জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদেরই একজন একাদশ শতকের আন্দালুসীয় জ্যোতির্বিদ আল-জারকালি। তার পর্যবেক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক কাজ পরবর্তী ইউরোপীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
আল-জারকালির সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্পেনের ঐতিহাসিক শহর তোলেদোর নাম। মুসলিম শাসনামলে এই শহর ছিল জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেখানে একদল জ্যোতির্বিদ দীর্ঘ সময় ধরে সূর্য, চাঁদ ও গ্রহের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতেন। এই দলের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন আল-জারকালি।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, তিনি প্রায় ২৫ বছর সূর্য এবং ৩৭ বছর চাঁদ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। দীর্ঘদিনের গবেষণার ভিত্তিতে তিনি প্রচলিত কিছু জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
আল-জারকালির বিশেষত্ব শুধু পর্যবেক্ষণে সীমাবদ্ধ ছিল না। বৈজ্ঞানিক যন্ত্র নির্মাণেও তিনি ছিলেন দক্ষ। তিনি এমন একটি নক্ষত্রমণ্ডল নির্ণায়ক যন্ত্র তৈরি করেন, যা বিভিন্ন অক্ষাংশে ব্যবহার করা যেত। ‘আল-সাফিহা আল-জারকালিয়্যা’ নামে পরিচিত এই যন্ত্র পরবর্তী সময়ে ইউরোপে ‘সাফিয়া’ বা ‘আজাফিয়া’ নামে পরিচিত হয়।
তিনি গ্রহের অবস্থান ও গতিবিধি নির্ণয়ের জন্য ‘ইকুয়েটোরিয়াম’ নামের একটি যন্ত্রও তৈরি করেন। এর সাহায্যে গ্রহের অবস্থান নির্ণয়ের জটিল গাণিতিক হিসাব তুলনামূলকভাবে সহজ হয়ে যায়।
তার পর্যবেক্ষণ ও হিসাবের ভিত্তিতে তৈরি হয় ‘তোলেদো সারণি’। গ্রহের অবস্থান ও গতিবিধি সম্পর্কে পূর্বাভাস দিতে এই সারণি ব্যবহার করা হতো। পরে তার কাজ আরবি থেকে লাতিনসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়। অনুবাদের সঙ্গে বদলে যায় তার নামও। ইউরোপে আল-জারকালি পরিচিত হন ‘আরজাকেল’ নামে।
কয়েক শতক পর নিকোলাস কোপার্নিকাস তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য রেভল্যুশনস অব দ্য হেভেনলি স্ফিয়ার্স’-এ আল-জারকালির লাতিন নাম উল্লেখ করেন। কোপার্নিকাস সরাসরি আল-জারকালির কাছ থেকে সূর্যকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের ধারণা পাননি। তবে আল-জারকালির পর্যবেক্ষণ, পরিমাপ ও গাণিতিক পদ্ধতি ইউরোপীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরবর্তী বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছিল।
সময়ের সঙ্গে আল-জারকালির নাম অনেকটাই বিস্মৃত হয়েছে। কিন্তু তার বৈজ্ঞানিক কাজ হারিয়ে যায়নি। তার রচনার বিভিন্ন অনুবাদ ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের বিবরণ পরবর্তী প্রজন্মের জ্যোতির্বিদদের কাছে পৌঁছেছে।
আল-জারকালির গল্প মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞান কোনো এক জাতি, ধর্ম বা সভ্যতার একক সম্পত্তি নয়। জ্ঞান ভাষা, ধর্ম ও ভূগোলের সীমা অতিক্রম করে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। তোলেদোর আকাশে সূর্য ও নক্ষত্রের গতিপথ মাপা সেই মুসলিম জ্যোতির্বিদের অবদান তাই আজও ইউরোপের বিজ্ঞান ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।
সময়ের আলো/এমকে