ক্ষুধা পেলেই আমরা খাবার খেয়ে পেট ভরানোর চেষ্টা করি। আমাদের টেবিলে থাকে নানান বাহারি খাবারের পসরা। কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখি, পেট ভরলেও আমাদের শরীর পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছে তো?
জাতিসংঘের পাঁচটি সংস্থার যৌথ রিপোর্ট ‘স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৬’-এ বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রতি তিন জনে একজন, অর্থাৎ প্রায় ২৬৯ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে পারেন না। অর্থাৎ, তাদের অনেকেরই পেট ভরানোর মতো খাবার জোটে, কিন্তু শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত হয় না।
রাজধানীর ওয়ারীর ড্রীম ফার্টিলিটি কেয়ার এবং হেমায়েতপুর সেন্ট্রাল হসপিটালের পুষ্টিবিদ ইসরাত জাহান প্রিয়ানা এক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘খাবার শুধু পেট ভরানোর জন্য নয়, শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূরণের জন্যও হওয়া জরুরি। অনেক খাবার সাময়িকভাবে পেট ভরালেও তাতে প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ফাইবার, ভিটামিন ও মিনারেল কম থাকায় শরীরের প্রকৃত পুষ্টি নিশ্চিত হয় না।’
বিশ্বে এখন আগের তুলনায় বেশি খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু কারও থালায় ভাত আছে, ফল নেই; রুটি আছে, দুধ নেই। পুষ্টিকর খাবারের যেই সুষম বন্টন, তাতে অনেক বড় ঘাটতি রয়েছে।
অবশ্য, বিশ্বজুড়ে টানা তৃতীয় বছর ক্ষুধার হার কমেছে। ২০২৫ সালে বিশ্বের ৭ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ ক্ষুধায় দিন কাটিয়েছেন, যেখানে ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৮ দশমিক ১ শতাংশ। আফ্রিকাতেও ক্ষুধার হার কিছুটা কমেছে। কিন্তু ক্ষুধার হার কমলেও পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বহু মানুষ, যা আশঙ্কাজনক।
রিপোর্ট অনুযায়ী, স্বাস্থ্যকর খাবারের জন্য মাথাপিছু প্রতিদিন গড়ে ৪ দশমিক ২৮ পারচেসিং পাওয়ার প্যারিটি ডলার প্রয়োজন। অথচ আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা ধরা হয় দিনে ৩ পারচেসিং পাওয়ার প্যারিটি ডলার। অর্থাৎ, পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাবার কেনার সামর্থ্য নেই।
অনেক দেশে এখনো চাল, গম কিংবা অন্যান্য শর্করাযুক্ত খাবারে বেশি ভর্তুকি দেওয়া হয়। এতে মানুষের ক্যালোরির চাহিদা মিটলেও শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত হয় না।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরোর মতে, ‘মানুষ ক্যালোরি পেলেও পুষ্টি পাচ্ছে না। ফল, শাকসবজি, দুধ, ডিম কিংবা মাংসের মতো পুষ্টিকর খাবার অনেকের নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে।’
অন্যদিকে পুষ্টিবিদ ইসরাত জাহান প্রিয়ানা জানান, শিশুদের মধ্যে চিপস, ফ্লেভারড স্ন্যাকস, চকোলেট, আইসক্রিম, কুকিজের মতো মুখরোচক খাবারের প্রতি আসক্তি তৈরি হচ্ছে। বড়দের খাদ্যতালিকাতেও কেক, পেস্ট্রি, ডোনাট, ক্রিম বিস্কুট, মিষ্টিজাতীয় বেকারি খাবার, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, ফ্রোজেন স্ন্যাকস, বার্গার ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের মতো খাবারের উপস্থিতি বাড়ছে। এসব খাবারে সাধারণত ক্যালরি, চিনি, লবণ, পরিশোধিত ময়দা ও চর্বির পরিমাণ বেশি থাকলেও প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ফাইবার ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট তুলনামূলক কম থাকে।
এই পুষ্টিবিদের মতে, ‘এসব খাবার বেশি খেলে ফল, সবজি, ডাল, মাছ, ডিম, দুধ ও বাদামের মতো পুষ্টিকর খাবারের জায়গা কমে যেতে পারে। শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাদের বৃদ্ধি ও মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল এবং ওমেগা-৩ ও ৬-এর সঠিক অনুপাত প্রয়োজন। তাই চিপস, বিস্কুট বা কোমলপানীয়ে পেট ভরলেও তা সুষম পুষ্টির অভাব পূরণ করতে পারেৎ না।’
এদিকে, পুষ্টিহীন ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের ওপর নির্ভরতার কারণে দিনে দিনে স্থূলতার হার বাড়ছেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে স্থূলতার হার ছিল ১২ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৪ সালে সেই হার বেড়ে হয়েছে ১৬ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ, একদিকে যেমন অনাহার ও অপুষ্টি রয়েছে, অন্যদিকে বাড়ছে স্থূলতা। এর সঙ্গে বাড়তে পারে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং ক্যান্সারের মতো অসুখের ঝুঁকি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু খাদ্য উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; ফল, শাকসবজি, দুগ্ধজাত খাবার এবং পর্যাপ্ত প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে হবে। কমাতে হবে এসব খাবারের দাম, উন্নত করতে হবে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কৃষিতে বাড়াতে হবে বিনিয়োগ।
বর্তমানে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায়। হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে সামনে খাবারের দাম আরও বাড়তে পারে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সময়ের আলো/মহু