ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল মানেই উত্তেজনা, আবেগ আর ইতিহাস গড়ার লড়াই। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনাল যেন সেই পরিচিত আবহ ছাপিয়ে গেছে। কারণ মাঠে ফ্রান্স ও স্পেনের লড়াই শুরু হওয়ার আগেই দুই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র বাকযুদ্ধ।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ডালাসে যখন কিলিয়ান এমবাপে ও লামিন ইয়ামাল মাঠে নামবেন, তখন এটি শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ থাকবে না বরং দুই প্রতিবেশী দেশের মর্যাদা, অহংকার ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীকী লড়াইয়েও পরিণত হবে।
ম্যাচটির আগে বিতর্কের জন্ম দেন স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাখোয়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি মন্তব্য করেন, ফ্রান্স দলে নাকি কোনো ‘আসল’ ফরাসি খেলোয়াড় নেই। অভিবাসী পটভূমির খেলোয়াড়দের ঘিরে দেওয়া এই মন্তব্য মুহূর্তেই বর্ণবাদ ও বৈষম্যের অভিযোগে সমালোচনার ঝড় তোলে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মন্তব্যটিকে ‘অগ্রহণযোগ্য ও বিভাজনমূলক’ বলে আখ্যা দেন। আরও বিস্ময়ের বিষয়, স্পেনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও নিজের দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য প্রকাশ্যে ‘বর্ণবাদী’ বলে নিন্দা জানান।
এর মধ্যেই দুই দেশের বহু বছরের ঐতিহাসিক মৈত্রী চুক্তি স্পেনের সিনেটে স্থগিত হওয়ার ঘটনা রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও উসকে দিয়েছে। ফলে ফুটবলের এই লড়াইয়ে মাঠের বাইরের উত্তাপও সমানভাবে আলোচনায়। রাজনৈতিক বিতর্ক ভুলে অবশ্য মাঠে নিজেদের কাজটাই করতে চাইবে দুই দল। কারণ এই ম্যাচের বিজয়ী সরাসরি উঠে যাবে বিশ্বকাপের ফাইনালে।
দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলছে। এবার তারা ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে। জিততে পারলে টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে জায়গা করে নেবে তারা। এর আগে এমন কীর্তি গড়তে পেরেছে শুধু জার্মানি ও ব্রাজিল। দিদিয়ের দেশমের দল এই বিশ্বকাপে শুরু থেকেই দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে।
গ্রুপপর্বে সব ম্যাচ জিতে শীর্ষস্থান নিশ্চিত করার পর নকআউটে সুইডেন, প্যারাগুয়ে ও মরক্কোকে হারিয়ে শেষ চারে উঠেছে ‘লে ব্লু’রা। ছয় ম্যাচে তাদের গোলসংখ্যা ১৬, যা টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা আক্রমণভাগের পরিচয় বহন করে।
কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে বেশ কয়েকটি সহজ সুযোগ নষ্ট করেছিল ফ্রান্স। তবে বড় ম্যাচে বড় খেলোয়াড়ের মতোই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে। নিজের দুর্দান্ত গোলে দলকে এগিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি উসমান দেম্বেলের গোলেও রাখেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এমবাপে, দেম্বেলে, মাইকেল অলিসে এবং ব্র্যাডলি বারকোলা কিংবা দেজিরে দুয়ের সমন্বয়ে গড়া ফ্রান্সের আক্রমণভাগ এখন যেকোনো রক্ষণভাগের জন্য ভয়ংকর।
এই বিশ্বকাপটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশমের জন্যও। ১৪ বছরের সফল কোচিং অধ্যায়ের শেষ টুর্নামেন্ট এটি। ১৯৯৮ সালে অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ জেতা দেশম এবার কোচ হিসেবেও আরেকটি শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখছেন। সেমিফাইনালটি হবে তার কোচ হিসেবে ২৬তম বিশ্বকাপ ম্যাচ, যা জার্মান কিংবদন্তি হেলমুট শ্যোনের দীর্ঘদিনের রেকর্ড ভেঙে দেবে।
ইতিহাসও কিছুটা ফ্রান্সের পক্ষেই। বিশ্বকাপের সর্বশেষ চারটি সেমিফাইনালেই জয় পেয়েছে তারা। শুধু তাই নয়, শেষ তিনটি সেমিফাইনালে একটি গোলও হজম করেনি। বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষেও একমাত্র দেখায় জয় ছিল ফরাসিদের। সেটি ২০০৬ জার্মান বিশ্বকাপে। সেবার শেষ ষোলোতে মুখোমুখি হয় দুদল। ফ্রান্সের কাছে ম্যাচটি ৩-১ গোলে পরাজিত হয় স্পেন।
তবে সাম্প্রতিক অতীত স্পেনকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে। ফ্রান্সের বিপক্ষে শেষ ১০ ম্যাচের মধ্যে সাতটিতেই জয় পেয়েছে ‘লা রোহা’। ইউরো ২০২৪-এর সেমিফাইনালে ২-১ ব্যবধানে জয় এবং গত বছরের উয়েফা নেশন্স লিগের নাটকীয় ৫-৪ জয়ের স্মৃতি এখনও স্প্যানিশদের মনে টাটকা। সেই ম্যাচে এমবাপে গোল করলেও লামিন ইয়ামালের জোড়া গোলই পার্থক্য গড়ে দিয়েছিল।
এই বিশ্বকাপে স্পেনের অন্যতম নায়ক হয়ে উঠেছেন মিকেল মেরিনো। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে শেষ মুহূর্তে জয়সূচক গোল করেন তিনি। এর আগে পর্তুগালের বিপক্ষেও একইভাবে ম্যাচ জিতিয়েছিলেন। বিশ্বকাপের নকআউট ইতিহাসে বদলি হিসেবে নেমে দুই ম্যাচে জয়সূচক গোল করা প্রথম ফুটবলার এখন মেরিনো।
লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে স্পেনও দুর্দান্ত ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। ২০১৮ বিশ্বকাপের পর থেকে বড় কোনো টুর্নামেন্টে তারা মাত্র একটি ম্যাচ হেরেছে। শেষ ১৪টি ম্যাচে অপরাজিত থেকে ৯টি ক্লিন শিট রেখেছে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নরা। দলগত অবস্থাও দুই দলের জন্য স্বস্তিদায়ক। তবে ফ্রান্সেও বড় কোনো ইনজুরির ঘটনা নেই।
এমবাপের গোড়ালির চোট গুরুতর নয় এবং তিনি খেলতে প্রস্তুত। মানু কোনের হাঁটুর সমস্যাও বড় নয়। গোল্ডেন বুটের দৌড়ে থাকা এমবাপের ইতিমধ্যে ৮ গোল করেছেন। অন্যদিকে স্পেনের হয়ে মিকেল ওয়ারইয়ারসাবাল চার গোল নিয়ে আক্রমণের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। লামিন ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস, ফেরান তোরেস, পেদ্রি, মেরিনো ও দানি ওলমোর মতো তারকারা স্পেনকে দিয়েছে দারুণ ভারসাম্য।
পরিসংখ্যানও ম্যাচটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে। পেনাল্টি শুটআউট বাদ দিলে স্পেন টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত। অন্যদিকে বড় ম্যাচে ফ্রান্সের মানসিক দৃঢ়তা ও নকআউট অভিজ্ঞতা তাদের অন্যতম শক্তি। তাই ৯০ মিনিটে ফল না এলে অতিরিক্ত সময় কিংবা টাইব্রেকার সবকিছুরই সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজনৈতিক উত্তেজনা, ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দুই কোচের কৌশল, এমবাপে-ইয়ামালের তারকাযুদ্ধ এবং ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন। সব মিলিয়ে ডালাসের এই রাত বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে। শেষ পর্যন্ত কে হাসবে, সেটিই এখন ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপেক্ষা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি