এখন অনেকেই সন্তান জন্ম দেওয়ার চেয়ে একটি ‘ফার বেবি’কে ঘিরে জীবন সাজানোই বেশি স্বস্তিদায়ক মনে করেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান নেওয়ার পরিবর্তে পোষা প্রাণীকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করে তোলার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, সন্তান কিংবা পোষা প্রাণীর মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকলে ৪০ শতাংশ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান না নিয়ে পোষা প্রাণীকেই বেছে নিতে চান। বিপরীতে মাত্র ২১ শতাংশ সন্তান নেওয়াকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। অন্যদিকে ৩৯ শতাংশ জানিয়েছেন, সুযোগ পেলে তারা সন্তান ও পোষা প্রাণী- দুটিই চান।
দ্য হ্যারিস পোলের এই গবেষণায় অংশ নিয়েছেন ২ হাজার ৭০ জন মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক। জরিপের ফলাফল বলছে, পোষা প্রাণীকে ঘিরে মানুষের আবেগ ও পারিবারিক ধারণার পরিবর্তন এখন বেশ স্পষ্ট।
কেন পোষা প্রাণীর দিকে ঝুঁকছেন তরুণরা
জরিপে অংশ নেওয়া ৮৩ শতাংশ পোষা প্রাণীর মালিক বলেছেন, তারা নিজেদের পোষ্যকে সন্তানের মতোই মনে করেন। বিশেষ করে জেন-জি ও মিলেনিয়ালদের মধ্যে এই প্রবণতা লক্ষণীয়। এই দুই প্রজন্মের ৫৫ শতাংশ মনে করেন, সন্তান না নিয়েও একটি পোষা প্রাণীকে ঘিরে পরিপূর্ণ জীবন গড়ে তোলা সম্ভব।
সন্তানের পরিবর্তে পোষা প্রাণী বেছে নেওয়ার পেছনে আবেগের পাশাপাশি বাস্তব জীবনযাপনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জরিপে ৪৫ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তারা মনে করেন, সন্তান লালন-পালনের উপযুক্ত জীবনপর্যায়ে এখনো পৌঁছাননি। ৩৫ শতাংশের কাছে পোষা প্রাণীর যত্ন নেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ। ৩২ শতাংশ আর্থিক চাপ কম থাকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ২৮ শতাংশ মনে করেন, পোষা প্রাণী পালনে দায়িত্ব তুলনামূলক কম। এছাড়া, ২৪ শতাংশের ক্ষেত্রে সন্তান না নেওয়া একান্তই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
অর্থাৎ, পোষা প্রাণী এখন শুধু ভালোবাসা বা সঙ্গ পাওয়ার বিষয় নয়। অনেকের ক্ষেত্রে এটি বাসস্থান নির্বাচন, চাকরি, দৈনন্দিন জীবনযাপন এমনকি সম্পর্কের সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করছে। পোষ্যকে পরিবারের সদস্যের পাশাপাশি সন্তানের মতো করে দেখার এই প্রবণতাকেই বলা হচ্ছে ‘পেট প্যারেন্টিং’।
পোষ্যের পেছনে খরচ কম নয়
পোষা প্রাণী পালনের দায়িত্ব তুলনামূলক সহজ মনে হলেও এর আর্থিক ব্যয়ও কম নয়। বিশেষ করে তরুণদের একটি অংশ পোষ্যের খরচ সামলাতে নিজেদের জীবনযাপনে নানা ধরনের পরিবর্তন আনছেন।
জেন-জি ও মিলেনিয়ালদের ২৯ শতাংশ জানিয়েছেন, পোষ্যের খরচ বহন করতে গিয়ে তারা ঋণের চাপে পড়েছেন। খরচ কমাতে ৬১ শতাংশ বাইরে থেকে খাবার কেনা কমিয়ে বাড়িতে রান্না করছেন। ৪৫ শতাংশ কমিয়েছেন কেনাকাটা। বাড়তি আয়ের জন্য ৩৭ শতাংশ পার্টটাইম কাজ করছেন। এমনকি ২৫ শতাংশ নিজেদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা পর্যন্ত পিছিয়ে দিয়েছেন। ২৬ শতাংশ আবার পোষ্যের ব্যয় সামলাতে ছোট বাসায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে, এসব ত্যাগের পাশাপাশি পোষ্যের জন্য অতিরিক্ত খরচ করতেও অনেক মালিক পিছপা হচ্ছেন না। পোষ্যের জন্য পোশাক কেনা, জন্মদিন পালন কিংবা জিম ও ক্যাফেতে তাদের নিয়ে খরচ করার মতো বিষয়ও এখন খুব স্বাভাবিক।
পোষ্যের জন্য আইনি অধিকার চাওয়ার প্রবণতা
পোষ্যকে পরিবারের সদস্য হিসেবে দেখার প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। তাদের জন্য সরকারি ও আইনি সুবিধার দাবিও জোরালো হচ্ছে।
জরিপে ৬৯ শতাংশ পোষ্য মালিক বলেছেন, তারা চান পোষা প্রাণীকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হোক এবং সন্তানের মতো কর সুবিধা দেওয়া হোক। অনেকে পোষ্যের চিকিৎসার জন্য ছুটি ও ইন্স্যুরেন্স সুবিধার দাবিও জানিয়েছেন।
বদলে যাচ্ছে পরিবারের প্রচলিত ধারণা
ফোর্বসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবার ও সম্পর্ক নিয়ে প্রচলিত ধারণায় দ্রুত পরিবর্তন আসছে। যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে তরুণদের একটি অংশ সামাজিক চাপ, প্রচলিত পারিবারিক কাঠামো কিংবা বংশধারা ধরে রাখার ধারণার বাইরে গিয়ে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন। কেউ কেউ আবার একেবারেই সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
এর আগে, ২০২৩ সালে ইউএসএ টুডে ও ওয়ানপোলের একটি জরিপেও তরুণদের মধ্যে একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। ১৮ থেকে ২৬ বছর বয়সী অংশগ্রহণকারীদের ৬৭ শতাংশ জানিয়েছিলেন, সন্তান নেওয়ার পরিবর্তে তারা একটি কুকুর নিতে আগ্রহী।
সময়ের আলো/মহু