প্রকৃতিতে আষাঢ় কিংবা শ্রাবণ। আকাশভাঙা বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে বাড়ির উঠান, ফসলের মাঠ, সবুজ বৃক্ষ। টিনের চালে বৃষ্টির মোহাচ্ছন্ন শব্দ শুনতে শুনতে আপনি বাদাম ভাজা, খুদে মুড়ি, সিমের বিচি কিংবা কাঁঠালের দানা ভাজা খাচ্ছেন। অন্যদিকে, আপনার মায়ের উনুনঘর থেকে বৃষ্টির শব্দজল ভেদ করে ভেসে আসছে তালের বড়া ও আন্দাসা পিঠার ঘ্রাণ। একটু পরেই উঠানের কাদামাটি পেরিয়ে আঁচল দিয়ে ঢেকে মা আপনার জন্য নিয়ে আসবে সেই সুস্বাদু পিঠা। মনে করতে পারেন, শেষ কবে আপনার জীবনে এমন মুহূর্ত এসেছে?
বৃষ্টি চিরকালই স্মৃতিকাতর আবেদন জাগানোর ক্ষমতা রাখে। সত্যজিৎ রায় আমাদের দেখিয়েছিলেন প্রকৃতিতে কেমন করে বর্ষা আসে, রবীন্দ্রনাথ লিখে গেছেন শত শত বর্ষাবন্দনা। কিন্তু সেই বর্ষা মৌসুম, বৃষ্টির দিন আজও কী আমাদের জীবনে একইভাবে আসে?
নস্টালজিয়ার ডায়েরি খুলে বসলে সেখানে অজস্র বৃষ্টিভেজা দিনের স্মৃতি ভেসে ওঠে। সেইসব দিনের সঙ্গে মিশে আছে মায়ের ভালোবাসা, উনুনঘর থেকে ভেসে আসা মায়ের যাদুকরী রান্নার ঘ্রাণ, মাটির সোঁদা গন্ধ, ঘর হারানো বৃষ্টিভেজা যবুথবু পাখি, শৈশবের বন্ধুরা, আরও কত কী।
আমি বেড়ে উঠেছি একদম নিখাঁদ গ্রামে, নিখুঁত শতাব্দীতে। সেই নব্বইয়ের দশকের কথা বলছি। আমার গৃহস্থ জীবনে ব্যস্ত মা বৃষ্টি এলে ভালোবেসে কিছু না কিছু রান্না করতেনই। জগতের প্রতিটা মায়েরই বোধয় প্রথম পছন্দ, সন্তানের জন্য নিজ হাতে কিছু রান্না করা ও সন্তানকে তা তৃপ্তি নিয়ে খেতে দেখা। আমার মাও সেই বৃত্তেরই একজন ছিলেন। তাই আকাশে মেঘের ঘনঘটা দেখলে অহেতুক পেটের ভেতর মেঘের মতো গুড়গুড় করে উঠত। কখনও মা নিজে থেকেই রান্নার পরিকল্পনা করতেন, কখনওবা আমরা মুখ ফুটে আবদার করতাম। মাথায় বৃষ্টি নিয়ে কোমড় বেঁধে মা লেগে যেতেন কাজে।
কাঁঠালের মৌসুমে দানাগুলোকে যত্নে রোদে শুকাতেন তিনি। সেগুলো দিয়ে রাঁধতেন মজাদার তরকারি আর বৃষ্টির দিনে খাওয়ার জন্য মচমচে করে ভাজতেন। চরাঞ্চল থেকে তুলে আনা বাদামের স্তূপ সাজিয়ে রাখা হতো নানুবাড়িতে। সেই বাদামের কতখানি ‘মাম বাড়ির আবদারের’ ভাগ হয়ে আমাদের বাড়িতে আসত প্রতি বছর। বৃষ্টি নামলে আগুনের তাপে বালু গরম করে তার ভেতর বাদাম ভাজতেন মা। বাদাম ভাজা হলে বসে বসে তা ছিলতে হতো। কখনও ছিলেই খেয়ে ফেলতাম, কখনও আবার জমা করতাম। কারণ, বাদাম দিয়ে আমার মা এমন এক ভর্তা বানাতে জানত, যা আজীবন আমার ভীষণ পছন্দের একটি খাবার। আবার, ঘরের কোনো কোণা থেকে যাদুর বয়াম বের করে তার ভেতর থেকে সিমের বিচি নিয়ে উনুনে চড়াতেন মা। খুদে মুড়ি ভেজে বেতের সেরে করে খেতে দিতেন। কী যে অপার্থিব সেইসব খাবারের ঘ্রাণ। মাঝেমাঝে ভাবি, যদি ঘ্রাণগুলোকে জমিয়ে রাখার সুযোগ থাকত, তাহলে আমি শৈশব-কৈশোরের বৃষ্টিভেজা দিনের এমন মায়াময় ঘ্রাণ ভীষণ যত্নে সংরক্ষণ করতাম।
শুধু কী এসব, মায়ের উনুনঘরে পদের তালিকার যেন শেষ নেই। বর্ষায় তাল পাকলে তা দিয়ে বরা পিঠা, আন্দাসা, কলাপাতায় তালের চাপড়ি খুব কসরৎ করে বানাতেন মা। তাল পাকার অনেকদিন আগে থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়ে যায় বলে আটা, ময়দা, কলা, চিনি দিয়েও দফায় দফায় চলে বরা ও আন্দাসা বানানো। সেই পিঠাও ভীষণ মজা হয় খেতে। পৃথিবীর সব মায়েরাই হয়ত এমন যাদুকর।
বৃষ্টির দিনে আজও খিচুড়ি রান্না হয় গ্রামে, শহরে। তবুও, শেষ কবে গ্রামে ভাই-বোন মিলে বৃষ্টি দেখতে দেখতে খিচুড়ি খেয়েছেন, নিশ্চয়ই অনেকেই মনে করতে পারবেন না আর। জীবনের প্রয়োজনে সবাই খুঁজে নিয়েছে ভিন্ন ঠিকানা। বৃষ্টির দিন আসে, চলে যায়, মায়ের উঠানে একসঙ্গে হাজির হওয়া হয় না কারও। অনেকের আবার মাও চলে গেছে অন্য দুনিয়ায়। তাদের কাছে বৃষ্টির দিন, ভেজা মাটির গন্ধ, উনুনঘর থেকে ভেসে আসা মায়াময় ঘ্রাণ আজ সুদূর অতীত।
...তবুও জীবন চলছে জীবনের নিয়মে। বৃষ্টির স্যাঁতসেঁতে পিচ্ছিল পথ ধরে সময় বয়ে যায়। আমাদের হৃদয়ের অন্দরমহলে আলপনা হয়ে আঁকা থাকে ফেলে আসা বৃষ্টি দিনের হাজারও মায়াময় স্মৃতি।
সময়ের আলো/মহু