বিশ্বকাপ, এশিয়া কাপ কিংবা বিপিএলের মতো বড় বড় ক্রীড়া আসর এলেই বাংলাদেশে এক উৎসবমুখর আমেজ তৈরি হয়। পরিবার, বন্ধু কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে দল বেঁধে খেলা দেখা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রিয় দল নিয়ে আলোচনা-তর্ক যেন আমাদের এক চিরচেনা নিয়মিত দৃশ্য। তবে খেলার এই আনন্দই অনেক সময় বিষাদে রূপ নেয়, যখন নিজের ভালোবাসার দলটি হেরে যায়। প্রিয় দলের এই পরাজয় অনেকের মনেই তীব্র হতাশা, ক্ষোভ, রাগ বা মানসিক অস্বস্তির জন্ম দেয়।
অনেকেই এই আবেগের বশে প্রতিপক্ষের সমর্থকদের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত তর্কে জড়িয়ে পড়েন, আবার কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল বা বিদ্রূপের শিকার হয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হন। এমনকি বড় টুর্নামেন্টগুলোতে খেলাকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও আমাদের সামনে এসেছে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, প্রিয় দলের হারের পর মন খারাপ বা হতাশা অনুভব করা একেবারেই অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই সাময়িক অনুভূতিকে বলা হয় ‘স্পোর্টস ফ্যান ডিপ্রেশন’ বা ‘স্পোর্টস ফ্যান ব্লুজ’। সাধারণত এই মন খারাপ কয়েক ঘণ্টা থেকে বড়জোর কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে। তবে এই হতাশা, বিরক্তি বা বিষণ্নতা যদি একটানা দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয় এবং আপনার স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তবে দেরি না করে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
খেলার এই মানসিক ধাক্কা বা হতাশা সামলে উঠতে বিশেষজ্ঞরা চমৎকার কিছু কার্যকরী উপায়ের কথা বলেছেন:
১. আবেগ প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করুন
প্রিয় দলের পরাজয়ের পর কষ্ট, ক্ষোভ বা হতাশা হওয়াটাই স্বাভাবিক-বিশেষ করে ম্যাচটি যদি কোনো টুর্নামেন্টের ফাইনাল বা সেমিফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ হয়। তাই নিজের এই আবেগকে জোর করে চেপে বা অস্বীকার না করে মনকে কিছুটা সময় দিন। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর ৪৫ থেকে ৬০ মিনিট পর্যন্ত নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন। সম্ভব হলে নিজের দলের অন্য সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলুন, দুঃখ বা ক্ষোভের অভিজ্ঞতাগুলো একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিন। এতে মনের ওপর চেপে বসা পরাজয়ের প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলানো অনেক সহজ হয়ে যায়।
তবে এই নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পর নিজেকে ধীরে ধীরে অন্য সাধারণ বিষয়ে ব্যস্ত করে তুলুন। একই বিষয় নিয়ে বারবার ভাবলে হতাশা কেবল বাড়বেই। এছাড়া ম্যাচ শেষ হওয়ার পর কিছু সময়ের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ হবে; কারণ সেখানকার ট্রল, বিদ্রূপ বা নেতিবাচক আলোচনা আপনার মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
২. শরীরকে সক্রিয় রাখুন
মানসিক চাপ দ্রুত কমাতে শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা দারুণ কার্যকরী। শরীরচর্চা বা খেলাধুলা করলে আমাদের শরীরে ডোপামিনের মতো ‘ফিল গুড’ বা ভালো লাগার হরমোনের নিঃসরণ বাড়ে। ২০১৮ সালের একটি গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, মাত্র ১০ থেকে ৩০ মিনিটের হালকা ব্যায়ামও মানুষের মন ভালো করতে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। তাই প্রিয় দলের হারের পর মন খারাপ করে বসে না থেকে নিজে মাঠে ফুটবল বা ক্রিকেট খেলতে নেমে যেতে পারেন। এছাড়া সাইকেল চালানো, দৌড়ানো, সাঁতার কাটা কিংবা ট্রেকিংয়ের মতো আউটডোর কার্যক্রমে অংশ নিয়েও মনকে চাঙ্গা করতে পারেন।
৩. নিজেকে অন্য কাজে ব্যস্ত রাখুন
প্রিয় দলের পরাজয়ের পর মানুষের শরীরে ‘কর্টিসল’ নামক স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়, যা মানসিক অস্থিরতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। এই পরিস্থিতি সামলাতে নিজেকে ব্যস্ত রাখা জরুরি। মনের চাকা অন্য দিকে ঘোরাতে আপনি—
কিছুটা সময় একা একা বা প্রিয় মানুষের সাথে হাঁটাহাঁটি করতে পারেন।
পছন্দের গান, রিল্যাক্সিং মিউজিক বা কোনো পডকাস্ট শুনতে পারেন।
ভালো কোনো নাটক, সিনেমা দেখতে পারেন কিংবা পছন্দের বই পড়তে পারেন।
নিজের মনের অনুভূতিগুলো ডায়েরিতে লিখে রাখতে পারেন।
পাজল (ধাঁধা) সমাধান, ছবি আঁকা কিংবা গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো রিল্যাক্সেশন ব্যায়াম করতে পারেন।
এই অভ্যাসগুলো শুধু খেলার হতাশাই কমাবে না, বরং আপনার দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য মানসিক চাপ কমাতেও দারুণ সহায়ক হবে।
৪. নিজের অন্যান্য শখের কাজে সময় দিন
খেলা উপভোগ করা নিঃসন্দেহে দারুণ আনন্দের, তবে খেলাধুলাই যেন জীবনের একমাত্র বিনোদন বা আনন্দের উৎস হয়ে না ওঠে। প্রিয় দলের হার যদি আপনার মনের ওপর খুব বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তবে বুঝতে হবে আপনার জীবনের অন্যান্য শখ বা আগ্রহের দিকে মনোযোগ দেওয়ার সময় এসেছে। খেলা দেখার পাশাপাশি নিজের অন্যান্য শখের কাজ যেমন-রান্না করা, বাগান করা, ছবি আঁকা, নতুন কোনো সৃজনশীল দক্ষতা শেখা কিংবা পছন্দের গান গাওয়ার পেছনে সময় দিন। এগুলো মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয় এবং পরাজয়ের গ্লানি ভুলে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।
যেকোনো বড় টুর্নামেন্ট বা বিশ্বকাপ এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে একের পর এক দল বিদায় নেবে-আর এটাই যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক খেলাধুলার চিরন্তন ও স্বাভাবিক বাস্তবতা। তাই প্রিয় দলের পরাজয়কে জীবনের আর দশটা সাধারণ বিষয়ের মতোই মেনে নেওয়ার চেষ্টা করুন। জয় এবং পরাজয়-দুটিই খেলাধুলার অবিচ্ছেদ্য অংশ; এই ধ্রুব সত্যটি মনে রেখে নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখাই আপনার মানসিক সুস্থতা ও সুন্দর জীবনের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সময়ের আলো/আরবিএন