ঘুরে দাঁড়িয়ে জয়, প্রতিটি ম্যাচেই মানসিক দৃঢ়তার পরীক্ষা দিতে হয়েছে থ্রি লায়ন্সের। তবে টুখেলের বিশ্বাস, শুধু লড়াকু মানসিকতা দিয়ে বিশ্বকাপ জেতা যায় না।
আর্জেন্টিনার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারাতে হলে প্রয়োজন আরও নিখুঁত ফুটবল। ডর্টমুন্ড, পিএসজি, চেলসি ও বায়ার্ন মিউনিখে কোচিং করিয়ে ১১টি বড় শিরোপা জেতা টুখেল জানেন, বড় ট্রফি জিততে হলে কখনো কখনো প্রকাশ্য সমালোচনাও খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করার অস্ত্র হতে পারে।
এবার সেই পরীক্ষাই অপেক্ষা করছে ইংল্যান্ডের সামনে। সেমিফাইনালে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে টুখেলের কঠোর বার্তার জবাব মাঠের পারফরম্যান্সেই দিতে হবে থ্রি লায়ন্সের।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি