বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল আর আর্জেন্টিনার সম্পর্ক যেন সাফল্যের এক অদ্ভুত সমীকরণ। ইতিহাস বলছে, বিশ্বকাপে যতবার সেমিফাইনালে উঠেছে আর্জেন্টিনা, ততবারই জায়গা করে নিয়েছে ফাইনালে। সেই পরিসংখ্যান সামনে রেখে এবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ চারের লড়াইয়ে নামবে লিওনেল স্কালোনির দল। আর মাত্র দুটি জয় পেলেই টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের বিরল কীর্তি গড়বে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা।
কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ম্যাচে গোল পাননি মেসি। তবে অধিনায়কের গোল ছাড়াও যে আর্জেন্টিনা জয়ের পথ খুঁজে নিতে পারে, সেটিও আরও একবার প্রমাণ করেছে স্কালোনির দল।
ম্যাচের শুরু থেকেই ইতিবাচক ফুটবল খেলতে থাকে সুইজারল্যান্ড। আর্জেন্টিনাকে চাপে রাখার চেষ্টাও ছিল তাদের খেলায়। তবে আর্জেন্টিনার প্রথম সত্যিকারের আক্রমণেই বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। মেসির নেওয়া দারুণ এক কর্নার থেকে মাথা ছুঁইয়ে বল জালে পাঠান অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। নিখুঁত সেই হেডে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।
পিছিয়ে পড়ার পরও লড়াই চালিয়ে যায় সুইজারল্যান্ড। ম্যাচের ৬৭ মিনিটে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে সমতায় ফেরে তারা। এরপর একসময় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণও নিজেদের হাতে নিতে শুরু করেছিল সুইসরা। তবে ভিএআর পর্যালোচনার পর ডাইভ দেওয়ার অপরাধে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন সুইজারল্যান্ডের এক খেলোয়াড়। লাল কার্ডের পর ১০ জনের দল নিয়েও শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যায় তারা।
নির্ধারিত সময়ে কোনো দলই ব্যবধান গড়তে না পারায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। আর সেখানেই আবারও নিজেদের দৃঢ়তার পরিচয় দেয় আর্জেন্টিনা। স্কালোনির অধীনে অতিরিক্ত সময় কিংবা টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার আত্মবিশ্বাস বরাবরই চোখে পড়ার মতো। চাপের মুহূর্তে ম্যাচ নিজেদের দিকে টেনে নেওয়ার অভ্যাসও দেখিয়েছে দলটি।
অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনাকে আবারও এগিয়ে দেন হুলিয়ান আলভারেজ। প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে ডান পায়ে নেওয়া তার বাঁকানো শক্তিশালী শট গিয়ে জড়ায় গোলপোস্টের ওপরের কোণে। সুইস গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেল শরীর ছুড়ে দিয়েও বলের নাগাল পাননি। দৃষ্টিনন্দন সেই গোলের পর উচ্ছ্বাসে মাঠের দিকে ছুটে আসেন আর্জেন্টিনার বেঞ্চের খেলোয়াড়েরাও।
পুরো ম্যাচেই অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন আলভারেজ। আক্রমণ গড়ার পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটেছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত দুর্দান্ত এক গোল করে নিজের পরিশ্রমের পুরস্কারও তুলে নেন এই আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার।
এরপর ক্লাসিক এক পাল্টা আক্রমণ থেকে ম্যাচের ফল নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা। তিন আক্রমণভাগের খেলোয়াড়ের বিপরীতে তখন সুইজারল্যান্ডের ডিফেন্ডার ছিলেন মাত্র একজন। থিয়াগো আলমাদার শট কোবেল ঠেকিয়ে দিলেও ফিরতি বল সহজ টোকায় জালে পাঠান লাওতারো মার্তিনেজ। ৩-১ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করে সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয় বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
এবার আর্জেন্টিনার সামনে ইংল্যান্ড। বুধবার রাত একটায় মুখোমুখি হবে দুই দল। ম্যাচটি ঘিরে বাড়তি আগ্রহের কারণ লিওনেল মেসিও। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে এখনো ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলা হয়নি তার। ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিষেক হয় মেসির। কাকতালীয়ভাবে একই বছর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সর্বশেষ ম্যাচ খেলেছিল আলবিসেলেস্তেরা।
স্বাভাবিকভাবেই আর্জেন্টিনাকে নিয়ে হোমওয়ার্ক শুরু করে দিয়েছে টমাস টুখেলের ইংল্যান্ড। কাগজে-কলমে স্কালোনির বর্তমান দলটিকে হয়তো অপ্রতিরোধ্য মনে হচ্ছে না। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষেও কিছু দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। খেলোয়াড়দের মধ্যে বোঝাপড়ার ঘাটতি ছিল। তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষ ১০ জন নিয়ে খেলার পরও প্রত্যাশা অনুযায়ী পর্যাপ্ত গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারেনি আর্জেন্টিনা।
ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তাই আরও মনোযোগী হতে হবে মেসিদের। ছোট ভুলও বড় মূল্য চুকিয়ে দিতে পারে। তবে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত যেকোনো পরিস্থিতিতে ম্যাচ জিতে নেওয়ার মানসিকতা।
প্রয়োজনের মুহূর্তে মেসি জ্বলে উঠছেন। চাপের মধ্যে স্কালোনির দল নিজেদের সেরা খেলাটা বের করে আনতে জানে। ম্যাচ যত কঠিন হয়, জয়ের পথ খুঁজে নেওয়ার তাড়নাও যেন তত বাড়ে আর্জেন্টিনার। সবকিছু জিতে নেওয়ার ক্ষুধা এখনো স্পষ্ট বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের খেলায়।
বিশ্বকাপ ধরে রাখার মিশনে আর মাত্র দুই ধাপ দূরে আর্জেন্টিনা। ইতিহাস, মানসিক দৃঢ়তা এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়ানোর সামর্থ্য সবই এখন মেসিদের পক্ষে কথা বলছে। আর টুর্নামেন্ট ফুটবলে যে দল ঠিক সময়ে জয়ের পথ খুঁজে নিতে পারে, শেষ পর্যন্ত শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার হয়ে ওঠে সাধারণত তারাই।
সময়ের আলো/আরবিএন