ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই গোল, নায়কোচিত পারফরম্যান্স আর আবেগের বিস্ফোরণ। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপ যতই ছোট হয়ে আসছে, সেখানে সবচেয়ে বেশি আলোচিত চরিত্র কোনো ফুটবলার নন, বরং রেফারি এবং ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর)। মাঠের প্রতিটি বড় ম্যাচের পর এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে বাঁশি, স্ক্রিন এবং সিদ্ধান্ত। প্রযুক্তি যেখানে বিতর্ক কমানোর জন্য এসেছিল, সেখানে সেটিই যেন নতুন বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে।
বিশ্বকাপের শুরু থেকেই একের পর এক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গ্রুপ পর্বে ইরানের বাতিল হওয়া গোল, ইংল্যান্ড-ঘানার ম্যাচে বিতর্কিত পেনাল্টি না দেওয়া, ক্রোয়েশিয়ার মিলিমিটার অফসাইডে গোল বাতিল কিংবা পর্তুগাল-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচের ভিএআর সিদ্ধান্ত। প্রতিটি ঘটনাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সাবেক ফুটবলারদের আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে।
নকআউট পর্বে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ড কোয়ার্টার ফাইনালে সুইস ফরোয়ার্ড ব্রিল এম্বোলোর দ্বিতীয় হলুদ কার্ড এবং লাল কার্ড দেখানোর সিদ্ধান্ত ঘিরে তীব্র সমালোচনা হয়। সুইজারল্যান্ডের খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফ অভিযোগ করেন, ভিএআর হস্তক্ষেপ ম্যাচের গতিপথ বদলে দিয়েছে। ম্যাচ শেষে সামাজিক মাধ্যমে রেফারিং নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে।
অন্যদিকে ইংল্যান্ড-নরওয়ে ম্যাচেও বিতর্কের আগুন জ্বলে ওঠে। নরওয়ের শিবির দাবি করে, ইংল্যান্ডের সমতাসূচক গোলের আগে বল স্টেডিয়ামের ঝুলন্ত ক্যাবলে স্পর্শ করেছিল। পরে আর্লিং হালান্ডের একটি গোলও ফাউলের কারণে বাতিল হয়। ম্যাচ শেষে হালান্ডের বাবা আলফ-ইঙ্গে হালান্ড সরাসরি বলেন, ‘আমাদের কাছ থেকে ম্যাচটি কেড়ে নেওয়া হয়েছে।’ যদিও ফিফা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে।
সবচেয়ে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচ। যেখানে মিসরের করা ৫৭ মিনিটে একটি গোল ভিএআর দেখে বাতিল হয় ফাউলের জন্য। আর অন্যদিকে ম্যাচের শেষের দিকে যোগ করা সময়ে আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলের আগে সালাহকে ফাউল করছে কিনা সেটা নিয়ে সরাসরি রেফারির দিকে আঙুল তুলেছে মিসর কোচ।
ফ্রান্স-মরক্কো কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই নতুন বিতর্ক তৈরি হয় রেফারি নিয়োগ নিয়ে। পুরো অন-ফিল্ড অফিসিয়াল দলই আর্জেন্টিনার হওয়ায় সামাজিকমাধ্যমে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। যদিও ফিফা জানায়, তাদের নিয়োগ নীতিমালার মধ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি ম্যাচ নয়, টুর্নামেন্টজুড়েই ভিএআরের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন কোচ, সাবেক খেলোয়াড় এবং বিশ্লেষকরা। অনেকের মতে, অফসাইড নির্ধারণে মিলিমিটারের ব্যবধান কিংবা অত্যন্ত সূক্ষ্ম স্পর্শ শনাক্ত করতে প্রযুক্তি যতটা কার্যকর, ফাউল, হ্যান্ডবল কিংবা পেনাল্টির মতো বিষয়গুলো এখনও মানুষের বিচারবোধের ওপর নির্ভরশীল। ফলে একই ধরনের ঘটনায় ভিন্ন ম্যাচে ভিন্ন সিদ্ধান্ত দেখা যাচ্ছে, যা বিভ্রান্তি বাড়াচ্ছে।
এই সমালোচনার মুখে ফিফাও নড়েচড়ে বসেছে। কোয়ার্টার ফাইনালের আগে ভিএআর পরিচালনা পদ্ধতিতে কিছু পরিবর্তন আনা হয়। রিভিউ প্রক্রিয়া আরও সমন্বিত করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব কমানোর লক্ষ্যেই এই পরিবর্তন করা হয়েছে বলে জানায় সংস্থাটি। তবে সমালোচকদের মতে, শুধু প্রযুক্তি বদলালেই হবে না; সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রযুক্তির ব্যবহার আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বিস্তৃত হলেও বিতর্কও বেড়েছে সমানতালে। টুর্নামেন্টজুড়ে লাল কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে, ভিএআর-এর হস্তক্ষেপও আগের তুলনায় অনেক বেশি। ফিফার রেফারিং প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনা অবশ্য দাবি করেছেন, নিয়ম সবার জন্য সমান এবং প্রযুক্তির উদ্দেশ্য ভুল কমানো, কোনো দলকে সুবিধা দেওয়া নয়।
তবু বাস্তবতা হলো, বিশ্বকাপের প্রতিটি বড় ম্যাচের পর এখন গোলদাতার চেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে। সামাজিক মাধ্যমে ‘ভিএআর’, ‘রেফারি’ কিংবা ‘রিগড’ শব্দগুলো ট্রেন্ড করছে ম্যাচের ফলের পাশাপাশি। অনেক সমর্থক মনে করছেন, প্রযুক্তি ফুটবলকে আরও নিখুঁত করেছে; আবার অনেকে বলছেন, এতে খেলার স্বাভাবিক প্রবাহ ও আবেগ হারিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে বিতর্কিত রেফারিং নতুন কিছু নয়। তবে ২০২৬ আসরে প্রযুক্তি, রেফারি এবং ভিএআর। এই তিনের সমন্বয় এমন এক আলোচিত ও সমালোচিত চরিত্রে পরিণত হয়েছে, যা কখনো কখনো ম্যাচের নায়কদেরও আড়াল করে দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, বাকি সেমিফাইনাল ও ফাইনালে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থাকবেন ফুটবলাররা, নাকি আবারও বাঁশি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই রেফারিই।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি