দিনে ৩৩৮ শব্দ কম বলছি আমরা, মানুষ কি তবে নিশ্চুপ হয়ে যাচ্ছে

সময়ের আলো ডেস্ক

ফিচার

কয়েক বছর আগেও কোনো গলি, মহল্লা কিংবা মফস্বলের পাড়ায় সকালে কাজে বের হলে পরিচিত-অপরিচিত অনেক মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময় হতো।

2026-08-21T19:12:58+00:00
2026-08-21T19:21:13+00:00
 
  শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬,
৬ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬
ফিচার
দিনে ৩৩৮ শব্দ কম বলছি আমরা, মানুষ কি তবে নিশ্চুপ হয়ে যাচ্ছে
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ৭:১২ পিএম  আপডেট: ২১.০৮.২০২৬ ৭:২১ পিএম
২০০৫ সালে একজন মানুষ দিনে গড়ে ১৬ হাজার ৬৩২টি শব্দ বলতেন। সংগৃহীত ছবি
কয়েক বছর আগেও কোনো গলি, মহল্লা কিংবা মফস্বলের পাড়ায় সকালে কাজে বের হলে পরিচিত-অপরিচিত অনেক মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময় হতো। ফার্মেসি, মুদির দোকান কিংবা কাঁচাবাজারে কেনাকাটা করতে গিয়ে, অথবা রিকশার জন্য অপেক্ষা করার সময়ই শুরু হয়ে যেত ছোটখাটো আলাপ। কথাগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু না হলেও এসব সাধারণ কথোপকথনের মধ্য দিয়েই তৈরি হতো সামাজিক বন্ধন ও এক ধরনের আপন অনুভূতি। কিন্তু কয়েক বছর ধরে নতুন এলাকায় বসবাস করেও সেই পরিচিত আমেজ আর খুঁজে পান না অনেকেই। 

দ্য টেলিগ্রাফের ফিচার লেখক মেলিসা টুইগ মনে করেন, এর অন্যতম কারণ হলো আমাদের স্বাচ্ছন্দ্য ও সুবিধানির্ভর হয়ে ওঠা। তিনি নিজেই ব্যাংকের কাজ অনলাইনে করেন, অনলাইন ডেলিভারি থেকে টাটকা পাউরুটি কিনে নেন এবং টেসকো বা বুটসে গিয়ে সেলফ-সার্ভিস কাউন্টারেই বিল পরিশোধ করেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন কিছু অভ্যাস। হাতে ফোন আর কানে পডকাস্টের বিনোদনে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন যে লাইনে দাঁড়িয়ে পাশের কারও সঙ্গে আবহাওয়া নিয়ে দু-একটি কথা বলার কথাও আর মনে আসে না। 

এর ফলাফলও তিনি অনুভব করছেন। পরিচিত পরিবেশের মধ্যেও কখনো কখনো নিজেকে বিচ্ছিন্ন ও একা মনে হয়।

সম্প্রতি ‘পারসপেক্টিভস অন সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণাতেও উঠে এসেছে একই ধরনের চিত্র। মানুষ আগের তুলনায় কম কথা বলছে এবং এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে আমাদের সামাজিক যোগাযোগের ওপর। 

মিসৌরি-কানসাস সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্ববিদ ভ্যালেরিয়া ফাইফার এবং অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাথিয়াস মেহল ১৫ বছর ধরে এ বিষয়ে গবেষণা করেছেন। ইউরোপ ও আমেরিকার হাজার হাজার মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে এই গবেষণায়। অংশগ্রহণকারীদের বয়স ছিল ১০ থেকে ৯৪ বছর। তাদের দৈনন্দিন কথাবার্তার পরিমাণ রেকর্ড করতে একটি ছোট যন্ত্র ব্যবহার করা হয়, যার নাম ‘ইলেক্ট্রনিক্যালি অ্যাক্টিভেটেড রেকর্ডার’ বা ইএআর। 

গবেষণায় দেখা যায়, ২০০৫ সালে একজন মানুষ দিনে গড়ে ১৬ হাজার ৬৩২টি শব্দ বলতেন। কিন্তু ২০১৯ সালে গবেষণা শেষ হওয়ার সময় সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১১ হাজার ৯০০-তে। অর্থাৎ পুরো সময়ে কথাবলার পরিমাণ কমেছে ২৮ শতাংশ। হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতিদিন গড়ে ৩৩৮টি শব্দ করে আমরা হারাচ্ছি। অর্থাৎ এক বছরে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার শব্দ কম বলছি। 

ফাইফার ও মেহলের গবেষণা অনুযায়ী, সবচেয়ে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো কথাবার্তা। মেহলের ভাষায়, পথে-ঘাটে কিংবা কাজের জায়গায় পরিচিত বা অপরিচিত মানুষের সঙ্গে হঠাৎ করে যে কথোপকথনগুলো হয়, সেগুলোই সবচেয়ে বেশি কমছে। অথচ এই ক্ষণস্থায়ী আলাপগুলোই সমাজে আমাদের নিজের জায়গা এবং আপন অনুভূতি তৈরি করত।

কোভিড-পরবর্তী সময়েও যদি গবেষণাটি চালিয়ে যাওয়া হতো, তাহলে এই সংখ্যা আরও অনেক নিচে নেমে যেত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

ফাইফারের মতে, এর পেছনে প্রযুক্তির ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। গবেষণার সময়কালের সঙ্গেই স্মার্টফোনের ব্যাপক বিস্তার এবং মেসেজিং অ্যাপের জনপ্রিয়তা বাড়ার বিষয়টি মিলে যায়। একই সময়ে এমন অনেক অ্যাপের ব্যবহারও বেড়েছে, যেগুলো মানুষের দৈনন্দিন মুখোমুখি যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তাই কমিয়ে দিয়েছে।

জিপিএস তার একটি বড় উদাহরণ। এখন পথ খুঁজতে কোনো অপরিচিত মানুষের কাছে গিয়ে দিকনির্দেশনা চাওয়ার প্রয়োজন হয় না। ফাইফার যুক্তরাষ্ট্রে তার অফিসের কাছে একটি স্টারবাকসের উদাহরণও দিয়েছেন। সেখানে সরাসরি গিয়ে কফি কেনার সুযোগ নেই; দোকানটি পুরোপুরি অনলাইন অর্ডারের ওপর নির্ভরশীল।

রেস্তোরাঁয় টেবিল বুক করা, কফি কেনা, অভ্যর্থনাকারীর সঙ্গে কথা বলা কিংবা কারও সাহায্য ছাড়াই ট্রেনের টিকিট কেটে ফেলা— এসব কাজ আমাদের কাছে নিছক সুবিধার বিষয় মনে হতে পারে। কিন্তু এর প্রভাব অনেক গভীর। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানী রবিন ডানবার মনে করেন, মুখোমুখি যোগাযোগের মধ্যে এমন কিছু আছে, যা আমরা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি।

ডানবারের গবেষণায় দেখা গেছে, হাসি এন্ডোরফিন হরমোন নিঃসরণে ভূমিকা রাখে, যা ব্যথা ও বিষণ্নতা কমাতে সাহায্য করতে পারে। তাঁর মতে, প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বললে মানুষ সবচেয়ে বেশি আনন্দ পায় ঠিকই, কিন্তু পরিচিত বা আধা-পরিচিত কারও সঙ্গে রাস্তায় চলতে চলতে হওয়া সাধারণ কথোপকথনও এক ধরনের আনন্দ তৈরি করে। কারণ এসব কথাবার্তা মানুষের মধ্যে সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী করে।

ডিজিটাল যোগাযোগও অবশ্য পুরোপুরি অকার্যকর নয়। টেক্সট মেসেজ বা ইমোজি পরিচিত মানুষের সঙ্গে সাধারণ যোগাযোগের ভালো বিকল্প হতে পারে। কিন্তু নতুন সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মানুষের মুখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠস্বর এবং কথার সূক্ষ্ম ওঠানামা সরাসরি দেখার বা শোনার যে অভিজ্ঞতা, তার কোনো সহজ বিকল্প নেই। আর এসব সংকেত ছাড়া গভীর বোঝাপড়া তৈরি করাও কঠিন।

অপরিচিতদের সঙ্গে ইতিবাচক যোগাযোগ আমাদের নিরাপদ বোধ করায়

বিবিসির চিত্রনাট্যকার এবং রেডিও ফোরের ‘দ্য আর্চার্স’-এর বহু পর্বের সঙ্গে যুক্ত কেটি হিমস মনে করেন, মানুষের কথা বলার ধরন অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কেউ খুব সরাসরি কথা বলেন, যা কখনো ভীতিকর মনে হতে পারে; আবার কেউ নিজের প্রয়োজনের কথাও সহজে প্রকাশ করতে পারেন না। দীর্ঘ বিরতি, হঠাৎ হাসি কিংবা কথার মাঝের ছোট ছোট পরিবর্তনেও অনেক অর্থ লুকিয়ে থাকে। লিখিত বার্তা বা ইমোজি সেই সূক্ষ্মতাগুলো পুরোপুরি তুলে ধরতে পারে না।

‘দ্য আর্চার্স’-এর চরিত্র ও কাহিনি বছরের পর বছর শুধু সংলাপের মাধ্যমে তৈরি করার অভিজ্ঞতা থেকে হিমস দেখেছেন, সাধারণ বলে মনে হওয়া কথাবার্তার মধ্য দিয়েই মানুষ নিজের সম্পর্কে অনেক কিছু প্রকাশ করে ফেলে।

তিনি মনে করেন, ছোটখাটো কথোপকথনের প্রতি একটু মনোযোগ দিলেই সেগুলো দারুণ আনন্দের উৎস হয়ে উঠতে পারে।

একবার ওয়েট্রোজে কেনাকাটার সময় এক ক্যাশিয়ার দিনের তারিখটি প্যালিন্ড্রোম হওয়া নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে দুজনের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ আলাপ হয়। চলে যাওয়ার সময় ক্যাশিয়ার তাকে ফ্লাইং কিসও দেন। ঘটনাটি খুব সামান্য মনে হতে পারে, কিন্তু হিমসের কাছে সেটি ছিল বিশেষ। কারণ সাধারণ কথাবার্তার বাইরে গিয়ে কেউ যখন একটু ব্যক্তিগতভাবে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করে, তখন সেই মুহূর্তটি আলাদা আনন্দ তৈরি করে।

মানুষ স্বাভাবিকভাবেই গভীর তৃপ্তি ও সংযোগ খোঁজে। অথচ সেই তৃপ্তির ছোট ছোট সুযোগগুলোই আমরা ক্রমে এড়িয়ে যাচ্ছি। একের পর এক গবেষণা বলছে, সাধারণ কথোপকথনের এসব মুহূর্ত আমাদের জন্য যতটা উপকারী, আমরা তার মূল্য ততটা বুঝতে পারি না।

২০১৪ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় বিষয়টি স্পষ্টভাবে দেখা যায়। একদল মানুষকে ট্রেনে ভ্রমণ করতে পাঠানো হয়েছিল। তাদের অর্ধেককে চুপচাপ সংবাদপত্র পড়তে বলা হয়, আর অন্যদের নির্দেশ দেওয়া হয় পাশের যাত্রীর সঙ্গে কথা বলতে।

যাত্রা শুরুর আগে প্রায় সবাই ধারণা করেছিলেন, অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলা হয়তো অস্বস্তিকর বা নেতিবাচক অভিজ্ঞতা হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, যারা অন্য যাত্রীর সঙ্গে কথা বলেছিলেন, তারাই তাদের ভ্রমণকে বেশি উপভোগ্য বলে জানিয়েছেন।

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অধ্যাপক রবার্ট ওয়ালডিঙ্গার, যিনি সুখ নিয়ে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার সঙ্গে যুক্ত, বলেন—আমরা যেমন খাবার খেলে মস্তিষ্ক থেকে আনন্দের অনুভূতি পাই, তেমনি অন্য মানুষের সঙ্গে সামান্য যোগাযোগও মস্তিষ্কে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। অপরিচিত মানুষের সঙ্গে ইতিবাচক যোগাযোগ আমাদের শরীরকে নিরাপত্তার সংকেত দেয়, শারীরিক উত্তেজনা কমায় এবং ভালো থাকার অনুভূতি বাড়ায়।

তবুও আমরা প্রায়ই এই সুযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করি। কর্মক্ষেত্রে ভালো বন্ধু থাকলে মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি সুখী হয়—এমন প্রমাণ থাকার পরও অনেকে অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন হয় এমন চাকরির বদলে বাড়ি থেকে কাজের সুযোগকে বেশি গুরুত্ব দেন। এমনকি অফিসে উপস্থিত থাকলেও সহকর্মীর ডেস্কে গিয়ে কথা বলার পরিবর্তে অনেকে গুগল চ্যাট, টিমস বা স্ল্যাকে বার্তা পাঠান। ফলে সম্পর্ক তৈরির সুযোগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি আরও স্বাভাবিক ও স্বচ্ছন্দ কথোপকথনের সম্ভাবনাও নষ্ট হয়।

প্রতিবেশীদের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। আশপাশের মানুষকে চেনা এবং তাদের সঙ্গে কথা বললে নিজের এলাকাকে অনেক বেশি আপন মনে হয়। কিন্তু ঘনিষ্ঠ সামাজিক পরিবেশ ছেড়ে বড় ও দ্রুত পরিবর্তনশীল শহরে চলে আসার পর অনেকের কাছেই অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলা অস্বস্তিকর বা ভীতিকর হয়ে ওঠে।

ডানবারের মতে, আমরা যেন এমন একটি জীবন বেছে নিয়েছি যেখানে রাস্তার ধারে মানুষের সঙ্গে মেলামেশার বদলে চার দেয়ালের ভেতরে একা থাকাটাই বেশি স্বাভাবিক। নারীরা আগের মতো বাড়ির সামনের সিঁড়িতে বসে গল্প করেন না, পুরুষেরা স্থানীয় আড্ডায় আগের মতো জড়ো হন না, শিশুরাও রাতের খাবারের পর একসঙ্গে মাঠে ফুটবল খেলতে বের হয় না। দূরে থাকা বন্ধুর সঙ্গেও এখন মূল যোগাযোগ হয় টেক্সটের মাধ্যমে।


তরুণদের ওপর প্রভাব আরও বেশি

এই নীরব বাস্তবতা তরুণদের জন্য আরও বড় সমস্যা তৈরি করছে। জেনারেশন জেড বা জেন-জি প্রযুক্তির মাধ্যমে অত্যন্ত যোগাযোগপ্রবণ। তারা নিয়মিত টেক্সট করে, ডিএম পাঠায়, ভয়েস নোট দেয়, ইমোজি শেয়ার করে এবং স্ন্যাপচ্যাট ব্যবহার করে।

কিন্তু বাস্তবে বন্ধুদের সঙ্গে বসে আড্ডা দেওয়া, পার্কে সময় কাটানো কিংবা শহরের কোনো জায়গায় শুধু গল্প করার জন্য জড়ো হওয়ার প্রবণতা তাদের মধ্যে কমে যাচ্ছে।

ফাইফার-মেহলের গবেষণায় দেখা যায়, ২৫ বছরের কম বয়সীরা অন্য বয়সীদের তুলনায় প্রতিদিন গড়ে ৪৩১টি শব্দ কম ব্যবহার করে। অন্যদের ক্ষেত্রে এই কমার পরিমাণ ৩১৪টি শব্দ।

ডানবার মনে করেন, এর প্রভাব ভবিষ্যতে আরও বড় হতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের জগৎ জটিল, অনিশ্চিত ও অপ্রত্যাশিত। এই জগতে অন্য প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতা তৈরি করতে প্রায় ২৫ বছর সময় লাগে। কিন্তু তরুণরা যদি সেই অনুশীলনের সুযোগই না পায়, তাহলে তারা আরও বেশি একাকিত্ব ও অনিশ্চয়তায় ভুগতে পারে।

ইন্টারনেট যুগ তরুণদের কথাবলার ধরনও বদলে দিয়েছে। হিমসের মতে, কথোপকথনে এখন সংক্ষিপ্ত রূপ ও শর্টহ্যান্ডের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে স্বাভাবিক কথাবার্তাও অনেকটা টেক্সটের মতো হয়ে যাচ্ছে। ইউটিউব বা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে দ্রুত ও সংক্ষিপ্ত ভিডিও দেখার অভ্যাসের কারণে দীর্ঘ বা বিস্তারিতভাবে কিছু বলার বদলে সংক্ষিপ্ত ভাষা ব্যবহারের প্রবণতাও বাড়ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তথাকথিত ‘জেন-জি স্টেয়ার’। বিশের কোঠার কোনো তরুণকে প্রশ্ন করলে কখনো কখনো উত্তরের বদলে শুধু শূন্য দৃষ্টি পাওয়া যায়, এমন অভিজ্ঞতার কথাও বলা হয়। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ভাষাবিজ্ঞানী কার্স্টি কিং মনে করেন, অনলাইনে কাটানো শৈশব-কৈশোরের কারণে তারা এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, যখন কী বলতে হবে বুঝতে পারছে না, সেই দক্ষতা কমে যেতে পারে।

