একটি গাছ লাগানো কখনো কখনো শুধু একটি গাছ লাগানো নয় বরং হয়ে উঠতে পারে পরিবর্তনের সূচনা। পরিবেশ রক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং শান্তির জন্য এমনই এক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন কেনিয়ার পরিবেশকর্মী ওয়াঙ্গারি মাথাই। সাধারণ মানুষের হাতে গাছের চারা তুলে দিয়ে তিনি শুরু করেছিলেন যে কাজ, তা একসময় ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বে। তার নেতৃত্বে পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন পরিণত হয় নারী অধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের আন্দোলনেও। এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৪ সালে তিনি লাভ করেন নোবেল শান্তি পুরস্কার।
১৯৪০ সালে কেনিয়ার নিয়েরি অঞ্চলে জন্ম ওয়াঙ্গারি মাথাইয়ের। ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক ছিল। উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করেন এবং পরে কেনিয়ায় ফিরে আসেন। তিনি জীববিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং পরে প্রাণিবিদ্যায় পিএইচডি অর্জন করেন। কেনিয়ার প্রথম দিকের নারী শিক্ষাবিদদের একজন হিসেবেও তিনি পথ তৈরি করেছিলেন অন্য নারীদের জন্য।
তবে তার সবচেয়ে বড় কাজ শুরু হয় পরিবেশ বিপর্যয়ের বাস্তবতা সামনে আসার পর। কেনিয়ার গ্রামাঞ্চলে নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে বন উজাড় হচ্ছিল, মাটির ক্ষয় বাড়ছিল, পানির উৎস শুকিয়ে যাচ্ছিল। এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছিল গ্রামীণ নারীদের ওপর। জ্বালানি কাঠ ও পানি সংগ্রহের দায়িত্ব যেহেতু মূলত নারীদের ওপর ছিল, পরিবেশের অবক্ষয়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের দৈনন্দিন জীবনও কঠিন হয়ে উঠছিল।
এই বাস্তবতা থেকেই ১৯৭৭ সালে ওয়াঙ্গারি মাথাই প্রতিষ্ঠা করেন গ্রিন বেল্ট মুভমেন্ট। আন্দোলনের মূল ভাবনা ছিল সহজ : নারীদের সংগঠিত করে তাদের হাতে গাছের চারা তুলে দেওয়া এবং স্থানীয়ভাবে গাছ লাগানোর মাধ্যমে পরিবেশ পুনরুদ্ধার করা। নারীরা নিজেরাই নার্সারি তৈরি করতেন, চারা উৎপাদন করতেন এবং গাছ লাগাতেন। এর মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি তাদের আয় ও আত্মনির্ভরতার সুযোগ তৈরি হয়।
ওয়াঙ্গারি মাথাই বুঝেছিলেন, পরিবেশের সংকটকে শুধু পরিবেশের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। বন উজাড়, দারিদ্র্য, খাদ্যসংকট, নারীর অধিকার এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই তার আন্দোলন ধীরে ধীরে বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
এই পথ অবশ্য সহজ ছিল না। পরিবেশ ও গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলার কারণে তাকে নানা ধরনের রাজনৈতিক চাপ, হয়রানি ও বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি পিছিয়ে যাননি। তার বিশ্বাস ছিল, পরিবর্তন শুরু হতে পারে খুব ছোট একটি কাজ দিয়েই। একটি চারা রোপণ যেমন ভবিষ্যতের একটি গাছের সম্ভাবনা তৈরি করে, তেমনি একজন সচেতন নারী একটি পরিবার ও সমাজে পরিবর্তনের সূচনা করতে পারেন।
২০০৪ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার মাধ্যমে তার কাজ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। তিনি ছিলেন প্রথম আফ্রিকান নারী, যিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। নোবেল কমিটি পরিবেশ, গণতন্ত্র ও শান্তির মধ্যে তার তৈরি করা যোগসূত্রকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়।
ওয়াঙ্গারি মাথাইয়ের গল্প তাই শুধু একজন পরিবেশকর্মীর গল্প নয়। এটি এমন এক নারীর গল্প, যিনি বুঝেছিলেন প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হলে মানুষকে, বিশেষ করে নারীদেরও ক্ষমতায়িত করতে হবে। তার রেখে যাওয়া সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে, বড় পরিবর্তনের জন্য সবসময় বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। কখনো কখনো একটি গাছের চারা, একজন সচেতন মানুষ এবং একটি ছোট উদ্যোগই হয়ে উঠতে পারে পরিবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি