বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার মুখোমুখি লড়াই কখনোই কেবল ৯০ মিনিটের ফুটবলে সীমাবদ্ধ থাকে না। এই দুই দলের প্রতিটি ম্যাচের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ইতিহাস, জাতীয় আবেগ, বিতর্ক এবং ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের দীর্ঘ ছায়া। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে দুই দল আবারও মুখোমুখি হওয়ায় পুরোনো সেই বৈরিতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে শেষ চার নিশ্চিত করেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে নরওয়েকে বিদায় করে সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ইংল্যান্ড। যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই ম্যাচটি তাই শুধু ফাইনালে ওঠার লড়াই নয়, বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাগুলোর আরেকটি অধ্যায়।
এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে রয়েছে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ। দক্ষিণ আটলান্টিকের ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ—যাকে আর্জেন্টিনা ‘লাস মালভিনাস’ নামে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে—তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ৭৪ দিনব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘাত হয়েছিল। যুদ্ধে ৯০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারান। শেষ পর্যন্ত ব্রিটেন জয়ী হলেও সেই পরাজয়ের স্মৃতি আজও আর্জেন্টিনার জাতীয় চেতনায় গভীরভাবে গেঁথে আছে।
অবশ্য দুই দেশের ফুটবল বৈরিতার শুরু তারও আগে। ১৯৬৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে ১-০ গোলে হারের ম্যাচটিকে আর্জেন্টিনায় এখনো ‘শতাব্দীর চুরি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সেই ম্যাচে অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনের বিতর্কিত লাল কার্ড বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। অনেকের মতে, ওই ঘটনার পরই আন্তর্জাতিক ফুটবলে হলুদ ও লাল কার্ড চালুর প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তবে এই দ্বৈরথকে কিংবদন্তির মর্যাদা দেয় ১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। ফকল্যান্ড যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে ডিয়েগো ম্যারাডোনা প্রথমে করেন বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল। এরপর মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে মাঝমাঠ থেকে একক নৈপুণ্যে পাঁচজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে করেন ইতিহাসখ্যাত ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’। ২-১ ব্যবধানে জয় নিয়ে সেমিফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা।
ম্যাচ শেষে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, গোলটি এসেছে ‘কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা দিয়ে, আর কিছুটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে।’ পরে আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছিলেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই জয়কে তিনি ফকল্যান্ড যুদ্ধে নিহত আর্জেন্টাইনদের প্রতি প্রতীকী শ্রদ্ধা হিসেবে দেখেছিলেন।
ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রভাব এখনো আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্কৃতিতে স্পষ্ট। দেশটির জনপ্রিয় সমর্থকগান ‘মুচাচোস’-এ মালভিনাস যুদ্ধের বীরদের স্মরণ করা হয়। চলতি বিশ্বকাপেও ইংল্যান্ডকে লক্ষ্য করে স্লোগান দিতে দেখা গেছে আর্জেন্টাইন সমর্থক ও খেলোয়াড়দের। সুইজারল্যান্ডকে হারানোর পর গ্যালারিতে উদযাপনের সময় তাদের কণ্ঠে শোনা যায় পরিচিত সেই স্লোগান—‘কো এল কে নো সালতা, এস উন ইংলেস’ (যে লাফাবে না, সে-ই ইংরেজ)।
দীর্ঘ ২৪ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে আবার মুখোমুখি হচ্ছে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। ফলে সেমিফাইনালের লড়াই শুরুর আগেই উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে মাঠের বাইরে। ইতিহাস, জাতীয় আবেগ, ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি এবং ম্যারাডোনার অমর উত্তরাধিকার—সব মিলিয়ে আটলান্টার এই সেমিফাইনাল বিশ্বকাপের আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে ওঠার অপেক্ষায়।
সময়ের আলো/এসএকে