গোলেরও যেন নিজস্ব এক ভাষা আছে। কখনো তা বজ্রের মতো গর্জে ওঠে, কখনো নিঃশব্দে ইতিহাসের পাতায় লিখে যায় নতুন অধ্যায়। বিশ্বকাপের আলো-ঝলমলে রাতগুলোতে প্রতিটি গোল শুধু স্কোরবোর্ডের সংখ্যা বদলায় না; বদলে দেয় একটি দেশের ভাগ্য, ভেঙে দেয় প্রতিপক্ষের স্বপ্ন, আবার কোটি সমর্থকের হৃদয়ে জ্বালিয়ে দেয় নতুন আশার আলো। প্রতিটি উদযাপন যেন এক একটি কবিতা, প্রতিটি উল্লাস যেন অমর হয়ে ওঠা এক একটি মুহূর্ত। কেউ গোল করে দেশকে এগিয়ে নেন, কেউ নিজের নাম তুলে দেন কিংবদন্তির কাতারে।
তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে শিরোপার পাশাপাশি আরেকটি ব্যক্তিগত গৌরবও সমান অনাকাক্সিক্ষত-গোল্ডেন বুট। এই মুকুট জিততে বিশ্বের সেরা গোলদাতারা প্রতিটি ম্যাচে নিজেদের উজাড় করে দেন। তাই প্রতিটি শট, প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি সুযোগ হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের নতুন পরীক্ষা। টুর্নামেন্টের শেষভাগে এসে সেই লড়াই এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে এক গোলেই বদলে যাচ্ছে সমীকরণ, এক ম্যাচেই পাল্টে যাচ্ছে অবস্থান। সত্যিই, গোল্ডেন বুটের এই মহারণে কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জায়গাও ছেড়ে দিতে রাজি নন। এ যেন সেই বিখ্যাত উক্তির মতো- কেউ কারও নাহি ছাড়ে, সমানে সমান।
টুর্নামেন্ট যত শেষের দিকে এগোচ্ছে, গোল্ডেন বুটের সমীকরণ ততই জটিল হয়ে উঠছে। একেকটি গোল বদলে দিচ্ছে অবস্থান, একেকটি ম্যাচ নতুন করে লিখছে হিসাব। শীর্ষে থাকলেও নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই কারও। কারণ পেছনে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বীরা মাত্র একটি দুর্দান্ত ম্যাচেই সবকিছু উল্টে দিতে পারেন।
এই মুহূর্তে সবার ওপরে রয়েছেন কিলিয়ান এমবাপে। ফ্রান্সের অধিনায়ক ইতিমধ্যে করেছেন ৮ গোল। বিশ্বকাপজুড়ে তার গতি, নিখুঁত ফিনিশিং এবং বড় ম্যাচে দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা আবারও প্রমাণ করেছে কেন তাকে এই প্রজন্মের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড বলা হয়। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের জন্য তিনি যেন এক দুঃস্বপ্ন। সবচেয়ে বড় কথা, ফ্রান্স এখনও শিরোপার লড়াইয়ে টিকে থাকায় এমবাপের সামনে গোলসংখ্যা আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তাই আপাতত গোল্ডেন বুটের দৌড়ে তিনিই সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে।
তবে এমবাপের সঙ্গে সমানতালে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনার অধিনায়কও করেছেন ৮ গোল। বয়স কিংবা ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ের আলোচনা যেন তার ফুটবলে কোনো প্রভাবই ফেলতে পারেনি বরং প্রতিটি ম্যাচে আরও পরিণত, আরও কার্যকর হয়ে উঠেছেন তিনি। গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে গোল করানো, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নেতৃত্ব। সব মিলিয়ে মেসিই এখনও আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভরসা। সেমিফাইনালে তার সামনে আরও একটি সুযোগ থাকায় গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে এমবাপের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী তিনিই।
৭ গোল নিয়ে তাদের ঠিক পেছনেই আছেন নরওয়ের গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড। শক্তি, উচ্চতা, গতি এবং অসাধারণ ফিনিশিং তাকে আলাদা করেছে অন্যদের থেকে। বক্সের ভেতরে সামান্য সুযোগ পেলেই তা গোলে পরিণত করার বিরল দক্ষতা রয়েছে তার। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে নরওয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেওয়ায় হালান্ডের গোলসংখ্যা আর বাড়ানোর সুযোগ নেই।
এই লড়াইয়ে সমান ৬ গোল করে নজর কেড়েছেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন এবং মিডফিল্ড সেনসেশন জুড বেলিংহাম। কেইন তার অভিজ্ঞতা ও নিখুঁত ফিনিশিং দিয়ে পুরো টুর্নামেন্টে ইংল্যান্ডের আক্রমণের মূল ভরসা ছিলেন। অন্যদিকে মিডফিল্ডার হয়েও বেলিংহামের ৬ গোল এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম বড় চমক। আক্রমণভাগে তার অবিরাম ছুটে চলা, বক্সে ঢুকে গোল করার ক্ষমতা এবং বড় ম্যাচে নিজেকে মেলে ধরার দক্ষতা তাকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ইংল্যান্ড এখনও টুর্নামেন্টে থাকায় এই দুই তারকার সামনেই গোলসংখ্যা আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে, যা গোল্ডেন বুটের লড়াই আরও রোমাঞ্চকর করে তুলেছে।
গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ের সৌন্দর্য এখানেই। শুধু প্রতিভা নয়, সময়ও বড় একটি বিষয়। একটি ম্যাচেই কেউ তিন গোল করে সবার ওপরে উঠে যেতে পারেন, আবার এক ম্যাচ গোলশূন্য থাকলেই হারিয়ে যেতে পারেন শীর্ষস্থান। তাই বর্তমান অবস্থান যতই শক্তিশালী হোক, শেষ বাঁশি বাজার আগে কিছুই নিশ্চিত নয়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন অনেকবার দেখা গেছে, সেমিফাইনাল কিংবা ফাইনালের একটি দুর্দান্ত পারফরম্যান্সই বদলে দিয়েছে গোল্ডেন বুটের মালিক। তাই এমবাপে এগিয়ে থাকলেও মেসি কিংবা হালান্ডের জন্য এখনও সব দরজা খোলা। তাদের প্রত্যেকের সামনে রয়েছে ইতিহাস গড়ার সুযোগ।
শিরোপা জয়ের আনন্দ ভাগ করে নেয় একটি দল। কিন্তু গোল্ডেন বুট একান্তই ব্যক্তিগত গৌরবের প্রতীক। তাই এই দৌড়ে বন্ধুত্ব নেই, ছাড় নেই, করুণা নেই। আছে শুধু গোল করার অদম্য ক্ষুধা, ইতিহাসে নিজের নাম লেখানোর তীব্র আকাক্সক্ষা। আর সেই কারণেই বিশ্বকাপের শেষ অধ্যায়ে এসে গোল্ডেন বুটের লড়াই হয়ে উঠেছে আরেকটি ফাইনাল। যেখানে সত্যিই কেউ কারও নাহি ছাড়ে, সমানে সমান।
সময়ের আলো/এসএকে