আমাদের কণ্ঠস্বরে লুকিয়ে থাকে অনেক তথ্য

কথা বলার অভ্যাস হারানোর বিষয়টি শুধু তরুণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমরা নিজেরাও অবসর সময়ের বড় একটি অংশ অন্য মানুষের পডকাস্ট বা কথাবার্তা শুনে কাটাচ্ছি, অথচ নিজেরা ফোনে কথা বলছি কম।

যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, ফোনে কথা বলার মোট সময় ২০১৪ সালের ২২৯ বিলিয়ন মিনিট থেকে কমে ২০২৪ সালে ১৭৬ বিলিয়ন মিনিটে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, ভয়েস নোটের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। হোয়াটসঅ্যাপের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন প্রায় ৭ বিলিয়ন ভয়েস নোট পাঠানো হয়।

তবে ভয়েস নোটকে স্বাভাবিক কথোপকথনের পুরো বিকল্প বলা যায় না। হিমসের মতে, এতে অনেকটা একতরফা যোগাযোগ তৈরি হয়—একজন বলছেন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে অন্যজনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর কাছে এটি কিছুটা দেয়ালে টেনিস বল ছোড়ার মতো: শুরুতে মজার লাগলেও শেষ পর্যন্ত তা অতৃপ্তিকর।

সামাজিক জীবনকে অতিরিক্ত অনলাইননির্ভর করে তোলার বিষয়টিও উদ্বেগ তৈরি করছে। বিশেষ করে নতুন বন্ধু বা জীবনসঙ্গী খোঁজার ক্ষেত্রেও আমরা যখন ডিজিটাল মাধ্যমের ওপর বেশি নির্ভর করছি, তখন মানুষের আচরণ বোঝার ও অনুভূতি পড়ার স্বাভাবিক দক্ষতা কমে যেতে পারে।

‘দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ অব লাইজ’ বইয়ের লেখক কিং বলেন, মানুষ কী বলছে তার পাশাপাশি কীভাবে বলছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কণ্ঠস্বরের ওঠানামা, স্বরের উচ্চতা, কথা বলার সময় দ্বিধা, থেমে যাওয়া কিংবা আত্মবিশ্বাস, এসবের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকে। কিন্তু ডিজিটাল যোগাযোগে এসব সূক্ষ্ম সংকেতের অনেকটাই হারিয়ে যায়।

এর ফলে কেউ সত্যিই দ্বিধায় আছে, অস্বস্তিতে আছে, নাকি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলছে, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। আর অপরিচিত মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার অভ্যাস কমে গেলে তাদের প্রতি ভয় ও অবিশ্বাসও বাড়তে পারে।

কিংয়ের আশঙ্কা, আমরা যদি ছোট ছোট, নিরাপদ সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ হারাতে থাকি, তাহলে আমাদের চারপাশের অপরিচিত মানুষদের সম্পর্কে আরও সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠব। অথচ এসব সাধারণ কথোপকথনই আমাদের যোগাযোগের দক্ষতা চর্চার সুযোগ দেয় এবং মনে করিয়ে দেয় যে অধিকাংশ মানুষই আসলে ক্ষতিকর নয়।

সভ্যতা শুধু বড় বড় বক্তৃতা, গভীর আলোচনা কিংবা চমৎকার বক্তব্যের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। বরং প্রতিদিনের অসংখ্য ছোট ছোট কথোপকথনও আমাদের সামাজিক জীবনকে ধরে রাখে। এতটাই সাধারণ এসব যোগাযোগ যে, এগুলো হারিয়ে যেতে শুরু করলেও আমরা অনেক সময় তা বুঝতে পারি না।

কিন্তু এই প্রবণতা যদি চলতে থাকে, তাহলে আগামী ২০ বছরে আমাদের কথাবলার পরিমাণ আরও নাটকীয়ভাবে কমে যেতে পারে। হিসাব অনুযায়ী, তখন আমরা প্রতিবছর প্রায় ২৫ লাখ শব্দ কম ব্যবহার করব। প্রশ্ন তাই থেকেই যায়, প্রযুক্তি ও সুবিধার পেছনে ছুটতে গিয়ে আমরা কি ধীরে ধীরে শুধু কথা বলার অভ্যাসই নয়, একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষমতাটাও হারিয়ে ফেলছি? 

সূত্র : দ্য টেলিগ্রাফ 

সময়ের আলো/ইউএমএইচ



  বিষয়:   দ্য টেলিগ্রাফ  শব্দ  কম  বলা 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: