চর-দ্বীপচরে শরতের শুভ্র-নীলের ছোঁয়া, পর্যটকের ভিড়

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

ফিচার

বিকেলের আলো সাঁঝবেলায় তখনো পুরোপুরি নিভে যায় নি। গাইবান্ধার ফুলছড়ির বালাসী ঘাটে একের পর এক নৌকা এসে ভিড়ছে। নৌকা থেকে

2026-09-29T16:27:14+00:00
2026-09-29T16:27:14+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফিচার
চর-দ্বীপচরে শরতের শুভ্র-নীলের ছোঁয়া, পর্যটকের ভিড়
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:২৭ পিএম 
চর-দ্বীপচরে শরতের শুভ্র-নীলের ছোঁয়া। ছবি : সময়ের আলো
বিকেলের আলো সাঁঝবেলায় তখনো পুরোপুরি নিভে যায় নি। গাইবান্ধার ফুলছড়ির বালাসী ঘাটে একের পর এক নৌকা এসে ভিড়ছে। নৌকা থেকে নামছেন তরুণ-তরুণীর দল, কারও হাতে ক্যামেরা, কারও কাঁধে ব্যাগ। সামনে বালুচর, তার ওপারে দিগন্তজোড়া কাশবন। গাঢ় নীল আকাশের নিচে বাতাসে দুলছে সাদা ফুলের ঢেউ। শহুরে এই মানুষগুলোর কাছে দৃশ্যটা ছবির মতো। আর ঘাটের মাঝি, চরের কৃষক কিংবা আঙিনায় বসা গৃহিণীর কাছে এটা প্রতিদিনের জীবনেরই অংশ।

ভাদ্র-আশ্বিনের শরৎ গাইবান্ধার চরাঞ্চলে এভাবেই দুই চেহারায় আসে। এক চেহারায় আছে শুভ্র কাশ আর নীল আকাশের মুগ্ধতা। অন্য চেহারায় আছে বালু পথ, শুকিয়ে যাওয়া নদী আর ভুট্টা-মরিচের খেতে চরবাসীর টিকে থাকার হিসাব।


শুভ্র কাশের রাজত্ব
ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, যমুনা, করতোয়া, ঘাঘট, মানস, আলাই ও বাঙালি নদীর অববাহিকায় জেগে থাকা অন্তত ১৬৫টি চর ও দ্বীপচর এখন কাশফুলে ছেয়ে গেছে। ভাদ্রের শেষ থেকে কার্তিক পর্যন্ত নদীর পাড় আর বালুচরে চলে কাশের রাজত্ব। ফুলছড়ির বালাসী ঘাট, চররসুলপুর ও চর উজালডাঙা, সদরের কামারজানি ও মোল্লারচর এলাকা, সবখানেই একই দৃশ্য। লোকালয়হীন ধূসর বালুর মাঝখানে কোথাও ছোট ডোবা, কোথাও স্বচ্ছ জলের চ্যানেল। সেসব ঘিরেই গজিয়ে ওঠা কাশবনে বিকেল গড়ালেই জমে ওঠে প্রকৃতির উৎসব।

বৈজ্ঞানিক বিচারে কাশ একটি বহুবর্ষজীবী ঘাস। চরবাসীর কাছে এটি সৌন্দর্যের চেয়ে বেশি কাজের জিনিস। কাশ চরের বালু মাটিকে ক্ষয় থেকে বাঁচায়। এর ডাঁটা দিয়ে ঘরের চাল দেওয়া হয়, পানের বরজ ও সবজিখেতে বেড়া দেওয়া হয়, চুলার জ্বালানিও মেলে।

কামারজানি চরের গৃহিণী রহিমা বেগম (৪০) বলেন, শহরের মানুষ যারে ফুল কয়, আমরার কাছে সে ঘরের বেড়া, চুলার লাকড়ি। কাশ না থাকলে বর্ষায় ঘর টিকত না।


পর্যটকের ভিড়, মাঝির আশা
শরৎ এলেই শহরের ব্যস্ততা ছেড়ে ভ্রমণপিপাসুরা ছুটে আসেন চরে। বালাসী ঘাটে ত্রিশ বছর ধরে নৌকা চালান আব্দুল মান্নান (৫৫)। বছরের এই সময়টা তাঁর কাছে সবচেয়ে ব্যস্ত। তিনি বলেন, ‘কাশ ফুটলেই বুঝি, শহরের মানুষ আসবে। সকাল থেকে সন্ধ্যা নৌকা ভাড়া হয়। ছবি তোলে, হাসে, আমরা নদী পার করে দিই। তবে ওরা যেদিন চলে যায়, সেদিন আমাদের ঘরের হাঁড়ির খবর কেউ নেয় না।’

মান্নানের কথায় আছে সম্ভাবনার পাশাপাশি অসহায়তাও। চরে পর্যটকদের জন্য নেই পরিকল্পিত বিশ্রামাগার, নেই শৌচাগার, নেই নিরাপদ নৌভ্রমণের আধুনিক অবকাঠামো। ‘মেয়েছেলে নিয়া আসে মানুষ, কিন্তু একটা শৌচাগারও নাই। লাইফ জ্যাকেট নাই, নৌকায় বাড়তি মানুষ তুলতে হয়। ভয় লাগে,’ বলেন তিনি।

ভিড়ের সঙ্গে বাড়ছে আশঙ্কাও। অসচেতন দর্শনার্থীর হাতে কাশফুল ছেঁড়া পড়ে, ছড়িয়ে পড়ে প্লাস্টিক বর্জ্য। কাশবনের স্বাভাবিক শুভ্রতা আর নদীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য বাঁচাতে দর্শনার্থীদের সচেতনতা যেমন দরকার, তেমনি দরকার পরিবেশবান্ধব পর্যটন নীতিমালা। তা না হলে যে সৌন্দর্য চরের সম্ভাবনা, সেটিই একদিন তার বোঝা হয়ে উঠতে পারে।


চরবাসীর ভরসা
পর্যটন যেখানে মৌসুমি সম্ভাবনা, সেখানে চরবাসীর বছরভর ভরসা মাটির ফসল। নদী সরে গিয়ে রেখে যাওয়া পলিমাটিতে এখন ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে ভুট্টা, মরিচ ও চীনাবাদাম। জেলা প্রশাসন এই চরের কৃষিকে জেলা ব্র্যান্ডিংয়ের অংশ করেছে। স্লোগান ঠিক হয়েছে, ‘স্বাদে ভরা রসমঞ্জুরির ঘ্রাণ, চরাঞ্চলের ভুট্টা-মরিচ গাইবান্ধার প্রাণ’।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড়ো জায়গা দখল করেছে ভুট্টা। সাঘাটা, ফুলছড়ি, সুন্দরগঞ্জ ও সদর উপজেলার চরে প্রায় ১৩ হাজার ৪৪৫ হেক্টর জমিতে ভুট্টার আবাদ হয়; উৎপাদন এক লাখ ৩৬ হাজার ৩৩২ মেট্রিক টন। খরচ কম, ফলন বেশি। সাঘাটার চরের কৃষক শাহজাহান আলী (৪৮) বলেন, ‘আমনে বন্যায় সব গেছে, তখন ভুট্টাই আমাদের বাঁচাইছে। খরচ কম, ফলন ভালো। এখন ধানের চেয়ে ভুট্টার ওপর ভরসা বেশি।’ আমনের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ভুট্টা এখন কৃষকের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি।

লাল মরিচের আবাদ হয় ১ হাজার ৭২৫ হেক্টর জমিতে, উৎপাদন ২ হাজার ৮১৩ মেট্রিক টন। ফুলছড়ি পুরোনো উপজেলা মাঠের ঐতিহাসিক মরিচের হাটে কেনা-বেচা জমে ওঠে। প্রাণ, এসিআইসহ জাতীয় পর্যায়ের খাদ্যশিল্প প্রতিষ্ঠান ও পাইকারদের কাছে এখান থেকেই সরাসরি মরিচ যায়।

সুন্দরগঞ্জ, সদর ও সাঘাটার নদীতীরের বালুজমিতে ৭৫ হেক্টরে চীনাবাদাম চাষ হয়। কৃষকদের হিসাবে বিঘাপ্রতি নিট লাভ ১৭ থেকে ২০ হাজার টাকা। বাদামগাছের আগাছা ছেঁটে গবাদিপশুর খাবারও জোগাড় হয়।


সৌন্দর্যের আড়ালের সংকট
ফসলের এই সাফল্যের পেছনে আছে কঠিন বাস্তবতা। গাইবান্ধা জেলার অন্তত ৩৫ শতাংশ এলাকা নদী ও চরাঞ্চল নিয়ে গঠিত। এই অঞ্চলে বসবাসকারী ৪৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে। বর্ষায় জলমগ্নতা, শুষ্ক মৌসুমে দুর্গম বালুপথ। এই দুইয়ের দোলাচলেই কাটে চরবাসীর জীবন।

