চিজ ও ফল, পিনাট বাটার ও জেলি, বেকন ও ডিম— খাবারের এমন কিছু জনপ্রিয় জুটি রয়েছে, যেগুলো স্বাদে একে অন্যের পরিপূরক। তবে খাবারের এই জুটি শুধু স্বাদই বাড়ায় না, কিছু ক্ষেত্রে শরীরের জন্য পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারও বাড়াতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, নির্দিষ্ট কিছু পুষ্টি উপাদান ও খাবার একসঙ্গে খেলে শরীর সেগুলো আরও কার্যকরভাবে গ্রহণ করতে পারে।
এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ফাইটোকেমিক্যাল নামে উদ্ভিদে থাকা এক ধরনের প্রাকৃতিক রাসায়নিক যৌগ। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব যৌগ শরীরের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে এবং বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে খাবারে ফাইটোকেমিক্যাল থাকলেই শরীর তার পুরোটা ব্যবহার করতে পারে না। শরীর কতটা পুষ্টি শোষণ করতে পারছে, অর্থাৎ এর ‘বায়োঅ্যাভেইলেবিলিটি’ কতটা— সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
মিয়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকিউলার বায়োলজির সহযোগী অধ্যাপক জ্যঁ-মার্ক জিংয়ের মতে, অনেক ফাইটোকেমিক্যাল শরীরে দক্ষতার সঙ্গে শোষিত হয় না। ফলে খাবারের সঠিক সমন্বয় শরীরকে এসব পুষ্টি উপাদান ব্যবহারে সহায়তা করতে পারে।
সবজি ও স্বাস্থ্যকর চর্বি : রঙিন ফল ও সবজিতে প্রচুর পরিমাণে থাকে ক্যারোটিনয়েড, যা ফাইটোকেমিক্যালের একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণি। এর মধ্যে রয়েছে বিটা-ক্যারোটিন ও লাইকোপেন। গাজর ও বিভিন্ন শাকসবজিতে থাকা বিটা-ক্যারোটিন শরীরে ভিটামিন ‘এ’-তে রূপান্তরিত হয় এবং দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে টমেটো ও তরমুজে পাওয়া লাইকোপেন শরীরের জন্য বিভিন্নভাবে উপকারী এবং স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও প্রস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর সঙ্গে এর সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
বিটা-ক্যারোটিন ও লাইকোপেন উভয়ই চর্বিতে দ্রবণীয়। অর্থাৎ এগুলো শরীর ভালোভাবে শোষণ করতে হলে খাবারের সঙ্গে কিছুটা চর্বি থাকা উপকারী। স্ট্যানফোর্ড হেলথ কেয়ারের নিবন্ধিত ডায়েটিশিয়ান কেট ডোনেলানের ভাষায়, ক্যারোটিনয়েডকে যদি তালাবদ্ধ অবস্থায় থাকা কোনো উপাদান ধরা হয়, তা হলে চর্বি সেই তালার চাবির মতো কাজ করে। খাবারে থাকা ক্যারোটিনয়েডকে শরীরের জন্য সহজলভ্য করতে চর্বি সহায়তা করে।
তাই গাজর, টমেটো বা অন্যান্য সবজির সঙ্গে অ্যাভোকাডো, অলিভ অয়েল কিংবা নারকেল তেলের মতো স্বাস্থ্যকর চর্বি যোগ করা যেতে পারে।
শুধু চর্বিই নয়, সবজি রান্না করাও কিছু ক্ষেত্রে পুষ্টি শোষণের মাত্রা বাড়াতে পারে। ২০০৬ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, কাঁচা গাজরের তুলনায় নেড়েচেড়ে ভাজা গাজর থেকে বিটা-ক্যারোটিন শরীরে শোষণের মাত্রা অনেক বেশি হতে পারে।
২০২৪ সালের আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, রান্না করা টমেটোতে কাঁচা টমেটোর তুলনায় লাইকোপেনের পরিমাণ প্রায় তিন গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে। টমেটো সসের ক্ষেত্রে এর পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে, বিশেষ করে এতে অলিভ অয়েল ব্যবহার করা হলে।
