দেশের সবচেয়ে বড় গ্রাম হবিগঞ্জের বানিয়াচং। গ্রামটি ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য হাওর, জলাবন, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও লোকগাথায় সমৃদ্ধ এক অন্যতম প্রিয় ভ্রমণ গন্তব্য। এখানকার লক্ষ্মীবাঁওড় বা সোয়াম্প ফরেস্ট প্রকৃতিপ্রেমীদের বিশেষ পছন্দ, যা রাতারগুলের চেয়েও বড়। স্থানীয়দের কাছে ‘খড়তির জঙ্গল’ নামে পরিচিত এই জলাবন বর্ষায় পানির ওপর ভাসমান সবুজ অরণ্যের রূপ নেয়। পাখির কলকাকলি, হিজল-করচের সারি এবং চারপাশের জলরাশি মিলিয়ে তৈরি হয় মনোমুগ্ধকর পরিবেশ।
হবিগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ১৭ মাইল দূরে বানিয়াচং। বানিয়াচং আদর্শ বাজার থেকে লক্ষ্মীবাঁওড়ের দূরত্ব প্রায় ৫ কিলোমিটার। আউশকান্দি থেকে নবীগঞ্জ হয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বানিয়াচং বড় বাজারে পৌঁছানো যায়। স্থানীয়রা জায়গাটিকে ‘বাইন্নাচং’ নামেও ডাকেন। সেখান থেকে অটোরিকশায় আদর্শ বাজারের নৌঘাটে গিয়ে বর্ষায় নৌকা ভাড়া করে জলাবনের দিকে যাত্রা করা যায়।
খড়তি নদের দক্ষিণে প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই প্রাকৃতিক জলাবন। কখন এর সৃষ্টি হয়েছিল, তা স্থানীয় প্রবীণদের কাছেও স্পষ্ট নয়।
লক্ষ্মীবাঁওড়ের সবুজ প্রকৃতি। ছবি : সংগৃহীত
বর্ষায় নৌকায় জলাবনের ভেতরে প্রবেশ করাই সবচেয়ে উপভোগ্য। পানির মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা হিজল-করচগাছ, শাপলা-কচুরিপানা ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ, পানিতে ভেসে থাকা পাতিহাঁস, জেলেদের মাচাঘর এবং জলঘেরা গ্রাম- সব মিলিয়ে হাওরজীবনের সঙ্গে পর্যটকের পরিচয় ঘটে। জলপথে পুরো জলাবন ঘুরে দেখতে প্রায় ২ ঘণ্টা সময় লাগে। শুকনো মৌসুমে পানি নেমে গেলে বনের ভেতরের পিচঢালা পথে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, প্রাইভেট কার, সিএনজি কিংবা ব্যাটারিচালিত টমটমেও যাতায়াত করা যায়। শরৎকালে বন অনেকটাই শুকিয়ে গেলেও ভেতরের বেশ কয়েকটি বিল ও খালে পানি জমে থাকে। এসব বিলে প্রচুর মাছও পাওয়া যায়।
লক্ষ্মীবাঁওড় জীববৈচিত্র্যের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর দেখা মেলে। মেছোবাঘ, শিয়াল, গুইসাপসহ বিভিন্ন প্রাণীর পাশাপাশি কেউটে, লাড্ডুকা, দারাইশসহ বিষধর সাপও রয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন জাতের বক, পানকৌড়ি ও বালিহাঁস দেখা যায়। শীতকালে অতিথি পাখির আগমনে নির্জন জলাবন মুখর হয়ে ওঠে। দেশি ও অতিথি পাখির বিচরণ বিবেচনায় বনটিকে পাখির অভয়ারণ্য হিসেবেও ঘোষণা করা হয়েছে।
রেস্টহাউস। ছবি : সংগৃহীত
জলরাশির মধ্যে বনের মনোরম পরিবেশে রয়েছে একটি রেস্টহাউস। পর্যটকদের জন্য এতে ২টি বিশ্রামাগার ও ওয়াশরুম রয়েছে। পর্যটন করপোরেশনের অর্থায়নে প্রায় ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত রেস্টহাউসটির তত্ত্বাবধানে রয়েছে বানিয়াচং উপজেলা প্রশাসন।
লক্ষ্মীবাঁওড় ঘুরে দেখার পাশাপাশি বানিয়াচং ভ্রমণে যুক্ত করা যায় আরও কয়েকটি দর্শনীয় স্থান। জলাবন থেকে ফিরে দেখা যেতে পারে দেওয়ান রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ। জানা যায়, ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি বানিয়াচংয়ের রাজা গোবিন্দ সিংহ ওরফে হাবিব খান এই রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন। প্রাসাদের পুরনো দেয়াল, বটগাছের শিকড়, সালিশ ঘর ও পাশের দেওয়ানদিঘি এখনও সেই অতীতের স্মৃতি বহন করছে। শুক্র ও শনিবার বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত রাজবাড়ি দর্শনার্থীদের জন্য বিনা টিকিটে উন্মুক্ত থাকে।
এরপর ঘুরে দেখা যেতে পারে কমলা রানির দিঘি, যা স্থানীয়দের কাছে ‘সাগর দিঘি’ নামেও পরিচিত। প্রায় ৬৬ একরজুড়ে বিস্তৃত এই দিঘিকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দিঘি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রচলিত আছে, সামন্ত রাজা পদ্মনাভ প্রজাদের পানির সংকট দূর করতে দিঘিটি খনন করেছিলেন। দিঘিকে ঘিরে রানি কমলাবতীর আত্মত্যাগের লোকগাথাও প্রচলিত। পল্লীকবি জসীমউদ্দীন এই দিঘির পাড়ে বসে ‘রাণী কমলাবতীর দিঘি’ কবিতা লিখেছিলেন, যা তার ‘সূচয়নী’ কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত।
লক্ষ্মীবাঁওড় ভ্রমণের জন্য বর্ষাকাল সবচেয়ে উপযোগী। তখন নৌকায় জলাবনের ভেতরে ঘুরে প্রকৃতির অন্যরকম সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। অন্যদিকে, শুকনো মৌসুমে পানির নিচে থাকা পথ ধরে দেখা মেলে জলাবনের ভিন্ন রূপ।
বানিয়াচংয়ে খাবারের দোকান থাকলেও আবাসিক হোটেলের সুবিধা সীমিত। তাই দিনভর ঘোরাঘুরি শেষে হবিগঞ্জ শহরে ফিরে রাত্রি যাপন করা সুবিধাজনক। ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে বাসে হবিগঞ্জ যাওয়া যায়। ট্রেনে গেলে শায়েস্তাগঞ্জ রেলস্টেশনে নেমে সড়কপথে হবিগঞ্জ হয়ে বানিয়াচং যেতে হবে।