জৈন্তিয়া রাজ্যের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কতগুলো মোকাম বা সমাধিস্থল আজও মানুষের দৃষ্টি কাড়ে। এসব মোকাম জৈন্তিয়া রাজ্যের পীর-দরবেশদের প্রতি রাজাদের শ্রদ্ধাশীল মনোভাবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। একই সঙ্গে এগুলো জৈন্তিয়া রাজ্যের মুসলমান অধিবাসীদের সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। এসবের মধ্যে সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ও রাজকীয় হচ্ছে হযরত শাহজি (রহ.)’র মোকাম।
এই শাহজি কে ছিলেন, তা নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি রয়েছে। অনেকে মনে করেন, তিনি ছিলেন হযরত শাহজালাল (রাহ.)’র সফরসঙ্গীদের কেউ। এই ধারণা ভুল। কারণ, হযরত শাহজালাল সিলেটে এসেছিলেন চতুর্দশ শতকে। অন্যদিকে, মোকামটি নির্মিত হয়েছিল অষ্টাদশ শতকে। এটি নির্মাণ করেছিলেন রাজা বিজয়নারায়ণ সিংহ বা বিজয় সিংহ।
মোকামের পূর্ব দেয়ালের ঘুলঘুলি। ছবি : সৌজন্য
জনশ্রুতি আছে যে, এই রাজা সকল ধর্মের গুরুদেরকেই বেশ সম্মান করতেন। তার আমলে বন্দরহাটি মসজিদের ইমাম ও খতিব ছিলেন হযরত শাহজি। তিনি ছিলেন জৈন্তিয়ার বিখ্যাত দরবেশ হযরত কাশিম শাহের ছাত্র ও শিষ্য। কাশিম শাহের পরে তিনিই জৈন্তিয়ার সবচেয়ে বড় দরবেশ ছিলেন। রাজা বিজয়নারায়ণ এই মুসলমান ধর্মগুরুকে বেশ সম্মান করতেন। তাই তার মৃত্যুর পর রাজা তার সমাধিস্থলে একটি দৃষ্টিনন্দন মোকাম বা সমাধিঘর বানিয়ে দিয়েছিলেন। জৈন্তিয়ার রাজাদের হাতে নির্মিত যেসব স্থাপনা আজও পুরোপুরিভাবে অক্ষত আছে, তার মধ্যে সমাধিঘরটি অন্যতম। জৈন্তিয়ার অন্যান্য মোকামের মতো এটিতেও মূল ব্যক্তির সঙ্গে আরও কয়েকজন সমাহিত রয়েছেন। সমাধিঘরটির ভেতরে রয়েছে ৩ জন ও বাইরে রয়েছে ২ জনের সমাধি।
হযরত শাহজির সমাধিটি ঘরের ভেতরে। সেখানে তার ২ জন খাদেমও সমাহিত রয়েছেন। ঘরের মেঝেতে নির্মিত ৩টি সমাধি দেখতে হুবহু একইরকম। এগুলোর নির্মাণশৈলীতে কোনো পার্থক্য নেই। দেখে মনে হয়, হযরত শাহজির ২ খাদেমও তার মতোই মর্যাদাবান ছিলেন। তাই রাজা বিজয়নারায়ণ একই আকৃতিতে সমাধিগুলোকে বাঁধাই করেছিলেন এবং রাজকীয় সমাধিঘরের ভেতরে এগুলোকে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। তবে, তাদের মৃত্যুর সময়কাল জানা যায় না। হতে পারে, তারা হযরত শাহজির আগেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। অথবা এমনও হতে পারে, তারা শাহজির পরে মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং তাদের মৃত্যুর পরেই মোকামটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল।
মোকামের ভেতরের দৃশ্য। ছবি : সৌজন্য
রাজা বিজয়নারায়ণের শাসনকাল ছিল ১৭৮৫ সাল থেকে ১৭৮৮ সাল পর্যন্ত। এরই মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে তিনি হযরত শাহজির মোকাম বা সমাধিঘরটি বানিয়ে দিয়েছিলেন। তৎকালীন যুগের বিচারে অত্যন্ত নান্দনিক শৈলীতে এটি নির্মিত হয়েছিল। ঘরটির দক্ষিণের দেয়ালের কারুকাজ চোখে পড়ার মতো। এই দেয়ালের মাঝখানে রয়েছে ঘরটির প্রবেশদ্বার। পশ্চিমের দেয়ালেও কিছু কারুকাজ রয়েছে। পূর্বের দেয়ালজুড়ে রয়েছে অত্যন্ত চমৎকার একটি ঘুলঘুলি বা ভেন্টিলেটর। দিনের বেলায় এই ঘুলঘুলি দিয়েই ঘরের ভেতরে আলো প্রবেশ করে। রাতের অন্ধকার দূর করার জন্য একসময় ঘরের ভেতরে প্রদীপ জ্বালানোর প্রচলন ছিল। ঘরের ভেতরে দেয়ালের গায়ে প্রদীপ রাখার কুঠুরিগুলো আজও পুরোপুরিভাবে অক্ষত রয়েছে।
মোকামের বাইরের সমাধি। ছবি : সৌজন্য
রাজা বিজয় সিংহ কিংবা তার পরবর্তী কোনো রাজার শাসনামলে হযরত শাহজির সমাধিঘরটির বাইরে আরও ২ জনকে সমাহিত করা হয়েছিল। এদের সমাধিগুলোও রাজকীয় শৈলীতে বাঁধানো রয়েছে। এদের মধ্যে ১ জন ছিলেন হযরত শাহজির কন্যা। অপর ব্যক্তিটি কে ছিলেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে তিনি যে খুবই মর্যাদাসম্পন্ন কেউ ছিলেন, তাতে সন্দেহ নেই। বাইরের দুটো সমাধির সঙ্গে ঘরের ভেতরের সমাধিগুলোর নির্মাণশৈলীর বেশ পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্য থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ভেতরের ৩টি ও বাইরের ২টি সমাধি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে নির্মিত হয়েছিল। একটি অনুচ্চ দেয়াল দিয়ে বাইরের দুটো সমাধিকে মূল সমাধিঘরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। দেয়ালটি অবশ্য আগের আমলের নয়; এটি বর্তমান সময়ের।
হযরত শাহজির মোকাম। ছবি : সৌজন্য
হযরত শাহজির মোকামটির অবস্থান সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের একেবারে কাছেই। সিলেট শহর থেকে বেশ সহজেই সেখানে যাওয়া যায়। মোকামটি দেখতে হলে সিলেট শহর থেকে জৈন্তাপুর উপজেলা সদরগামী গাড়িতে উঠতে হবে। নামতে হবে জৈন্তাপুর উপজেলা সদর বা বাসস্ট্যান্ডের প্রায় দেড় কিলোমিটার আগে, ফেরীঘাট সেতুর দক্ষিণে। জায়গাটির নাম ফেরীঘাট ববরবন্দ। ফেরীঘাট সেতুর সামান্য আগে ববরবন্দ এলাকায় সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের পশ্চিমপাশে একটি মসজিদ দেখা যায়। মসজিদটির নাম ভিত্রিখেল জামে মসজিদ। হযরত শাহজির মোকামটির অবস্থান এই মসজিদের পাশেই।