ডোনেলান তাই খাবারে লাইকোপেন বাড়াতে টমেটোভিত্তিক সস ব্যবহারের পরামর্শ দেন। অলিভ অয়েলে সংরক্ষিত শুকনো টমেটোকেও তিনি ভালো বিকল্প হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
লেবুর রসের সঙ্গে সবজি : শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি খনিজ হলো আয়রন। এটি শক্তি উৎপাদন ও স্বাভাবিক রক্তকণিকা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শরীর নিজে আয়রন তৈরি করতে পারে না, তাই খাবারের মাধ্যমে এটি গ্রহণ করতে হয়।
খাবারে আয়রন মূলত দুই ধরনের— হিম আয়রন, যা প্রাণিজ খাবার থেকে পাওয়া যায় এবং নন-হিম আয়রন, যা উদ্ভিদজাত খাবারে থাকে। শরীর হিম আয়রন তুলনামূলক সহজে শোষণ করতে পারে। নন-হিম আয়রন শোষণ করতে শরীরকে অতিরিক্ত কিছু প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
এখানেই কাজে আসে ভিটামিন সি। গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন সি নন-হিম আয়রনকে এমন এক রূপে পরিবর্তন করতে সহায়তা করে, যা শরীর সহজে শোষণ করতে পারে। তাই আয়রনসমৃদ্ধ সবজির সঙ্গে ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার অভ্যাস করা যেতে পারে। যেমন— রান্না করা ব্রাসেলস স্প্রাউটের ওপর লেবুর রস দেওয়া, কিংবা পালংশাকের সালাদে স্ট্রবেরি, কমলা বা ক্যাপসিকাম যোগ করা।
উদ্ভিদজাত ও প্রাণিজ আয়রন একই খাবারে রাখাও আয়রন গ্রহণ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে সাদা শিমের সঙ্গে মাছের পদ খাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
হলুদ ও গোলমরিচের জুটি : ফাইটোকেমিক্যালের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণি হলো পলিফেনল। হলুদে থাকা কারকিউমিন এমনই একটি পলিফেনল, যা প্রদাহ কমানো, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করা এবং স্নায়ুতন্ত্রকে সুরক্ষা দেওয়ার সম্ভাবনার জন্য বিশেষভাবে আলোচিত।
তবে খাবারের মাধ্যমে কারকিউমিন গ্রহণের একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। শরীরে প্রবেশের পর এটি দ্রুত বিপাক হয়ে যায়। ফলে এর খুব বেশি অংশ রক্তে পৌঁছাতে পারে না। এখানে সহায়তা করতে পারে গোলমরিচ। গোলমরিচের সক্রিয় উপাদান পিপেরিন শরীরে কারকিউমিনের বিপাকের গতি কমাতে পারে। ফলে কারকিউমিনের শোষণের পরিমাণ বাড়তে পারে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কারকিউমিনের সঙ্গে পিপেরিন গ্রহণ করলে শরীরে কারকিউমিনের শোষণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
পুষ্টিবিদ ডোনেলানের মতে, খাবারে ভেষজ ও মসলা ব্যবহারের বিষয়টি অনেক সময় মানুষ ভুলে যায়। অথচ এসবের মাধ্যমেও শরীরে ফাইটোকেমিক্যাল যোগ করা সম্ভব। তাই হলুদ ও গোলমরিচ দিয়ে ভারতীয় ধাঁচের তরকারি, গোল্ডেন মিল্ক বা হলুদ চা তৈরি করা যেতে পারে।
খাবারের জুটিতে বাড়তি পুষ্টি : খাবার থেকে সর্বোচ্চ পুষ্টি পেতে শুধু কী খাচ্ছি, সেটিই নয়— কীসের সঙ্গে খাচ্ছি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সবজির সঙ্গে স্বাস্থ্যকর চর্বি, উদ্ভিদজাত আয়রনের সঙ্গে ভিটামিন সি এবং হলুদের সঙ্গে গোলমরিচ— এ ধরনের খাদ্যজুটি শরীরকে নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদান আরও কার্যকরভাবে গ্রহণে সহায়তা করতে পারে। অর্থাৎ স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়ার পাশাপাশি সেগুলোর সঠিক সমন্বয়ও দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসকে আরও পুষ্টিকর করে তুলতে পারে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা