মধ্যরাত। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। এই বৃষ্টি যেন নিশ্চিন্দিপুরের পথঘাট ছুঁয়ে এসে এক অব্যক্ত বেদনায় বিবশ করে দেয় ভেতর বাহির। এইসব আষাঢ়ে দিন কার কথা মনে করায়? কার চেনা গন্ধ বহুদিন পর মনের দেউরিতে এসে কড়া নাড়ে?
যে প্রেমিক রাতের শেষ ট্রেনে উঠে চলে গেল, ফেরার প্রতিশ্রুতি দিয়েও ফিরল না কোনোদিন, যার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে আপনি শতাব্দী প্রাচীন বৃক্ষ হয়ে গেলেন, স্টেশন হয়ে গেল পরিত্যক্ত, তার কথা মনে পড়ে নিশ্চয়ই!
যে বন্ধু হঠাৎ একদিন বাবার বদলি চাকরির চক্করে পড়ে চলে গেল অন্য শহরে, যার সঙ্গে আপনার নিত্য চলার পথ আলাদা হলো, বেঞ্চির খালি জায়গাটা ভরাট হলেও বুকের বাঁ পাশটা খালি থেকে গেল, যার কথা ভেবে টিফিন গলায় আটকে আসত ঝরতে না দেওয়া গোপন কান্নায়, এমন বৃষ্টির দিনে সে আসে জীবনের পিচ্ছিল আলপথ ধরে।
উঠানের একপাশে খেজুর গাছ। তার নিচে মায়ের কবর। যেদিন মা মারা গেল, সেদিন হয়ত বৃষ্টি হয়েছিল খুব। আপনি জানালার পাশে বসে পুরোটা রাত দেখেছিলেন, কীভাবে বৃষ্টির জল ভিজিয়ে দিচ্ছে আপনার মাকে। জলে জবুথবু খেজুর গাছটা দেখে সেদিন আপনার মনে হয়েছিল, সেও কাঁদছে একই ব্যথায়, তারও আছে নিঃসীম প্রাণ। অনেক অনেকদিন পর এমন কোনো এক আষাঢ়ে বৃষ্টির দিনে আপনি আবার খুঁজে পাবেন, মায়ের কবরের সেই বৃষ্টিভেজা সোঁদা গন্ধ। চোখের তারায় ভেসে উঠবে, বিজলীর চমকে কী অলীক হয়ে উঠেছিল মায়ের অনন্ত যাত্রার ঘর।
কোনো এক বর্ষার মৌসুম। আপনি তখন হয়ত ফ্রক পরা বালিকা কিংবা শার্টের বোতাম লাগাতে হিমশিম খাওয়া উড়নচণ্ডী বালক। বাবার কাছে বায়না ধরেছিলেন ইলিশ মাছ খাওয়ার। কয়েক কিলোমিটার পথ পেরিয়ে গঞ্জের হাট থেকে বাবা যখন বাড়ি ফিরেছিল, তখন সে বৃষ্টি ভেজা নদী, হাতে ইলিশ মাছের আস্ত এক খুশির মৌসুম। সেই দৃশ্য আপনার চোখে আঁকা থেকে গেছে। এমন বৃষ্টিভেজা রাত আপনাকে বহুকাল আগে ফেলে আসা সেই দৃশ্য মনে করিয়ে দেবে। এও মনে করাবে, ওইদিন আপনার বাবার পকেট ছিল শূন্য গড়ের মাঠ, যা আপনি বড় হয়ে জেনেছিলেন!
যে বোনটার সঙ্গে বৃষ্টি নামলে লুডু খেলতেন, বেতের সেরে কাঁঠাল বিচি কিংবা বাদাম ভাজা নিয়ে বসে রাজ্যের গল্প জুড়ে দিতেন, যার পুতুলের ঘর ভেঙে দিয়ে নিজেকে বাহাদুর ভাবতেন, একদিন সেই বোন লাল টুকটুকে শাড়ি পরে চলে গেল হাজার নদী ওপারের এক অন্য ভুবনে। আপনার বৃষ্টি দিনের হারিয়ে যাওয়া সেই সঙ্গীকে মনে পড়বে কোনোদিন ফিকে হতে না পারা স্মৃতির আলপিনের আঘাতে। হয়ত সেলফোনে তখন বাজবে 'তোমরা ভুলেই গেছ মল্লিকাদির নাম, সে এখন ঘোমটা পরা কাজল বধূ দূরের কোনো গাঁয়.....'
আপনার হয়ত একটা সুন্দর সার্কেল ছিল। যাদের সঙ্গে শেষ বিকেলে চোখ বন্ধ করে শুয়ে সমুদ্রের গর্জন শোনার স্মৃতি আছে, পাহাড়ের আদিম পথে হাঁটা কিংবা কাপ্তাই হ্রদে নৌকায় ভাসতে ভাসতে সূর্যাস্ত দেখার মায়াময় মুহূর্ত আছে। হঠাৎ একদিন কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই বেসামাল ঝড়ে গোল টেবিলের সেই মুখর আড্ডার মানুষেরা ভেসে গেল জীবনের চোরাস্রোতে। এমন বিষাদের তানপুরার সই বৃষ্টির দিনে মানুষগুলোর কথা খুব মনে পড়বে আপনার। আপনার হৃদয় নতুন করে জানবে, এত সহজে সম্পর্ক ভাঙে, যতটা সহজে কাচও ভাঙে না!
আষাঢ়ের গন্ধ কখনও কখনও এমন কাউকেও মনে করিয়ে দেয়, যাকে হয়ত আমাদের ভুলে যাওয়ার কথা ছিল। কোনো এক বছরের প্রথম বৃষ্টির দিন। ভুল নাম্বারে আসা একটা ফোনকল। তারপর অহেতুক কয়েক মিনিটের কথোপকথন। কী অসীম মায়া সেই কথামালার, যা অনেক বছর বাদেও হিমঝুরির সুবাস বয়ে আনে। সেই মানুষটা আজীবন থেকে যায় বছরের প্রথম বৃষ্টির স্মৃতি হয়ে। অথচ নিয়তির পেন্সিলে তার গল্পটা দৈর্ঘ্যে বাড়তে পারেনি এতটুকুও। সে যেন শৈশবেই জীবন থেমে যাওয়া কোনো শিশু, যার স্মৃতির বয়স বাড়ে না, কিন্তু অতীত রোমন্থনের হিমাগারে জায়গা করে নেয় ঠিক।
বালিশে নিঃশব্দ শুয়ে জানালার ওপারে চোখ রেখে হঠাৎ মনে পড়ে যেতে পারে কোনো এক রিকশাওয়ালা কথাও। হয়ত এক বৃষ্টির দিনে সে আপনাকে পৌঁছে দিয়েছিল গন্তব্যে, কিন্তু তাকে কিছু টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়নি পকেটে অক্সিজেন বাড়ন্ত থাকায়। তার চেহারা ঠিক মনে নেই, তার সঙ্গে জীবন আপনাকে হয়ত আর কোনোদিন দেখাও করায়নি, তবু সে হঠাৎ আষাঢ়ের পথ ধরে চলে আসতে পারে স্মৃতির উঠানে।
বারান্দায় ভিজে যাচ্ছে কুঞ্জলতা। বৃষ্টি থামার নাম নেই। চাইছিও না থামুক। এক প্রগাঢ় অভাববোধে বুকের ভেতরটা ব্রহ্মপুত্রের মতো ভারী লাগছে। বৃষ্টি হলে হাত ধরে ভেজা যাবে, মুঠো ভর্তি কদম ফুল তুলে দেওয়া যাবে, এমন একটা নিজের মানুষ পাওয়া হলো না জীবনে। অনেকেরই পাওয়া হয় না। সেই নিজের না হওয়া, কোনোদিন না দেখা মানুষটাকেও মনে করিয়ে দিতে পারে আষাঢ়ের অলৌকিক গন্ধ। কী অদ্ভুত!
সময়ের আলো/মহু