সব যুদ্ধ তরবারি দিয়ে জেতা যায় না। কিছু যুদ্ধ জেতা হয় ধৈর্যে, অপেক্ষায়, আর ঠিক সেই একজনের পায়ে, যিনি সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্তে আলো জ্বালাতে জানেন। কানসাস সিটির রাতেও ঠিক এমন এক গল্পের জন্ম দিল আর্জেন্টিনা। ১১২ মিনিট পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের ইস্পাত-কঠিন দেয়ালে বারবার ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছিল বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ১০ জনের দলও হয়ে উঠেছিল জগদ্দল পাথর।
মনে হচ্ছিল, আর্জেন্টিনার স্বপ্নের পথ বুঝি এখানেই থেমে যাবে। তখনই হুলিয়ান আলভারেজের পা থেকে বেরিয়ে এলো এক শিল্পকর্ম, বাঁক নিতে নিতে বলটি যেন আকাশে রংধনু এঁকে গিয়ে আশ্রয় নিল জালের কোনায়। সেই গোলে ভেঙে গেল সুইসদের প্রতিরোধ, আর শেষ বাঁশি বাজার আগে লাউতারো মার্তিনেজের শেষ আঘাতে ৩-১ গোলের জয় নিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠে গেল লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনা। এবার তাদের সামনে ইংল্যান্ড।
কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে শুরু থেকেই ম্যাচের ছন্দ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় আর্জেন্টিনা। বলের দখল, ছোট ছোট পাস আর একের পর এক আক্রমণে সুইজারল্যান্ডকে চাপে রাখে তারা। সেই আধিপত্যের প্রতিফলন আসে ১০ মিনিটেই। লিওনেল মেসির কর্নার থেকে দুর্দান্ত টাইমিংয়ে হেড করে বল জালে পাঠান অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। আকানজিকে টপকে ছয় গজের বক্সের কোনা থেকে নেওয়া সেই হেডে গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেলের কিছুই করার ছিল না। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের শুরুটা ছিল একেবারেই স্বপ্নের মতো।
তবে সুইজারল্যান্ডও প্রমাণ করেছে, তারা কোয়ার্টার ফাইনালে কেবল অংশ নিতে আসেনি। ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরে আসে মুরাত ইয়াকিনের দল। দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের ধার আরও বাড়িয়ে দেয় তারা। অবশেষে ৬৭ মিনিটে রিকার্ডো রদ্রিগেজের সঙ্গে নিখুঁত ওয়ান-টু পাস খেলে ড্যান এনদোয়ে সংকীর্ণ কোণ থেকেও দুর্দান্ত শটে এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে পরাস্ত করেন। মুহূর্তেই বদলে যায় ম্যাচের আবহ। গ্যালারিতে বাড়তে থাকে উত্তেজনা, আর আর্জেন্টিনার শিবিরে নেমে আসে অস্বস্তি।
এরপরই আসে ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত। ৭২ মিনিটে প্রথমে লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখান রেফারি। কিন্তু ভিএআরের পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্রিল এম্বোলো ফাউল আদায়ের জন্য ডাইভ দিয়েছেন। ফলে পারেদেসের কার্ড বাতিল করে এম্বোলোকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখানো হয়। এক মুহূর্তেই ১০ জনের দলে পরিণত হয় সুইজারল্যান্ড।
সিদ্ধান্তটি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলেও লাল কার্ডের পরও অবিশ্বাস্য শৃঙ্খলায় নিজেদের রক্ষণ সামলায় সুইসরা। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে আর কোনো গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
সেখানেও সুইজারল্যান্ডের গোলপোস্টের সামনে অদৃশ্য এক দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন গ্রেগর কোবেল। মেসি, আলমাদা, আলভারেজ। একটির পর একটি আক্রমণ ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু প্রতিটি প্রতিরোধেরও একসময় শেষ হয়। ১১২ মিনিটে আসে সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। মেসির প্রচেষ্টা কোবেল ঠেকিয়ে দিলেও ফিরতি বল পেয়ে হোসে মানুয়েল লোপেস খুঁজে নেন হুলিয়ান আলভারেজকে। বক্সের বাইরে থেকে ডান পায়ে নেওয়া তার অসাধারণ বাঁকানো শট জালের ওপরের কোনায় গিয়ে জড়ায়। গোলটি ছিল শুধু লিড নেওয়ার নয়, ছিল দীর্ঘ প্রতিরোধ ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা। কানসাস সিটির গ্যালারি তখন আর্জেন্টাইন সমর্থকদের উল্লাসে কেঁপে ওঠে।
সুইজারল্যান্ড এরপর শেষ চেষ্টা চালায়। কিন্তু যোগ করা সময়ে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে থিয়াগো আলমাদার শট কোবেল ফিরিয়ে দিলেও রিবাউন্ডে কোনো ভুল করেননি লাউতারো মার্তিনেজ। সহজ ফিনিশে ৩-১ ব্যবধান নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনার সেমিফাইনালের টিকেট পাকাপোক্ত করেন। ম্যাচ শেষে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেও আত্মতুষ্ট নন আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি।
তিনি বলেন, ‘আজ আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা হয়েছে। সুইজারল্যান্ড দুর্দান্ত লড়েছে। লাল কার্ড আমাদের কিছুটা সুবিধা দিয়েছে, কিন্তু নকআউট ম্যাচে জয়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সামনে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।’
অন্যদিকে সুইজারল্যান্ড কোচ মুরাত ইয়াকিনের ক্ষোভ ছিল রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে। তিনি বলেন, ‘এম্বোলোর দ্বিতীয় হলুদ কার্ড ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। এটা খুবই কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল। আমি আমার খেলোয়াড়কে দোষ দিচ্ছি না। এমন সিদ্ধান্ত এই পর্যায়ের ম্যাচে হতাশাজনক।’
লাল কার্ড দেখার পর মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়েন এম্বোলো, আর সেই দৃশ্য যেন সুইসদের ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকে। পরিসংখ্যানেও ছিল আর্জেন্টিনার আধিপত্য। তাদের প্রত্যাশিত গোল ছিল ২.০, যেখানে সুইজারল্যান্ডের ছিল মাত্র ০.৫৩। তবে স্কোরলাইন যতটা সহজ দেখায়, ম্যাচটি মোটেও ততটা সহজ ছিল না। ১০ জনের সুইজারল্যান্ড শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছে, আর সেই কারণেই এই জয় আর্জেন্টিনার জন্য শুধু একটি ফল নয়, ধৈর্য, মানসিক শক্তি ও চ্যাম্পিয়নসুলভ চরিত্রেরও পরীক্ষা।
এই জয়ে গত চারটি বিশ্বকাপের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো সেমিফাইনালে উঠল আর্জেন্টিনা। টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন এখনো অটুট। তবে সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় পরীক্ষা। আটলান্টায় সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে লিওনেল স্কালোনির দল। একদিকে মেসিদের অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে ইংল্যান্ডের গতি, শক্তি ও তারুণ্য। ফাইনালের টিকেটের লড়াইয়ে এই মহারণই এখন গোটা ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত দ্বৈরথ। কানসাস সিটির রাত আর্জেন্টিনাকে শিখিয়েছে, সবচেয়ে কঠিন পথ পেরিয়েই সবচেয়ে উজ্জ্বল আলোয় পৌঁছাতে হয়। এখন দেখার অপেক্ষা, সেই আলো শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের ট্রফি ছুঁতে পারে কি না।
সময়ের আলো/এসএকে