এক পড়ন্ত বিকাল। বাংলাদেশি খাবারের খোঁজে কয়েকজন সাংবাদিক হাঁটছেন চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের ডংচেং ডিস্ট্রিক্টের বিভিন্ন গলিতে। এক পর্যায়ে বেইলুওগুছিয়াং সরু গলিতে দেখা মিলল একটি বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টের। এর ভেতরে প্রবেশ করতেই বাংলাদেশি মানুষ, বাঙালিয়ানা অবয়ব ও তৈজসপত্র দেখে সবার ক্ষুধা যেন আরও বেড়ে গেল। সাদাভাত হরেক রকমের ভর্তা মাছ সবজির তৃপ্তি নিয়ে মধ্যাহ্নভোজ ও নৈশভোজ শেষে সাংবাদিকরা ফিরলেন হোটেলে।
সান্তুর বাংলাদেশি-ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট বেইজিং শহরের জনপ্রিয় এবং ব্যস্ত পর্যটন এলাকা ডংচেং জেলার জিয়া নং ৭০ এলাকার গলিতে অবস্থিত। এ রেস্টুরেন্ট বেইজিংয়ে যেন এক পশলা শান্তি বয়ে আনে বাঙালি প্রবাসী পর্যটকদের মনে। ১২০ স্কয়ার মিটার আয়তনের সান্তুর রেস্টুরেন্টটি দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত এবং এর নিচ তলায় একটি কফিশপ রয়েছে। রেস্টুরেন্টটির খোলা করিডোর ভিন্ন আবহ তৈরি করেছে। ব্যস্ত বেইজিং শহরের মাঝে কিছুটা নিরিবিলি ও ছিমছাম পরিবেশে ডিনার ডেট বা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার জন্য সান্তুর রেস্টুরেন্টটি বেশ চমৎকার। বিশেষ করে বাংলাদেশি ও ভারতীয় প্রবাসী ও পর্যটকদের কাছে।
রেস্টুরেন্ট থেকে কয়েক কদম এগিয়ে গেলেই দেখা মিলবে হৌহাই হ্রদ। সন্ধ্যা রাতে এটি যে কাউকে বিমোহিত করে তোলে। মূলত এই এলাকা রাতের নাইটলাইফ এবং বারের জন্য বিখ্যাত। পাশেই রয়েছে বেইজিংয়ের সবচেয়ে বড় এবং বিখ্যাত তিব্বতি বৌদ্ধ মন্দির।
চীন সরকারপ্রধানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সংবাদ সংগ্রহ করতে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক সম্প্রতি চীন সফর করেন। চীনে বাংলাদেশের খাবার খেতে গিয়ে সান্তুর রেস্টুরেন্টটি খুঁজে বের করেন তারা। চারদিনের সফরে বেশিরভাগ সাংবাদিকই এই রেস্টুরেন্টে দুপুর ও রাতের খাবার খেয়েছেন। ছোট এবং আরামদায়ক এই রেস্তোরাঁয় বাংলাদেশি ও ভারতীয় খাবার পরিবেশন করা হয়। এখানে খাবারের মধ্যে মূলত বিভিন্ন ধরনের ইন্ডিয়ান ও বাংলাদেশি কারি, বারবিকিউ, স্ন্যাক্স এবং বাটার চিকেন, ডাল মাখানি ও হরেক স্বাদের লাচ্ছি পাওয়া যায়। সন্ধ্যার নাশতায় রয়েছে বিখ্যাত শিঙারা, বেলপুরি ও ফুচকা। টকঝালের মিশেলের খাবার সুদূর চীনে বসে খেলেও বাঙালি ভোজনরসিকের মনে ঢাকার স্ট্রিট ফুডের আমেজ এনে দেবে।
দেড় যুগ ধরে চায়নায় ব্যবসা করেন ফেনীর সাখাওয়াত হোসেন কাকন। ব্যবসার কাজে বেইজিং শহরে এলেই সান্তুর রেস্টুরেন্টে ডিনার করেন তিনি। রেস্টুরেন্টের খোলা অংশে বসে সময়ের আলোকে তিনি বলেন, আমাদের মতো বাঙালির জীবনে ‘এক টুকরো শান্তি’ লুকিয়ে আছে এমন জায়গায়। যেখানে বসলে শেকড়ের টান অনুভব হয়। মনে হয় দেশের কোনো রেস্টুরেন্টে বসে আড্ডা দিচ্ছি। চায়নিজ খাবার কতই বা খেতে ভালো লাগে বলেন? সময় সুযোগ পেলেই সাগর ভাইয়ের (রেস্টুরেন্টের মালিক) এখানে চলে আসি। মন খুলে আড্ডা দিই; খেয়েদেয়ে চলে যাই। খাবারের মানও অত্যন্ত চমৎকার। রান্না খুবই সুস্বাদু হয়। বিশেষ করে বাঙালি রাঁধুনি থাকায় আমাদের খাবারের স্বাদের চাহিদা শতভাগ পূরণ হয় এখানে।
সাত বছর ধরে চীনে আমদানি-রফতানির ব্যবসা করছেন বগুড়ার যুবক এস এম আল আমিন। থাকেন শিজিং প্রদেশে। সময় পেলেই চলে আসেন বেইজিংয়ের সান্তুর রেস্টুরেন্টে।
সময়ের আলোকে তিনি বলেন, প্রথমত এটি জনপ্রিয় হালাল রেস্তোরাঁ। বেইজিংয়ের কেন্দ্রস্থলে হওয়ায় এটি স্থানীয় বাসিন্দা এবং ভ্রমণকারীদের কাছে চমৎকার ও খাঁটি দক্ষিণ এশীয় খাবারের জন্য অত্যন্ত প্রশংসিত। আমি নিয়মিত খেতে আসি। বিশেষ করে এখানকার শুকনো মরিচের আলুভর্তা, বিরিয়ানি, ডাল কারি ও সালাত মাখা আমার ভীষণ পছন্দের। দামও নাগালের মধ্যে থাকে। চাহিদামতো তাৎক্ষণিকভাবে বাঙালিয়ানার সব খাবার পাওয়া যায়।
২০২৩ সালে স্টুডেন্ট ভিসায় যশোর থেকে চীনে আসেন সাকিব আহমেদ শাহীল। তিনি জিয়াংসু প্রদেশের ইয়াংজু ইউনিভার্সিটিতে ব্যাচেলর ডিগ্রি করছেন। বেইজিংয়ে এই রেস্টুরেন্টে বসে কথা হয় তার সঙ্গে।
তিনি সময়ের আলোকে বলেন, বাংলাদেশে থেকে পরিচিত কেউ চীনে ভ্রমণ করতে এলে প্রথমেই সান্তুর রেস্টুরেন্টে নিয়ে আসি। এখানে খেতে বসলে মনে হয় যশোর শহরের কোনো রেস্টুরেন্টে বসে আছি। এখানকার আপাদমস্তক সবকিছু বাঙালিয়ানাময়। স্টিলের টি-মগ, বাটি, প্লেট সবকিছুই বাংলাদেশের।
পরিবার নিয়ে ভারতের কেরালা প্রদেশে থেকে বেইজিংয়ে ঘুরতে আসেন উষা নারায়ণ। সান্তুরে এক বিকালে খেতে আসেন। এসে দেখেন রেস্টুরেন্টের কোনো টেবিল ফাঁকা নেই। সব আসনে কাস্টমার বসে আসেন। কেউ খাচ্ছেন, কেউ বা আড্ডা দিচ্ছেন। কতক্ষণ অপেক্ষা করে একটি টেবিলে সবাইকে নিয়ে বসে বিভিন্ন ধরনের খাবার খান।
খেতে খেতে নারায়ণ সময়ের আলোকে জানান, তারা মাঝেমধ্যে চীনে বেড়াতে আসেন। সান্তুর রেস্টুরেন্টই তাদের ভরসাস্থল। এখানে তৃপ্তিসহকারে খেতে পারেন। খাওয়াশেষে বেশকিছু সময় তারা গল্পগুজব আর ছবি তুলে রেস্টুরেন্ট ত্যাগ করেন।
সান্তুর রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়সের গোলজার হোসেন সাগর। সবসময় এই রেস্টুরেন্টেই তিনি সময় কাটান। তার বাড়ি গাজীপুরের কালীগঞ্জে।
রেস্টুরেন্টে খেতে খেতে সময়ের আলোকে গোলজার হোসেন বলেন, আমার আগে হোটেল চালানোর অভিজ্ঞতা ছিল। সেই হিসেবে আমি এই প্রফেশনটাই বেছে নিলাম আরকি। চায়নিজ এক পার্টনারকে সঙ্গে নিয়ে ২০১২ সালে আমি রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করি। তবে মূল দায়িত্বটা আমিই পালন করি। এই ব্যবসার মধ্যে আমার কোনো লস নেই। এই গত চৌদ্দ বছর হলো আমি আলহামদুলিল্লাহ খুব ভালোভাবে এই ব্যবসা করছি।
ব্যবসার শুরুটা কীভাবে করলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি চীনে এসেছি ২০০৩ সালের শেষদিনে। আমি এসেছিলাম একটা জব নিয়ে। একটা ইউএস কোম্পানিতে ছিলাম। তো আনফরচুনেটলি ২০১২ সালে ওরা কোম্পানিটা শাটডাউন করে দেয়। পরে এক পাকিস্তানি বসের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। ওনি জানান তার রেস্টুরেন্ট আছে। তার রেস্টুরেন্টে কাজ করার অফার দিলেন। তার সঙ্গে রেস্টুরেন্টে কাজ করে দেখলাম মোটামুটি এই বিজনেস খুবই ভালো। ওখান থেকেই শুরু।
এরপর বেইজিংয়ে ২০১৪ সালে আনফরচুনেটলি বাইসাইকেল অ্যাক্সিডেন্ট করে আমার পা ভেঙে যায়। এক্সিডেন্টের সময় পরিচয় হয় আমার ফ্রেন্ড বেলালের সঙ্গে। যিনি বর্তমানে আমার সঙ্গে কাজ করছেন এই রেস্টুরেন্টে। ওনার বাড়ি কুমিল্লায়। তার মাধ্যমে এক চায়নিজ ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় হলো। তখন থেকেই আমরা এই রেস্টুরেন্টটা করি ওনার সঙ্গে পার্টনারশিপে। রেস্টুরেন্টটা প্রথমে ছিল পাশের ব্যস্ত গলি নান্নু গোসাং এলাকায়।
সান্তুর স্বত্বাধিকারী জানান, বর্তমানে রেস্টুরেন্টের ভাড়া প্রতি বছরে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। বর্তমানে তার দুটো রেস্টুরেন্ট।
তিনি বলেন, দুই বছর আগে আমি আরেকটা রেস্টুরেন্ট দিয়েছি। এটা হচ্ছে দাসিনে। ওটাও পার্টনারশিপে করেছি। ওটায় মোট ১২ থেকে ১৪ জনের মতো কাজ করছেন। ওখানে আমি প্রতি সপ্তাহে দুবার যাই। দুইবার বসি।
গোলজার বলেন, আমাদের এখানে বাঙালি ছাড়াও কাস্টমারদের মধ্যে নিয়মিত চায়নিজ আছে। বিদেশিরাও আছে। বাংলাদেশিদের জন্য থাকে কালা ভুনা, মেজবানি, ফিশ কারি, ডাল, সবজি, আলুর ভর্তা, বেগুন ভর্তা। বিভিন্ন মাছের ভর্তা, চিংড়ি ভর্তা, ডালের ভর্তা ইত্যাদি নিয়মিত পরিবেশন করা হয়। আমরা অনলাইনে অর্ডার নিয়ে পার্সেল করে থাকি। বাংলাদেশি কমিউনিটি, দূতাবাসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে আমার রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার পরিবেশন করা হয়।
তিনি বলেন, আমার অভিজ্ঞ দুজন শেফ (বাবুর্চি) আছে। তাদের কল্যাণে আমার দুই রেস্টুরেন্টে আল্লাহর রহমতে এক পয়সাও এখন পর্যন্ত লস দিইনি।
সময়ের আলো/এসএকে