প্রাচীন রোমে গণভোজের আয়োজনকে সাধারণত পুরুষদের ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হতো। তবে নতুন গবেষণা বলছে, ধনী রোমান নারীরাও এসব ভোজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে তারা একই সঙ্গে পরিবার ও নিজের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতেন।
গবেষণায় খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকের শেষভাগ থেকে খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতক পর্যন্ত হিস্পানিয়ার ৩৬টি লাতিন শিলালিপি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০টি গণভোজের অর্থ দিয়েছিলেন নারীরা, ১৪টির অর্থায়ন করেছিলেন পুরুষ এবং দুটি ভোজে নারী-পুরুষ উভয়েই অর্থ দিয়েছিলেন।
বায়েতিকায় সবচেয়ে বেশি প্রমাণ
হিস্পানিয়ার বায়েতিকা অঞ্চল থেকে পাওয়া গেছে সবচেয়ে বেশি তথ্য। ৩৬টি ভোজের ২৯টির উল্লেখ রয়েছে এই অঞ্চলের শিলালিপিতে। নারী অর্থায়িত ২০টি ভোজের মধ্যে ১৭টির তথ্যও বায়েতিকা থেকে পাওয়া গেছে। মুনিগুয়া, কার্তিমা ও নেসকানিয়াসহ কয়েকটি শহরেও এমন নজির মিলেছে।
ভোজ ছিল মর্যাদা প্রদর্শনের মাধ্যম
রোমানদের এসব আনুষ্ঠানিক গণভোজকে বলা হতো ‘এপুলা’। ধর্মীয় আচার, পশু বলি, মূর্তি স্থাপন বা ভবন উৎসর্গের মতো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের পর সাধারণত এর আয়োজন করা হতো। ধনী কেউ ভোজের খরচ বহন করলে শিলালিপিতে তার নামও সংরক্ষিত থাকত। ফলে দানশীলতা ও পারিবারিক মর্যাদা দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকত।
২০টি নারী অর্থায়িত ভোজের ১২টির সঙ্গে কোনো সম্মাননা বা মূর্তি স্থাপনের তথ্য পাওয়া গেছে। অনেক নারী স্বামী, সন্তান, বাবা বা আত্মীয়ের সম্মানে নিজের সম্পদ ব্যয় করতেন।
নিজের অর্থ ব্যয়ের প্রমাণ
প্রায় ৭০ শতাংশ নারী দাতার শিলালিপিতে ‘সুয়া পেকুনিয়া’ শব্দটি রয়েছে, যার অর্থ ‘নিজের অর্থ দিয়ে’। অর্থাৎ এসব দানের সঙ্গে নারীর ব্যক্তিগত সম্পদের সম্পর্ক স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছিল।
ইউনিয়া ডি. এফ. রুস্তিকা নিজের অর্থে সরকারি কর পরিশোধ, গোসলখানার জন্য জমি দান, একটি বারান্দা পুনর্নির্মাণ ও দেবতা মার্সের ব্রোঞ্জের মূর্তি নির্মাণের পাশাপাশি গণভোজ এবং দুটি ঘোড়ায় চড়া মূর্তির খরচও বহন করেছিলেন।
ধর্মীয় দায়িত্বেও ছিল নারীদের প্রভাব
গবেষণায় ছয়জন নারী পুরোহিত বা ‘ফ্লামিনিকা’র তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের কেউ কেউ সম্রাটের উপাসনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বায়েবিয়া সি. এফ. ক্রিনিতা নামে এক নারী পুরোহিত নিজের উইলে একটি ভোজ এবং অ্যাপোলো ও ডায়ানার জন্য মন্দির নির্মাণে অর্থ রেখে যান। মন্দির নির্মাণে তার দান ছিল ২ লাখ সেস্টারস। নিজের সম্মানে মূর্তি স্থাপনের শর্তও দিয়েছিলেন তিনি।
শুধু আয়োজক নয়, অতিথি হিসেবেও নারীদের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়। ইতালির কয়েকটি শিলালিপিতে শুধু নারীদের জন্য আয়োজিত ভোজের উল্লেখ রয়েছে। কোথাও খাবারের পাশাপাশি প্রত্যেক নারীকে দুই সেস্টারস (প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের মুদ্রা) করে দেওয়ার কথাও জানা যায়।
তবে এসব উদাহরণ নারীরা পুরুষদের সমান নাগরিক ক্ষমতা ভোগ করতেন এমনটা প্রমাণ করে না। বরং তৎকালীন সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোর মধ্যেই তারা সম্পদ, ধর্মীয় দায়িত্ব ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
গবেষণার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাচীন রোমে নারীরা কেবল পরিবারের সদস্য নয়, তারা ছিলেন দাতা, ধর্মীয় কার্যাবলী ও জনজীবনের সক্রিয় অংশীদার। জনভোজ তাই তাদের কাছে খাবার বিতরণের পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদা ও স্মৃতি ধরে রাখারও একটি শক্তিশালী মাধ্যম ছিল।
সময়ের আলো/এমকে