সংকটের মূলে নদীর নাব্যতা হ্রাস। উজান থেকে নেমে আসা পলিতে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। প্রতিবছর প্রায় সাড়ে ৭২ কোটি টন পলি বইতে গিয়ে নদী গভীরতা হারিয়েছে, বেড়েছে প্রস্থ। গাইবান্ধার অংশে কোথাও কোথাও সেই প্রস্থ ১৬ থেকে ১৮ কিলোমিটার। পলি জমে গড়ে ওঠা অসংখ্য চর আর খণ্ড খণ্ড চ্যানেলের কারণে বর্ষা ফুরালেই নদী মরা খালের চেহারা নেয়।

মাঝি মান্নান পরিবর্তনটা দেখেছেন নিজের চোখে। আগে এই ঘাটে বারো মাস নৌকা চলত। এখন আশ্বিন আসতে না আসতেই নদীতে হাঁটুজল। নৌকা ঠেলে নিতে হয়। কোথাও কোথাও তো নৌকা রেখে বালুতে হাঁটাই ভরসা।

পানি সরে গেলে শরৎ থেকেই শুরু হয় যোগাযোগের দুর্ভোগ। জেলা শহরে যেতে মাইলের পর মাইল বালুপথ পাড়ি দিতে হয়, কখনো হেঁটে, কখনো ঘোড়ার গাড়িতে। অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া কিংবা ফসল বাজারে পৌঁছানো তখন কঠিন পরীক্ষা। রহিমা বেগমের কণ্ঠে তাই ক্ষোভের চেয়ে ক্লান্তিই বেশি, রাতে কারও ব্যথা উঠলে ভরসা কেবল আল্লাহ। বালুর ওপর দিয়া গাড়ি নিয়া যাইতে যাইতেই ভোর হয়ে যায়।


ভোরের শিউলি
কাশের সঙ্গে শরতের আরেক পরিচয় শিউলি বা শেফালি। চরের মেঠো পথ ঘেঁষা বসতবাড়ির আঙিনায় ভোরের আলো ফোটার আগেই শিশিরভেজা ঘাসে ঝরে পড়ে নরম সাদা পাপড়ি আর কমলা বোঁটা। ফুলটি ফোটে রাতে, ঝরে ভোরে। বৈজ্ঞানিক নাম নিকট্যান্থেস আরবর-ট্রাইটিস, অর্থাৎ ‘রাতের ফুল’ বা ‘বিষাদিনী তরু’। লোকবিশ্বাস, সূর্যদেবের প্রেমে ব্যর্থ রাজকন্যা পারিজাতকের ভস্ম থেকে জন্মেছিল এই গাছ। সেই অভিমানেই সে সূর্য ওঠার আগে ঝরে যায়। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের গান-কবিতায় শেফালি বারবার এসেছে শরতের প্রতীক হয়ে।

চরের নারীদের কাছে শিউলি অবশ্য আরও ঘরোয়া। রহিমা বেগম বলেন, ‘ছোটোবেলায় নানি শিখাইছিল, পাতার রস খাইলে পেটের কৃমি যায়। এখনো কারও জ্বর-জ্বালা হলে পাতা বাটি।’ শিউলির পাতা কৃমিনাশক হিসেবে সমাদৃত; সাইটিকা ও পুরোনো জ্বরের পথ্য হিসেবেও আয়ুর্বেদে এর ব্যবহার আছে। ফুল থেকে মেলে প্রাকৃতিক হলুদ রঞ্জক। এই ভেষজ গুণ কাজে লাগিয়ে কুটিরশিল্প ও আয়ুর্বেদিক কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাতকরণের উদ্যোগ নেওয়া গেলে চরের নারীদের জন্য নতুন আয়ের পথ খুলতে পারে।

সন্ধ্যায় শেষ যাত্রী নামিয়ে নৌকা বাঁধতে বাঁধতে মান্নান আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘নদীতে পানি থাকলে, রাস্তা থাকলে, আমরার আর কিছু চাই না।’ পশ্চিম আকাশে তখন লালচে আভা, কাশবনে শেষ বিকেলের হাওয়া। ঘাটের ওপারে ভুট্টার খেত আর মরিচের হাটের অপেক্ষায় থাকা চরের জীবন।

কাশফুলের সৌন্দর্য চরের সম্ভাবনার একটি দিক মাত্র। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, টেকসই নদী খনন, পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো আর কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা গেলে শরতের এই শুভ্র-নীল রূপই হয়ে উঠতে পারে গাইবান্ধার চরাঞ্চলের সমৃদ্ধির চাবিকাঠি।

সময়ের আলো/আতা
  বিষয়:   চর  দ্বীপচর  শরত  শুভ্র নীল  ছোঁয়া  পর্যটক  ভিড়  সময়ের আলো  গাইবান্ধা  রংপুর 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: